তোমার মুণ্ডু আছে। থাকল তোমার চিঠি! এ কি রে শেষ হয় না। আর একখানা কথা বাকি আছে? বাদশা তোমার কথা ইহজীবনে আর শেষ হবে না! কে তোকে মাথার দিব্যি দিয়েছিল, বুড়া বয়সে বালিকার মুণ্ডু চিবাতে তোর বিবেকে বাঁধল না!
‘অরে ব্যানার্জী, মাথা গরম করিস না। ফুলের বাস কে বা না নেয় রে ব্যানার্জী। আমার ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করিস না, দোহাই আল্লার–শুনতে পাইব কেউ। আমার কেন যে মাথা গরম হয়ে গেল সহসা বুঝি না। আসলে এই বয়েসে বাদশার এক বিবি থাকতে আবার শাদি করা অনুচিত কাজ হয়েছে ভেবে মনে মনে কি আমি তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে গেছি। সেই বালিকাবধূর ছবি চোখ বুজলে আমিও যেন দেখতে পেতাম। এক পাল মুরগি তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, পায়ে মল, কানে মাকড়ি, নাকে নোলক। এক গ্রাম্য বালিকা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সবুজ শস্যখেত মাড়িয়ে, কোথাও যেতে চেয়েছিল। বাদশা তাকে জবাই করেছে। সে চিঠির জবাব দেবে কেন! আমার মনে হত ক্ষোভে জ্বালায় সে অস্থির।
বাদশা আমার বাঙ্কের পাশে মাথা নীচু করে বসে আছে। সে জাহাজে ওঠার আগে দেশে শাদি করে এসেছে আমি বাদে জাহাজের কেউ জানে না। সে জানে, এই গোপন খবর ফাঁস হয়ে গেলে তার ইজ্জত থাকবে না। ইমানদার মানুষ ভাববে না।
তবু কেন যে ওর সরল সাদাসিধে মুখ দেখে আমার মায়া হল বুঝি না। বললাম, দে। বল, আর কী লিখতে হবে।
সে বলল, ‘লেখ। কথা মোতাবেক দেনমোহরের টাকা তর বাপের কাছে গচ্ছিত আছে। কথা মোতাবেক তিন কানি জমি লিখা দিছি। কথা মোতাবেক দেশে ফিরা আর অ তিন পদ গহনা দিমু। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাদশা কথার খেলাপ জানে না বুঝলি!’
‘তোর কি মায়া দয়া নেই। কথার খেলাপ হয়। তার কাছে তোর কথার দাম কী! সে তো শেষ হয়ে গেছে।‘
বাদশার চোখ ছলছল করে উঠল। বলল, মায়া দয়া আমার নাই! পরানডা বুড়া বয়সে তবে কান্দে ক্যান ক।
বুঝলাম, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। বললাম, আর তো কথা নাই!
সে চুপ। বুঝলাম ওর আরও একখানা কথা আছে। সে কীভাবে তা প্রকাশ করবে বুঝতে পারছে না। একটা চিঠি তার দু-একদিনে শেষ হতে চায় না। হয়তো এখন চিঠিটা নিয়ে উঠে যাবে,আবার কী মনে পড়বে, অথবা প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাবে, তখন তরতর করে নীচে নেমে আসবে। এলও ঠিক। পরদিন সকালে এসেই বলল, অ ব্যানার্জী কথা আছে দু-খান।
বল, এবারে দু-খান কথা!
হ। লেখ, তুই আমার বুকের ছিনা।
লিখে বললাম, বল। সে বলল, লেখ তুই আমার বুকের লৌ। ছিনা বুঝি না লৌ বুঝি না, না পেরে বললাম, লৌ মানে!
লৌ বুঝিস না? তুই কী করে! তুই না কলেজ পাস? তুই লৌ কারে কয় জানস না?
না জানি না। বড় জ্বালাতে পারিস!
‘ইবলিশ জানস না, লৌ কারে কয় জানস না! তুই কি পাস তবে!’ আমি চুপ করে থাকায় সে খানিকটা দমে গেল। তারপর অপরাধী মুখে বলল, ‘লৌ হইল ছিনার রক্ত। বিবির বাপজান কইল, টিণ্ডাল সাব আমার মাইয়াডার শাদি দিবার বাসনা হইছে। আপনে এলেমদার মানুষ সাব। যদি তিন কানি জমি লিখা দ্যান আপনের লগে শাদি দেই।
আর তুই রাজি হইয়া গেলি?
রাজি না হইয়া পারি রে ব্যানার্জী। লৌ জল করা টাকা। আট বেটা বিটি। কেবল দেও দেও। বেটারা ওৎ পাইতা আছে—কবে বাজানের ইন্তেকাল হইব। আমার কথা কেউ ভাবে না রে!
বুড়ো হলে লোক ফালতু হয়ে যায় বুঝিস না?
আমি ফালতু!
ফালতু ছাড়া কী? চিঠির জবাব, পরের ঘাটেও পাবি না। মাথা কুটে মরবি।
বিবির মুখের মিষ্টি হাসিখান দেখলে অ-কথা মুখে তর আইত না। পেটি মাথার রওনা হলে তার কি কান্দন। আমারে কার কাছে রাইখা গ্যালেন মিঞাসাব!
এরপর কথা বলা বৃথা।
‘তবে লিখা দে, বুনোসাইরিসের ঘাটে বিবি তর খত না পাইলে পরান আমার উড়াল দিব। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জানের ভয় থাকলে ঘাবড়াইয়া যাইতে পারে। কী কস। চিঠি না দিয়ে থাকতে পারব না। কী কস?’
না, বাদশা মিঞা বুনোসাইরিসের ঘাটে চিঠি পায়নি। কার্ডিফেও না। পোর্ট অফ জার্সিতেও না। ঘাটে জাহাজ ভিড়লে সে সবার আগে দৌড়োয়। এজেন্ট অফিস থেকে সবার চিঠি দিয়ে গেছে। সবার চিঠি আসে—তার চিঠি আসে না। সে চিঠির আশায় সারেঙের ঘরে ঢোকে সবার আগে, ফেরে সবার শেষে।
প্রতি ঘাটেই তার এই চিঠি লিখে দেওয়া ছিল আমার কাজ। তবে তার কাছ থেকে একটা খবর গোপন করে গেছি। চিঠি এসেছিল। সারেঙসাব আমাকেই দেন, চিঠি বিলি করতে। চিঠি পড়ে দিতে। বাদশা মিঞার নামেও চিঠি এসেছিল। আমার কেন যে মনে হয়েছিল, এ-চিঠি কোনো দুঃসংবাদ বয়ে এনেছে। চিঠি আগে পড়ে দেখা দরকার। দেখলামও। মিলে গেছে। তার বালিকাবধূ আর ছোটোবেটা নিখোঁজ। জানি না কেন তাকে চিঠিটা দিতে সাহস পাইনি। বাদশা পৃথিবীতে যে তবে সত্যি ফালতু হয়ে যাবে। আমার এই প্রবীণ বয়সে বার বারই মনে পড়ে, ফুলের বাস কে বা না ভালোবাসে। বয়স বড়ো তীর্যক গতি। তার ক্ষমতা ফুরোয়, তবু ফুলের বাস কে বা না ভালোবাসে। বাদশাকে কত গালাগালি করেছি। তাকে খুনি বলেছি। এখন ভাবলে বড়ো খারাপ লাগে। যা সহজে এবং নিয়মের মধ্যে লেখা থাকে, এবং যতই বয়স হোক, মানুষের এই প্রতিক্রিয়ার শেষ নেই। বাদশাকে সেদিন ফালতু ভাবতে পারি। এখন কেন যে মনে হয় বাদশার কথাই ঠিক, ফুলের বাস কে বা না ভালোবাসে। ভাবলে আজকাল আমারও মন খারাপ হয়ে যায়। ফুরিয়ে আসছে সব।
