ঠিক আছে বউ মা, তুমি যাও, আমি তাকে দিয়ে যাব। ভবার কোনো দৌরাত্ম্য নেই, বারান্দায় এক বাটি মুড়ি মোয়া দিয়ে বসিয়ে দিলেই খুঁটে খুঁটে খাবে। এত গাছপালা জঙ্গল, ভবার কি তোমার কোনো অভাব আছে।
তা ঠিক—
এই এক আশ্চর্য পৃথিবী, যে বাঁচে, যে থাকে সেই জানে কী মজা আছে এই বেঁচে থাকার।
হারু হাজরা কেমন তরাসে ফেলে দিয়ে গেল তাকে—একে চৈত্র-মাস।
জল নেই।
ঝিল্লি দেখা যায় প্রান্তরে।
খাল বিল পার হয়ে তাড়িপোতার অন্নপূর্ণার মন্দিরের ত্রিশূলটিও দেখা যায়। সকাল হলে পুষ্পবতী প্রথমেই সেই দূরবর্তী ত্রিশূলটির শরণাপন্ন হয়। ভবার বাবা, ভবারে ভালো রেখো ঠাকুর—মেয়েটা ফ্রক পরে স্কুলে গেছে, স্কুলে গেলেও চিন্তা। যা দিনকাল—মানুষ মানুষকে সুযোগ পেলেই কামড়ে দেয়। রাস্তায় মেয়েটাকে বাস থেকে কেউ যদি জোর করে নামিয়ে দেয়, হারু হাজরা চলে যাবার পরই এসব চিন্তা মাথায় আসে। জমিদারদের কাল কবেই গেছে—ঠাকুরদার মুখে জমিদারদের জবরদস্তির মেলা খবর সে রাখে, এখন পলিটিকসের বাবুরা জমিদার। বাড়িতে এসে না হলে হারু হাজরা হুমকি দিতে পারে—নীলু দত্ত কি তোর ব্যাটা নাক কামড়ে দিয়েছে। নীলু দত্তের সঙ্গে মিশলে কি পুতনা রাক্ষসি তারে গিলে খাবে। এত রোয়াবি, ছিলি তো যোগলের ব্যাটা—পলিটিকস করে বাবু হয়ে গেলি!
পলিটিকসের বাক্স, বিপ্রদাসের কথাবার্তায় লোকটার প্রতি অতি বিষম উক্তি শুনে শুনে পুষ্পবতীও বোঝে পলিটিকসের বাক্সে কী থাকে—বড়ো বড়ো কথা বলে জাগয়া দখলের কথা থাকে, এলাকা দখলের কথা থাকে, পলিটিকস থাকলেও মানুষ বাঁচে, পলিটিকস না থাকলেও মানুষ বাঁচে। মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টির অনিষ্টকারীদের পুষ্পবতী দু-চক্ষে দেখতে পারে না।
বিপ্রদাসের মুখেই শোনা।
বুঝলি পুষ্প, আমরা এই ধূর্ত লোকগুলোর পণ্য।
পণ্য।
পণ্য বুঝিস না, আমাদের বেচাকেনা করে বাবুরা। আমাদের লোভ দেখিয়ে ফুলটুসি বানায়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম হয়। ভাগের ভাগ বাবুরাই খায়। আমরা খাই উচ্ছিষ্ট।
এটা ঝোঝে পুষ্পবতী, মানুষটার মাথা গরমের কারণও বোঝে। উচ্ছেদ। এই একটি কথাই এলাকার মানুষজনের ঘিলু গলিয়ে দিচ্ছে। বিপ্রদাস বাড়ি থাকলে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমে যতদূর চোখ যায়, যত বসত আছে সব উড়বে বাতাসে। হাওয়ায় পাতা উড়ে যাবার মতো উড়ে যাবে সব। যত এইসব বিপ্রদাস ভাবে, তত চণ্ড ক্রোধ তাকে পাগল করে দেয়।
বিপ্রদাস বাঁশঝাড়ের তলায় কখনো বসে থাকে, কখনো বাপঠাকুরদার লাগানো আম জাম গাছের দিকে তাকিয়ে বসে থাকেকেমন এক ঘোর সষ্টি হয় ভিটে মাটির জন্য। শুধু নীলুদাই তাদের বল ভরসা। মানুষটা কাগজে উচ্ছেদকারীদের হয়ে খবর ছাপছে। বলে গেছে, শোনো বিপ্রদাস, এই জলাভূমি টাউন হলে সব হবে। নীলুদা মউজা দাগ নম্বর দেখিয়ে তাকে বুঝিয়েছে, সোজা না, সড়ক যাবে লম্বা সড়ক, জল জঙ্গল থাকবে না, সরকার কেনা-বেচায় মেতেছে।
ভাদুই ঠিক বলে, কার জমি কে বেচে। আমরা দাদা বলির পাঠা। মালা গলায় পরিয়ে সাজিয়ে দেবে—কিছুই চিহ্ন থাকবে না, যাদের যূপকাষ্ঠে ফেলে ঘ্যাচাং।
এইসব ভাবলেই বিপ্রদাসের শরীর নিথর হয়ে আসে। তার কিছু ভালো লাগে। চৈত্র মাস। চাষ আবাদের জমি পার হয়ে জলাভূমি শুকিয়ে কাঠ।
জল নেই। সেই কবে শীতে বৃষ্টিপাত, তারপর আর মেঘের দেখা নেই। আকাশ তামার বাসনের মতো চকচকে হয়ে আছে। দিন যায়, মাস যায় আকাশ আর ঘোলা হয়ে ওঠে না। মাঠ খাঁ খাঁ করছে। কিছু শকুন উড়ছিল। দূরে অদূরে বাঁশের জঙ্গল—নিশিতে থেকে বিশ্রী শব্দ ওঠে। কে যেন হেঁকে যায়। তোমার সব হে বিপ্রদাস। তুমি অবেলাতেই রওনা হয়ে যাও, আশায় আশায় বসে থেকো না।
আসলে তার কী মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
দু-দিকের মাঠ ফেলে ছাল চামড়া ওঠানো পাকা সড়ক আটখরার দিকে চলে গেছে। সেখানে গেলেই শহর, সেখানে স্কুল সিনেমা ভি আই পি রাস্তাটা অজগরের মতো চারপাশের বৈভব যেন নিচ্ছে। সেখানে এই সড়ক ধরে বাস যায়, সাইকেল যায়। বাঁশবোঝাই হয়ে যায় গোরুর গাড়ি। মানুষজন নামে ওঠে। রাস্তার পাশে কোথাও টালির কারখানা। আবার দূরে গেলে মাছের ভেড়ি, আরও দূরে গেলে ইটের ভাঁটা। ভাঁটাগুলির পাশ দিয়ে পাকা রাস্তার মেলা ডালপালা বের হয়ে গেছে। কোনওটা হাসনাবাদ যায় কোনওটা বারাসতের দিকে—আবার বসিরহাটের রাস্তাও তার চেনা। কিংবা সাইকেলে কিছুটা গেলেই হাসনাবাদ যাবার রেলে উঠে পড়া যায়।
এইসব রাস্তার বিপ্রদাসকে যাওয়া আসা করতেই হয়—সেই জনম ইস্তক সে রাস্তার দোকানপাট, মানুষজন, গাছপালা পার হয়ে সুমার প্রকৃতির বনজঙ্গলে, যত রকমের গরিব পুরুষের বসতি দেখে দেখে বড়ো হয়েছে। কেউ ফিরি করে, কেউ মাছ ধরে, কেউ ফুরনে প্লাম্বার মিস্ত্রি, ইটভাঁটাতেও কাজের মানুষ মেলা—যতদূর চোখ যায়, সবার মধ্যেই আছে প্রিয়জন, প্রিয় ভূমি, গেরস্থ মানুষও মেলা, ইটের কোঠাবাড়ি, টালির ঘর, ছনে ছাওয়া বাহারি ঘর, হাল গোরু গোয়ালে-কুকুর বেড়ালও চেনা যায় তারুলিয়ার ঘোষবাড়িতে গেলে—একটি মহাবিশ্ব নিয়ে যে তার বাস। উচ্ছেদ করলেই হল—যত ভাবে তার মাথা গরম।
সেই সে বছর তার লায়েক পুত্রটির মৃত্যুদৃশ্যও চোখে ভেসে ওঠে। স্মৃতির শেষ নেই–গাছপালায় তার সব স্মৃতি মাখামাখি হয়ে আছে। সে গাছ বেচে না, বাঁশ সহজে বেচে না, পাকা বাঁশঝাড়ের পুষ্টি হবে ভেবেই বেচে তার আটান্ন শতক জমির মধ্যে কী নেই—একটা সফেদা গাছ পর্যন্ত আছে। লিচ গাছটায় ঝেপে লিচ হয়, লাল হয়ে থাকে গাছের ডালপাতা। ফুলের গন্ধেই সে টের পায় কোন গাছের কোন ফুল। আমের মুকুলের গন্ধ উঠলে আধা আধা হয়ে যায় পাতা ডাল। কত কিছুর যে স্মৃতি—সে ভেবে ভেবে শেষ করতে পারে না। যেন এক জন্ম এবং জন্মান্তরের অস্তিত্ব গাছপালার মধ্যে এবং আটান্ন শতক জমিতে লেপ্টে আছে।
