ফেরা
এক একটি খণ্ড দৃশ্যে জীবনকে উপভোগ করার জন্য এই জীবনমালা। যেমন পুষ্পবতী। বাসে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছে স্বামীর ফেরার আশায়। বিকেল হয়ে গেল, ফিরছে না। কেউ কোনো খবরও দিয়ে যায়নি। কেউ বলেনি তিতলিপুরের বাসে উঠে যেতে দেখলাম। যেমন সেই লোকটা, কী যেন নাম! পঞ্চায়েতের বাবু। বগলে ছাতা, সে ঘুরে ফিরে চলে আসে, চশমার আড়ালে পুষ্পবতীকে খোঁজে। নানা ধান্দার খবর দিয়ে যায়। আর বিপ্রদাস তাকে দেখলেই কেন যে খেপে যায়। লোকটাকে দেখলে পুষ্পবতীর মানুষটা আড়ালে থু থু ফেলে। গরমেন্টের লোক, দালাল, শালাকে সুযোগ মতো হাতে পাই—পোঁদে বাঁশ ঢুকিয়ে ছাড়ব। থু থু! লোকটা নেমকহারাম। পঞ্চায়েতের বাবু, প্রভাবশালী মানুষ। জ্যাংরার মোড়ে পেল্লাই বাঁশের আড়ত, সেখানে বাঁশ কেনাবেচা চলে, পেল্লাই সব ফ্ল্যাট বাড়ি উঠছে–বাঁশের ঝাড় সাফ হয়ে যাচ্ছে।
পাজামা পাঞ্জাবি গায়, কখনো তিনি ভোটের বাবুও হয়ে যান—কখনো একা হাঁটেন না, সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে হাঁটেন—বিপ্রদাস আছে। বিপ্রদাস।
কেউ সাড়া দেয় না।
পুষ্পবতী লোকটাকে কেন যে ভয় পায়। কাজের ধান্দায় মানুষটা কোন সকালে বের হয়ে গেছে, অনু বাসে উঠে স্কুলে গেছে—বাড়িটা ফাঁকা। লোকজন নিয়ে হারুবাবু তার উঠোনে, বসতে বলতে হয়, না হলে যে বাড়িঘরের মান থাকে না। পুষ্পবতী মাথায় ঘোমটা টেনে থামের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায়।
বিপ্রদাস কি বাড়ি নেই।
আজ্ঞে কাজে বের হয়েছেন।
ও কী স্থির করল, কিছু তো জানাল না।
জমিন আর মেয়েমানুষ নাহলি পুরুষের জীবন চলে না, এইসব অঞ্চলে বাঁশের খোঁজে এলে হারুবাবু টের পান। বিপ্রদাসের বাঁশবাগানটি তার নজরে পড়েছে। এত দারিদ্র্য তবু কেউ একটি বাঁশে হাত দিতে পারছে না।
হারুবাবু বললেন, ওকে বলবে আড়তে যেন দেখা করে। ও কীসের আশায় যে বাঁশবাগান আগলাচ্ছে বুঝি না। আরে সময় থাকতে বিক্রি করে দে। বাঘা সরকারের থাবা ঝুলছে—ও কি কিছু টের পায় না।
বারান্দায় পুষ্পবতী আসন পেতে দেয়।
হারুবাবু তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আর এগোয় না। শোনো বউ মা, কিছু থাকবে না। বাঁশের দর চড়ছে, এই বেলায় বাঁশ বিক্রি না করলে বিপ্রদাসের কপালে দুঃখ আছে বলে দিও। আমরা বসব না। বিপ্রদাস কোনো নোটিশ পায়নি?
আজ্ঞে না। নোটিশ নিয়ে বহু কথা ওড়াউড়ি হয়। আজ্ঞে না বলে সে বোধহয় ঠিক কাজ করেনি।
আরে আজ্ঞে না বললেই হল। সরকারের নোটিশ ফিরিয়ে দিলেই হল! সাধ্য আছে, ফিরিয়ে দেবে, সরকারের লোক এসে ফিরে গেলে কী হয় জান না!
পুষ্পবতী থামের আড়ালেই দাঁড়িয়ে থাকে—সে আর কথা বলে না। কারণ সে তো ঠিক জানেও না, মানুষটা নোটিশ পেয়েছে না পায়নি। তবে মাসখানেক ধরে গুম মেরে আছে।
শোনে বউ মা, দুবার ফিরিয়ে দেবে, টাকা দিলে নোটিশ না ধরিয়ে দিয়েও যেতে পারে গরমেন্টের লোক। তবে কথা একখানা-রেহাই নেই। সই করে নিলে সরকারের ক্ষতিপূরণ সহজেই পেয়ে যাবে। দু-হাজার টাকা কাঠা, বাপের জন্মে শুনেছ, জমির দাম এত মাঙ্গা হয়। নোটিশ না নিলে, দেয়ালে সেঁটে দিয়ে যাবে— তখন তোমার জমিও যাবে, টাকাও যাবে।
পুষ্পবতী কী যে বলে!
নীলু কি এদিকটায় এসেছিল।
পুষ্পবতী নীলুকে ঠিক চেনে না। তবে শুনেছে, কে একজন মাঠচাষিদের উসকাচ্ছে। রোগাপটকা মানুষটার খুবই তেজ। বিপ্রদাসই খবর দিয়েছে। জমি বাঁচাও কমিটি গড়েছে নীলু দত্ত।
হারু হাজরা বলল, বিপ্রদাসকে বলল, নীলুর সঙ্গে যেন ঘোরাঘুরি না করে। সব খবরই পাই। যত সব চ্যাংরামি। আরে বুঝিস না সরকার ময়দানের ঘোড়া ছেড়ে দিয়েছে। নীলুর সাধ্য কী জমি বাঁচাও আন্দোলন করে চাষের জমি রক্ষা করে। বাধা দিতে গেলে জমিও যাবে, মানুষও যাবে।
পুষ্পবতী ভাবল, মানুষটা যে সারাদিনই প্রায় বিবাগি হয়ে থাকে, নীলু দত্তের পাল্লায় পড়ে না কাজে কামের ধান্দায়—সে কিছুই জানে না। চাপা স্বভাবের মানুষ হলে যা হয়।
সে চোখের আড়ালে দাঁড়িয়ে শুধু শুনছে।
শোনো বউ মা, বাঁশের বাগানটিও কম মূল্য ধরবে না। সরকার জমি দখল করার আগে, পোক্ত বাঁশগুলি বেচে দাও। ওকে তুমি বোঝাও। এলাকার বাঁশের সুনাম আছে বলেই না বিপ্রদাসের বাবা সুরদাস তাঁর উরাট এলাকাতে বাঁশের ঝাড় বসিয়ে দিল। নারকেল গাছ, তালগাছ, লিচু, আম যা আছে বেচে দাও। সরকারের দখলে চলে গেলে সব যাবে বলে গেলাম। কেউ রক্ষা করতে পারবে না।
সব তো যাবেই। ময়দানের ঘোড়া ছুটিয়ে দিলে মানুষ তো মানুষ। পাখি প্রজাপতিও দেশ ছাড়া হবে। এই জমি মাটি যে আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কে বোঝে। পৈতৃক ভিটা, বাবা ঠাকুরদার জমি, কত গাছপালা, কত পাখি উড়ে আসে, সামনের সড়ক পার হলে যতদূর চোখ যায় ধানের জমি, ফুলের চাষও আছে, কেউ কেউ ফুল চাষ করে—তাদের জমি নেই, পৈতৃক ভিটা সম্বল—আর আছে ভিটা সংলগ্ন দুখানা বাঁশ ঝাড়।
পুষ্পবতী বারান্দায় থামে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে থাকে—কেমন একা হয়ে যাচ্ছে।
সে হঠাৎ লাফিয়ে উঠল, ভবা গেল কোথায়!
ভবা, ভবারে।
আর তখনই মনে পড়ে গেল, সকাল বেলায় ভাদুর মা এসে ভবার হাত ধরে নিয়ে গেছে।
বউ মা ছেলে যে ছাড়ছে না।
এই, কী হচ্ছে। পিসিকে দেখলেই তোর কী হয়।
ভবা খিল খিল করে হাসে। আর পিসির পেছনে দৌড়ায়।
