সে ডাকল, বউ এক গ্লাস জল দে।
মানুষটা তার এই রকমের—বের হলে বাড়ি ফিরতে চায় না।
বাড়ি থাকলে বের হতে চায় না।
তার শুধু অপেক্ষা।
এই অপেক্ষাও যে ঘরবাড়ি গাছপালায় জড়িয়ে থাকে।
পুস্পবতী এক গ্লাস জল দিয়ে বলল, কাল খেতি ঘুরে গেছে। বলল, দাদা বাড়ি নেই।
খেতি তার বাড়ির লাউ, কুমড়ো, সিমের মাচান করলে সিম, পালং শাক, ঢেরস, ঝিঙে, যে দিনকার যা কিনে নিয়ে যায়। আমের দিনে আম, লিচুর দিনে লিচু, কাঁঠাল গাছ দুটোও কম যায় না। উঁচর থেকে বিক্রি শুরু। পাকা কাঁঠালে শেষ। চৈত্র মাস। বৃষ্টি নেই, লাউ-এর মাচানে ফুটো লাউ ঝুলছে, খেতি তারই লোভে ঘুরছে, সে বোঝে। একেবারে কচি, আরে বাড়তে দে।
আসলে খেতি যেন তার চেয়ে বেশি টের পায়। বাড়িটায় সে সওদা করতে আসে। বিপ্রদাস বসে থাকে না। সারাদিন কোদাল মেরে জমি সরেস করে রাখে। জায়গায় জায়গায় সিম, লাউ-এর বিচি লাগিয়ে রাখে। যেদিনকার যা। খেতি জানে কোথাও কিছু না পেলেও বিপ্রদার জমিতে কিছু না কিছু ফলন থাকে। ওই তো মোচা ঝুলছে।
ওই তো লেবু গাছের, লেবুর ফলন—দিন দাদা।
তারপর দামদর হয়।
খেতি মাথার ঝাঁকা নামিয়ে বসে। তারপর ফাঁকা ঝাঁকা দেখিয়ে বলবে, আপনারা আছেন বলে আমরাও বাঁচি। দাদা আপনার গন্ধরাজ লেবুর বড় সুখ্যাতি।
বাড়ি এবং জমির এখানে সেখানে কত রকমের যে জীবনের উৎস। কাঁচালংকার গাছও আছে। বারোমাসই লংকার ফলন হয়। আট-দশটা গাছ কি বাড়ন্ত, ফুল ফুটছে তারপর লংকা, তারপর এই ধানি লংকার বাজারও খুব ভালো–সপ্তাহের এক দু-দিন। এই বাড়িটায় তার কিছু না কিছু সওদা হয়ে যায়।
সে বলে, তোমার ঘরে লক্ষ্মী বাঁধা। যাতে হাত দেও তাতেই সোনা ফলে। বউদি যে তোমার অন্নপূর্ণা দাদা।
এইসব সোহাগি কথায় পুষ্পবতীও গলে যায়। কিছু না কিছু খেতিকে খেতে দেয়। যখন যা হয়, কখনো মুড়ি, না হয় রুটি, আলুর হেঁচকি। খেতে পেলে সে আরও সোহাগি হয়ে যায়। তবে সে দাদাকে ঠকায় না, ন্যায্য দাম দেয়। পুষ্পবতী আজও বারান্দার খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই মানুষটা কোন সকালে বের হয়েছে ফেরার নাম নেই। ঘুরে আসছি বলে বের হল।
কিন্তু ফিরছে না।
সকাল গেল, দুপুর গেল ফিরে এল না।
এই এক বাতিক। বের হলে আর ফিরতে চায় না।
কোথায় যে গেল মানুষটা! বলেও গেল না। তবে এমন যে হয় না, কতবারই দেখেছে, অনেক রাত হয়ে গেছে ফিরতে। তবে কেউ না কেউ খবর দিয়ে গেছে, কাকা হাসনাবাদের রেলে উঠে গেল। খবরটা দিতে বলল। চিন্তা করবে না কাকি। রাত হবে ফিরতে।
মানুষটার বাঁধা মাইনের কোনো কাজ নেই। রাস্তার মোড়ের হাসুর চায়ের দোকানেও মাঝে মাঝে বসে থাকে। রোজগারের ধান্দায় মানুষজনের সঙ্গে মিশে থাকতে ভালোবাসে। বাড়িতে ফিরলেই মাথা গরম করে ফেলে।
তখন পুষ্পবতীর ভয় হয়।
আরে ছ্যাঁচড়া জীবন আমার। বউ তুমি বোঝ না। মানুষটার মাথা গরম হলে জীবন সম্পর্কে ধিক্কারেরও শেষ নেই। গাছের ফলন, মাচানের ফলন কিংবা চাষের ফলনে তার যে জীবন নির্বাহ হয় না।
সে জীবন নির্বাহের জন্য ঠেকও খাটে।
কখনো মাছের ভেড়িতে, কখনো বাঁশের জঙ্গলে অথবা ইটের গাড়িতে উঠে তেঘরিয়া, বাগুইআটি, জ্যাংরা যেখানে যখন সুবিধা পায়, চুন সুরকি বালি ফেলে দিয়ে আসে।
কোথায় যে গেল!
কত কাজ। অনুর স্কুল থেকে ফেরার সময় হয়ে গেল। ভবা ফড়িং-এর পেছনে ধাওয়া করছে। সে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। কাউকে দেখলেই এই মলয়।
আমায় ডাকছেন কাকি?
তোর কাকাকে দেখেছিস।
না কাকি।
কোথায় যে গেল। কিছু বলেও গেল না।
কেমন তরাসে পড়ে যাচ্ছে পুষ্পবতী। তরাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য ছুটে গিয়ে ভবাকে কোলে নিয়ে বাড়ি থেকে নেমে গেল। ভবা কোলে থাকলে সে সাহস পায়। কেউ তার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না, সে সহজেই দরজায় শেকল তুলে এ-বাড়ি সে-বাড়ি যেতে পারে। মানুষের সঙ্গে কথা বললেও সে জোর পায়। রাস্তার। দাঁড়িয়ে অচেনা লোকের সঙ্গে কথাও বলতে পারে। এবং এভাবে সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখতে পায়, মানুষটা ফিরছে। এই ফেরা যে জীবনে কত মাধুর্য তৈরি করে পুষ্পবতীকে না দেখলে বোঝা কঠিন।
