আমরা এখন নেমে গেছি, যে যার বন্দরে। ঘরসংসার করছি—অথচ জাহাজটা যায়, আমার নির্জন একাকীত্বের মধ্যে টের পাই জাহাজটা সমুদ্রে ভেসে যায়। কেমন তখন ঘোরের মধ্যে পড়ে যাই। সব স্পষ্ট মনে করতে পারি।
লেখালেখি-জীবনে এসে প্রথমেই বাদশা মিঞাকে নিয়ে পড়েছিলাম। গল্পটার কী যে খামতি থেকে গেল, জমল না।
আবার লিখলাম, মনে হল বাদশাকে অপমান করেছি গল্পটা লিখে। মূল কাহিনি থেকে যাচ্ছে ঠিক, কিন্তু শুধু কাহিনি তো গল্প হতে পারে না। কিছু গোপন ইঙ্গিত অথবা আভাস থাকে, অথবা কোনো রহস্যময়তা, যা আলো এবং সলতের ফারাক। সলতেটা কাহিনি, আলো লেখকের হাতে। জ্বেলে দিলেই চলবে। সলতেটা বার বার তুলছি, কিন্তু আলো জ্বালা যাচ্ছে না। সলতেটা পর্যন্ত কাহিনি, আলো জ্বলে উঠলে গল্প।
এবারের চেষ্টা, আলো জ্বালার। নিজের দিকে তাকালে বুঝি বাদশা সত্যি নিরপরাধ। জাহাজে তাকে কত না ধিক্কার দিয়েছি। ফুল কে না ভালোবাসে।
এক লজঝড়ে জাহাজে বের হয়ে পড়েছিলাম। দেশে আবার কবে ফিরব জানি না। জাহাজে ওঠার সময় আমরা আলাদা সব মানুষ। কেউ পূর্বপরিচিত না। অথচ জাহাজে থাকতে থাকতে কী করে যে এত ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলাম সবার!
বাদশা ছিল আমার অকৃত্রিম সুহৃদ।
বয়েসের ফারাক ছিল অনেক। একজন তরুণ যুবা, অন্যজন প্রৌঢ়।
বাদশা ছিল এনজিন-রুমের ছোটো টিণ্ডাল। তার পরী’তেই আমার কাজ। জাহাজে এনজিন-ক্রুদের চার ঘন্টা করে ওয়াচ। জাহাজিরা ওয়াচ বলত না। বলত ‘পরী’। মানুষটা দিলখোলা। পান জর্দা আর দোক্তাপাতা ছাড়া অন্য কোনও নেশা ছিল না। অবশ্য আর একটা নেশা ছিল-বাদশার অন্তরঙ্গ না হলে তা জানা যেত না। এখন নিজের প্রায় প্রৌঢ় বয়েসে বুঝি নেশাটা না থাকলে মানুষের বেঁচে থাকা অর্থহীন। তাই নিয়ে এই গল্প।
মানুষটা শুধু দিলখোলা বললে ভুল হবে, প্রচণ্ড ধর্মভীরু। পাঁচওয়াক্ত নামাজ কাজের ফাঁকে সেরে নিত।
সেই কবে থেকে জাহাজে সফর করছে ঠিকঠাক বলতে পারে না। তবে যুদ্ধের আগে থেকে করছে এটা বলতে পারত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে, ডারবানের কাছে কিছুদিন আটক ছিল এমনও খবর দিয়েছে। হেন বন্দর নেই যেখানে সে যায়নি। ক্ল্যান লাইন, সিটি লাইন সব লাইনেই সে কাজ করেছে।
সেবারে সে আমার সঙ্গে ব্যাঙ্ক লাইনের জাহাজে উঠে এসেছিল। আমাদের জাহাজটার নাম এসএস টিবিড ব্যাঙ্ক। সে আমার ওয়াচের টিণ্ডাল। ওয়াচে স্টিম ঠিক রাখার দায়িত্ব তার। মোষের মতো খাটতে পারে। ঝড়ের সমুদ্রে এনজিন রুমে স্টিম নিয়ে মারমার কাটকাট অবস্থা—স্টিম নেমে যাচ্ছে, টন টন কয়লা হাঁকড়েও বয়লারের স্টিম ঠিক রাখা যাচ্ছে না। তখন বাদশা মিঞা কেমন পাগলের মতো ছোটাছুটি করত। ফায়ারম্যানদের গালিগালাজ করত। উপরে সিঁড়ি বেয়ে কয়লার বাঙ্কারে ঢুকে যেত। কয়লা সুটে ফেলে দম নিতে পারছি না, হড় হড় করে কয়লা নেমে যাচ্ছে। তখন বাদশা ছিল আমার কাছে ঈশ্বরের মতো। সে বেলচায় কয়লা তুলে বলত, যা নিয়ে যা। মেডিসিন-কার ভরতি করে দিত কয়লায়। আমি ঠেলে নিয়ে সুটে ফেলতাম। ঝড়ে জাহাজ টালমাটাল—দাঁড়াতে পারছি না, টলছি, কখনো উপুড় হয়ে পড়ে যেতাম, বাদশা টেনে তুলত আমাকে। সে আমার হয়ে সুটে কয়লা ফেলত। বলত, উঁইগুলোলের নীচে বসে হাওয়া খা। গতরে জোর পাবি।
আবার নীচে ছুটত। ফার্নেসে গনগনে আঁচ। স্লাইস মেরে কিংবা র্যাগ ঢুকিয়ে কয়লা উলটে পালটে দিয়েও রেহাই নেই। হাওয়া ভালব ছেড়ে দিয়ে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকত স্টিম গ্যাজের দিকে। পলক পড়ত না চোখে। জাহাজে ওঠার সময় বাদশাকে পাত্তা দিইনি। মাস্তারে দাঁড়িয়েছি। সবে ভদ্ৰাজাহাজে ট্রেনিং-এর পর সি ডি সি হাতে এসেছে। জাহাজে ওঠার ছাড়পত্র। কিন্তু ছাড়পত্র থাকলেই জাহাজে ওঠা যায় না। টের পেলাম দিনের পর দিন মাস্তারে দাঁড়িয়ে। সিপিং অফিসের লাগোয়া রাস্তা পার হয়ে বড়ো বড়ো টিনের চালা প্ল্যাটফর্মের মতো। সামনে সবুজ ঘাসের মাঠ। কিছু গাছপালা। এপ্রিল মে-র মাঝামাঝি সময় দুপুরের ঠাঠা রোদুরে গিয়ে দাঁড়াই। শিপিং অফিসের বোর্ডে কে লিখে যায়, ক্ল্যান লাইনের জাহাজের নাম।
রিক্রুট হবে।
বোর্ডে নাম দেখে সবাই দৌড়োয়। এবং লাইনে গিয়ে দাঁড়ালে দেখতে পায়, জাহাজ থেকে সাহেবসুবো মানুষ নেমে এসেছেন। নুয়ে নলি (সি ডি সি) দেখছেন। কার কত সফরের অভিজ্ঞতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। কে কোন পদে ক-টা সফর দিয়েছে জাহাজে, নলিতে’ সব উল্লেখ থাকে। জাহাজের কাপ্তান কিংবা চিফ ইঞ্জিনিয়ার নলি দেখেন, অভিজ্ঞতা দেখেন, শরীর দেখেন, তাগদ কত আছে লক্ষ করেন—তারপর পছন্দ হলে লাইনে চিরকুট ধরিয়ে দেন, পছন্দ না হলে দেন না।
জাহাজের নাম কখনো বোর্ডে সপ্তাহকাল আগে লিখে দেওয়া হত। শিপিং অফিসে ঘোরাঘুরি। কখন কোন জাহাজে কোন অফিসার খুশি হয়ে চিরকুট ধরিয়ে দেবেন সেই আশায় ঘোরাঘুরি।
আমিও ঘুরছি।
রোজ বেলেঘাটা থেকে সকালে হেঁটে চলে যাই। ফিরি বিকেলে।
কেউ আমাকে পছন্দ করে না। জাহাজ পাই না।
বলতে গেলে জাহাজে কুলিকামিনের কাজ—একজন ভদ্রঘরের সম্ভ্রান্ত মুখচোখের আঠারো–উনিশ বছরের তরুণকে সাহেবদের মনে ধরতে নাই পারে। পারবে না। বড় হাড্ডাহাডিড়। কয়লার জাহাজ হলে তো আরও কঠিন। জাহাজে উঠে শেষে এটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম।
