তা কিছু কিছু জানি।
খত লিখতে পারবা ত।
কার খত।
সারেঙসাবের। আমার, বড়ো টিণ্ডালের একজন লিখাপড়া আদমি না থাকলে খত লিখব কেডা কও!
লেখাপড়া জানলে কদর বাড়বে জেনেই যেন বলা ‘তা আর বেশি কি! ও লিখে দিতে পারব।’
ব্যাস, কাম ফতে। ওঠ। পাকা কথা হইয়া যাউক।
বাদশা আমাকে সারেঙের কাছে টেনে নিয়ে গেছিল। তিনি বসেছিলেন জেটির ধারে। তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের সঙ্গে। একই জাহাজে সফর করবে। টিবিড ব্যাঙ্ক জাহাজের সারেঙ। এ-সফরে তিনি এনজিন-জাহাজিদের মাথা। তাঁর সঙ্গেই কাজ কাম নিয়ে জাহাজের সেকেণ্ড ইঞ্জিনিয়ারের কথা হবে। তিনি তাঁর লোকজনদের দিয়ে কাজ তুলে দেবেন। যতদিন সফর ততদিন মজুরি। জাহাজ দেশে ফিরে
এলে কিংবা সফর শেষ হলে মজুরি খতম।
সারেঙসাব বেশ মৌজে আছেন। দেশ থেকে এসে জাহাজ সঙ্গে সঙ্গে মিলে যাওয়ায় খুশি। কিছুটা দরাজ দিলেরও মানুষ। পরে তা টের পেয়েছিলাম।
সাদা দাড়ি, মাথায় নামাজি টুপি। লেসের কারুকাজ করা। ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি গায়ে। নীচে কালো রঙের গেঞ্জি। গলায় তাবিজ। বয়েস বাদশা মিঞার কাছাকাছি।
আমাকে সামনে দাঁড় করিয়ে বলল, দ্যাখেন মিঞাসাব পছন্দ।
সারেঙসাব আমাকে দেখছিলেন, তারপর বলেছিলেন, পারবা, বাঙ্গালিবাবুরা ক্যান যে ঝাঁকে ঝাঁকে জাহাজে আসছে বুঝি না। আরে মুসলমানের জান চাই, গোস্ত না খাইলে জানে কুলাইব না। বাদশা বলল, জববর লেখাপড়া জানে। খত লেখার অসুবিধা থাকব না।
তবে সারেঙসাব বোধহয় জানতেন, বাঙ্গালিবাবুরা লেখাপড়া জানা আদমি। আমি যে খত লিখতে পারব—তাতে কোনো অবিশ্বাস নেই। কিন্তু মনের মধ্যে কোনো সংকোচ কাজ করলে যা হয়–বললেন, নাম কীরে ব।
‘ব’টা হলগে লজ। কথার শেষে ‘ব’ আগে ‘ব’। তখন সবে দেশভাগ হয়েছে। কলকাতা বন্দরের জাহাজিরা সবাই পূর্ব-পাকিস্তানের। যে-কোনো সময় বন্দর অচল করে দিতে পারে ভেবেই সরকার ভদ্ৰাজাহাজে জাহাজি ট্রেনিং দিয়ে হিন্দু ছেলেদের ছেড়ে দিচ্ছে। আমিও সেই দলের। তিন মাসের ট্রেনিং। তিন সাল ধরে চলছে। আমি সবে ট্রেনিং শেষে বের হয়েছি।
অবশ্য জাহাজে উঠে সারেঙসাবই একদিন ডেকে বললেন, জাহাজে আইছ, কাম কাজ না শিখলে হইব কি কইরা ফালতু থাকলে নসিব খুলব না। যাও পরী দাও গা। বাদশার পরীতে কাম করবা।
সেই থেকে বাদশা আমার ওপরওয়ালা। খত লিখে দেবার সময় আমি তার সব। এমন সব গোপন খবর খত না লিখলে জানতেও পারতাম না। বাদশা যে এত রসিক, তাও জানতাম না। ওর বিবিকে নিয়ে ইয়ার্কি ফাজলামিও কম করিনি। সেই থেকে ভাব। এবং বাদশার এত সব গুহ্য কথা জেনে ফেলায় দুজনের মধ্যে তুইলোকারি সম্পর্কও গড়ে উঠল।
সেই বাদশা মিঞা আবার স্টকহোলডে বাঘের মতো তেড়ে আসত। সেই আবার ফোকসালে আমাকে বাঘের মতো ভয় পেত। এনজিন-রুমের তিনটে দৈত্যাকার বয়লারের পাশে বাদশা আর এক ছোটোখাটো দৈত্য। কাজ কামে সামান্য ত্রুটি থাকলেই তেড়ে আসত। চিৎকার করে বলত, ‘ক্যাডা কইছিল তরে জাহাজে আইতে। কয়লার সুট খালি, চিৎ হইয়া পইড়া আছস! ভরব ক্যাডা শুনি! আর ফোকসালে ফিরে এলে সেই বাদশা দরজায় টোকা মেরে বলত, ‘অ ব্যানার্জী মেহেরবানি হইব! আর একখানা যে কথা আছে!’ কখনো এনজিন-রুমের রাগ পুষে রাখতাম। তার জের পোহাতে হত বাদশাকে। বলতাম, না হবে না। পারব না। আমি এখন ঘুমোব। তর আর একখানা কথা শোনার সময় নাই।
তখন হাহা করে হেসে উঠত সে। অরে ব্যানার্জী জাহাজ হইল গিয়া ইবলিশ। বোঝলা কিছু ইবলিশ কারে কয় বোঝ? শয়তান! শয়তানের পেটে আমরা ঢুইকা গেছি। গরমে মাথা ঠিক রাখতে পারি না। হাড্ডাহাড্ডি লাইগাই থাকে। কাজে কামে গাফিলাতি হইলে কসুর হয় রে ব্যানার্জী। বোঝস না ক্যান? দে খতখানা লিখা। জবাব আসে না ক্যান বুঝি না? আর একখানা কথা লিখা দে।
নিরক্ষর মানুষটির জন্য তখন আমার কেমন মায়া হত। দেশে বিস্তর জমিজমা, পুকুর, দুই বিবি। গালমন্দ করলেই সে ব্যাজার হয়ে যায়।…তর লজ্জা করে না, বুড়া বয়সে শাদি করতে। একটা নাবালিকার জীবন নষ্ট করে দিলি! তুই মানুষ?
তখনই সে বলত, পরানডা বড়ো কান্দে রে! কবে যে দেশে ফিরমু! ছোটো বিবি আমারে পাগল কইরা দিছে।
ব্যানার্জী লিখা দে, আমরা বুনোসাইরিস যাইতেছি। সেখানে গিয়া বিবি তর খত না পাইলে মরমে মইরা যামু। লিখা দে ব্যানার্জী দিল আমার আনচান করে। পুকুরঘাটে তুই বইসা থাকস, চক্ষে তর কান্দন ঝরে, আমি ফিরা গেলে দুনিয়া উপুর কইরা দিমু তর কইলজার ভিতরে।
এই নিয়ে পরপর দু-খানা খত গেছে কলম্বোর ঘাটে। তৃতীয় খতটি লিখলাম কেপটাউনের ঘাটে। বাদশা চিঠিখানা গোপনে পোস্ট করে আসত। কারো হাতে দিত না। বাদশার এই কুকীর্তির কথা আমিই জানি। দু-হাত জড়িয়ে ধরে বলেছে, কাউরে কইস না। নসিব আমার। শেষ বয়সে মাইয়াখানের মিষ্টি মুখ দেইখা দিলে যে কি হইল রে ভাই! জমিজমা লিখা দিছি, দেনমোহরের টাকা দিছি। অর বাপের ভিটায় ঘর তুইলা দিছি। কি করি নাই ক! এক একটা বাক্য শেষ করে থম মেরে বসে থাকত বাদশা।
কী হল!
না, আর একখানা কথা আছে। লিখা দে ছোটো বিবিরে, দেশে ফিরা গিয়াই আববুর শাদি দিমু।
আববুটা আবার কে?
আমার ছোটো পোলা। শেষ কাম। পোলার শাদি দিলে আল্লার কাছে মোনাজাত করা ছাড়া আর কিছু কাম থাকব না! চিঠিটা তারপর হাতে দিতে গেলে সে নিল না। বলল, সবটা পড়। শুনি। সবটা পড়ার পর সে কী ভাবল কে জানে—বলল, আর একখানা কথা বাকি আছে।
