এনজিন জাহাজিদের কাজ কয়লা মারা, স্টিম ঠিক রাখা। সারেঙ, বড়ো টিণ্ডাল, ছোটো টিণ্ডালের ওয়াচ। চার ঘন্টা করে দিনে আট ঘন্টা ‘পরী’।
জাহাজ আর পাই না। রোজ মাস্তারে দাঁড়াই। পোশাকে-আশাকে ভদ্র একজন তরুণকে কে নেবে কুলিকামিনের কাজে।
ছোটো টিণ্ডাল বাদশা মিঞা লাইনে দাঁড়াল আর হয়ে গেল। তার পোশাকের কথা এখনও মনে আছে। সে পরেছিল খোপকাটা লুঙ্গি। ফুলহাতা কাচা শার্ট। গলায় গামছা মাফলারের মতো। পায়ে বুটজুতো তালিমারা। এত খারাপ লাগছিল। মনমরা হয়ে গাছতলায় বসে আছি।
দেখি বাদশা আমার দিকেই আসছে। মুখভর্তি পান জর্দা। আর পিক ফেলছে যখন তখন। মাথার চুল ছোটো করে ছাঁটা। একটা সিগারেট ধরিয়েছে। জাহাজ পেয়ে যাওয়ায় সে সিগারেটের বিলাসিতা দেখাচ্ছে আমাকে।
আমার মন খারাপ।
রোজ লাইনে দাঁড়াই। সবাই জাহাজ পেয়ে যায়। আমার কপালে জাহাজ জোটে না। মন তো খারাপ হবেই। কোনো কম্মের না। হাতে সি ডি সি, দেখতেও মন্দ না। বেশ দীর্ঘকায়ও বলা যায়। তবে রোগাপানা—এটাই হয়তো অপছন্দের কারণ।
সে যা হোক, আমিও নাছোড়বান্দা। জাহাজে সমুদ্রসফরের কোনো উল্লেখ না থাকলে নয়া আদমি লাইনে ভাবতেই পারে। জাহাজে কী মারমার কাটকাট—তাও ঠিক জানি না। তবে বুঝে ফেলেছি এ আমার কম্ম নয়। আমাকে জাহাজে তুলে লাভ নেই। তখনই দেখলাম বাদশা মিঞা আমার পাশে এসে গাছতলায় বসল। বলল, কি রে জাহাজ পাইলনি!
বললাম, না চাচা। তোমার তো হয়ে গেল। তখনও আমি বাদশার নাম জানি না। তার কী কাজ জানি না। জাহাজে নতুন উঠলে কোলবয়ের কাজ পাব জানি। ছোটো টিণ্ডাল, বড়ো টিণ্ডাল সারেঙ থাকে জাহাজে তাও জানি। ভদ্ৰাজাহাজে ট্রেনিং-এর সময়ই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, কী কাজ করতে হবে জাহাজে। কয়লার এনজিন হলে, কয়লা টানতে হবে। তেলের জাহাজ হলে এনজিন-রুমের প্লেট মোছামুছির কাজ। শিরিষ কাগজ মেরে রেলিং সিঁড়ি ঝকঝকে রাখার কাজ। তবে বরাত জোরে ফায়ারম্যানও হয়ে যেতে পারি। সফরে কেউ না কেউ পালায়। বন্দরে নেমে আর ফিরে আসে না। তখন কপাল খুলে যায়।
কত কথা ভাবছি।
আর তখনই বাদশা মিঞা বলল, ফালতু হইবা।
সব শুনেছি, কিন্তু জাহাজে ফালতু বলে কোনো কাজ আছে জানতাম না। ফালতু বিষয়টা কী! মনে মনে আঁচ করার চেষ্টা করছি। তখন গাছ থেকে একটা কাক আমার মাথায় হেগে দিল।
বাদশা বলল, যা গেল তোমার জামাখানা গেল।
সে তার গলার গামছা দিয়ে পিঠ থেকে ময়লা মুছে দিল। তারপর কল থেকে জল এনে জামার সেই নোংরা অংশ ধুয়ে দিল। বাদশাকে পাত্তা দিচ্ছিলাম না। লোকটা এত নিজের বুঝতে পারিনি। আগেও দেখেছি শিপিং অফিসের ক্যান্টিনে গুলতানি মারছে। টুলে পা তুলে বসে বিড়ি টানছে। বাদশার আচরণ আমার পছন্দ হত না। কত কিসিমের মানুষজন যে থাকে! অথচ এতদিন মাস্তার দিচ্ছি, জাহাজ পাচ্ছি না, কেউ কোনো খোঁজখবর করেনি, কেবল ভদ্ৰাজাহাজ থেকে আমাদের যে ব্যাচটা বের হয়ে এসেছে তারাই আমার সুহৃদ ছিল। সবাই একে একে জাহাজও পেয়ে গেছে। একমাত্র আমার কপালেই জাহাজ জোটেনি।
খারাপ লাগে না! কত না আশা! মাস গেলে প্রথম সফরে নববই টাকা মাইনে। খাওয়া থাকা পোশাক-আশাকের খরচ কোম্পানির। একটা সফর দিয়ে ফিরতে পারলে, হাজার বারোশো টাকা হয়ে যাবে। কত কিছু কেনাকাটা করব ভেবে রেখেছি, মাসে মাসে বাবার নামে মাসোহারা যাবে। বাবা টের পাবেন তাঁর নিখোঁজ পুত্র এখন জাহাজে। কোনো বন্দরে নেমে চিঠি লিখব ভেবেছি। বাবা অবাক হয়ে যাবেন, তাঁর পুত্রটি তবে বহুদূরের কোনো বন্দর থেকে তাঁকে চিঠি দিয়েছে। তিনি প্রতিবেশীদের খবর দেবেন, খোঁজ পাওয়া গেছে। জাহাজের চাকরি নিয়ে তাঁর পুত্র এখন দেশান্তরী। ফিরলে হয়! নানা রোমাঞ্চকর স্বপ্ন যখন মনে ঘোরাফেরা করছে, তখন মাস পার হয়ে যাওয়ায় একেবারেই ভেঙে পড়েছিলাম।
বাদশা বলেছিল, জাহাজ পাইলা না ব। ফালতু হইতে রাজি? সারেঙসাব ফালতু খুঁজছেন? যদি রাজি হও জাহাজে উঠতে পার।
বলেছিলাম, ফালতু আবার কী?
হায় আল্লা, ফালতু বোঝ না! জাহাজে কাম করতে আইছ!
মনে নানা আশঙ্কা। জাহাজে সমকামিতার রোগ থাকে। ফালতু তুলে নেওয়া কেন। প্রথমে বিরক্তই হয়েছিলাম। এমনকী পারলে বাদশাকে তেড়েও যেতাম। কিন্তু জাহাজ না পেয়ে এতই বিচলিত যে যা থাকে কপালে, ফালতু, ফালতুই সই। কোল বয় না, ফায়ারম্যান না, সব আশা আকাঙক্ষা ভেঙে চুরমার।
বললাম, বলবেন তো চাচা, ফালতুটা কী আবার। আমাদের ট্রেনিং-এ ফালতু বলে কিছু ছিল না।
আরে সারেঙসাবের পান তামুক সাজাইবা। গরমজল কইরা রাখবা। সারেঙসাবের ফোকসাল ঝাট দেবা। কাম কিছু বেশি না। আরাম আছে।
কপালে মানুষের যে কী লেখা থাকে, নাহলে ফালতু হতেই বা রাজি হয়ে গেলাম কেন!
আর কী করতে হবে। জামাকাপড় সারেঙসাবের কাচাকাচির কাজ। তবে বাবুর্চির কাজ করতে হবে না জানি। গ্যালিতে সবার রান্না হয় একসঙ্গে। সব জাহাজেই তিনটে গ্যালি থাকে। এনজিন-রুম-জাহাজিদের গ্যালি, ডেক-জাহাজিদের গ্যালি। সবচেয়ে ইজ্জতের গ্যালি চিফ কুকের। জাহাজের অফিসারদের খাবার তৈরি হয় চিফ কুকের গ্যালিতে। সে যাহোক রাজি হয়ে গেলে বাদশা বলল, লেখাপড়া জানা আছে!
লেখাপড়া দিয়া কি হইব!
আরে ব্যাডা বাঙ্গালিবাবু তুমি, লেখাপড়া জান না!
