রাস্তা পার হবার মুখে সনাতন বুলির মুখে চুমু খেল। তারপরই মনে হল কে যেন যায় গাড়িতে। বুঝি মা এবং সঙ্গে কে যেন। সে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ঘরে ফিরে এল। কিন্তু আশ্চর্য ঘরে ফিরে দেখল ফেরেনি। বারান্দায় কাঁথা বালিশের ভিতর বুড়ি তেমনি পুঁটলি পাকিয়ে আছে। ওর খিধে পেয়েছে, বুলির খিধে পেয়েছে। বুড়ি দিদিমা উঠে এখনও শুকনো রুটি করতে বসছে না। সে ক্ষেপে গেল। ক্ষুধায় কাতর। গলা শুকনো। মা নেই ঘরে। মানুষটা কবে আসবে-শীতের পাতা ঝরতে আরম্ভ করছে অথচ মানুষটা আসছে না। হতাশায় ওর কান্না পাচ্ছিল। সে ডাকল, দিদি, ও দিদি। ওঠ। উঠে খেতে দে। কোনো সাড়া-শব্দ নেই। শীতে কান ভোতা। সনাতনের এবার খিস্তি করতে ইচ্ছা হল-অ দিদি ওঠ। উঠে খেতে দে। না কোনো লক্ষণ নেই ওঠার। সে ক্ষোভে দুঃখে লাথি মারল কাঁথা বালিশে। তার পায়ের সঙ্গে সরে এল। দেখল, একটা মুখ, চোখে ঘোলা দৃষ্টি, নির্জীব, হা আমার সনাতন রে বলে ভ্যাঁক করে কেঁদে দেবার মতো মুখ করে রেখেছে বুড়ি। সনাতন ভয় পেয়ে ছুটবে ভাবল, আর তক্ষুনি গাড়ির শব্দ। মা একা ট্যাকসি থেকে নেমে আসছে। তাড়াতাড়ি সনাতন কি করবে কিছু ভেবে পেল না। কোথায় রাখবে বুলিকে, তাড়াতাড়ি কিছু করতে হয়। মা এসে যাচ্ছে। মার পায়ের শব্দ। সে কেমন হকচকিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি সে প্রতিদিনের মতো ঘরের অন্ধকার জায়গাটায় একটা হাড়ির ভিতর বুলিকে ঢুকিয়ে দিল। মালসা সে পেল না। লাফ মেরে বুলি বের হয়ে আসতে পারে। সে অগত্যা বুড়ির কাঁথা টেনে হাড়ির মুখটা জোরজার করে বন্ধ করে দিল। তাড়াতাড়ি করার জন্য কি যে হয়ে গেল কুকুরটার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। মা এসে বারান্দায় তখন হাউ মাউ কাঁদছে। বিকালে শ্মশানে কারা যেন গেল। মা টাকা গুণে দিলেন। দুবার তিনবার সে ভেবেছে, দুবার তিনবার কেন, সে বার বার ভেবেছে একবার সন্তর্পণে উঁকি দিয়ে দেখে তার সেই প্রিয় বুলি কেমন আছে। কিন্তু মা। আজ ঘর থেকে কিছুতেই বের হচ্ছে না। নোংরা ঘরদোর সব পরিষ্কার করছে। ধুয়ে পাকলে সব সাফসোফ করছে। হাড়ি পাতিল টানতেই ভিতর থেকে মরা কুকুরছানা বের হয়ে এল। মা কেমন বিরক্ত গলায় বলল হারে এই কুকুরছানা! সনাতন দেখল মার হাতে বুলি একটা মরা ইঁদুরের মতো দোল খাচ্ছে। ঠিক বুড়ি দিদিমার মতো চোখ উলটে আছে।
সে নিজেকে বড়ো নিঃসঙ্গ ভাবল। সে বড়ো একা। সে নিঃশব্দে বুলিকে নিয়ে বের হয়ে গেল। আর তখনই দেখল, সেই জাদুকরের দেশ থেকে মানুষটা এসে গেছে। মার জানালায় দাঁড়িয়ে কী তার প্রাপ্য ছিল, তা এখন ফিরে পেতে চাইছে। মা জানালা বন্ধ করে দিয়েছে। তখন মানুষটা পাগলের মতো চাবুক উড়িয়ে দিল বাতাসে। ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। সে পথের ওপর হেলেদুলে ঘোড়া ছুটিয়ে নাচছিল। নটবর ঢোল বাজাচ্ছিল। বস্তির সব ছেলেছোকরারা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটা সনাতনকে ডাকল। সনাতন বুলিকে বগল তলায় রেখে মানুষটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে যেন বলল, তুমি যাবে সেই ফুল ফলের দেশে? তুমি যাবে, যেখানে মানুষ দূরের সাগরে পানসী নাও ভাসায়। তোমাকে আমি নিয়ে যাব। বলে সে ফের নাচতে নাচতে, দুলতে দুলতে ঘোড়ার চড়ে যেতে থাকল। সনাতন পিছনে পিছনে নাচতে নাচতে, দুলতে দুলতে চলে যেতে থাকল। তার অ আ ক খ, দোয়াত কলম, স্বপ্ন দেখা সব পড়ে থাকল ঘরের অন্ধকারে। সে ফুল ফলের জন্য মানুষটার সঙ্গে বড়ো মাঠের উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকল।
সনাতনের মনে হল মৃত বুলিকে, মানুষটা—সেই যে বলে না কোথায় এক জাদুর পাহাড় আছে, পাহাড়ের মাথায় ঝরনা আছে, ঝরনার জলে যাদুর মানুষটা যত দুঃখ আছে পৃথিবীর দূর করে দেবে, বুলির বুকে প্রাণপাখি—সে প্রাণপাখির আশায় মানুষটার পেছনে হাঁটতে থাকল। জাদুর মানুষ বহুরূপী, সাদা কাপড়ের
ঘোড়া আর সনাতন, বগলে তার মরা কুকুরছানা, সকলে তারা বড় একটা মাঠে নেমে গেল। নটবর মাঠে নেমেই জোরে জোরে ঢোল বাজাতে থাকল। যেন সে সকলকে বলে বলে চলে যাচ্ছে, শীতের শেষে সূর্য উঠলে আবার আমরা এ-শহরে তাজা কুকুর নিয়ে চলে আসব।
ফুলের বাস
গল্পের কোনো কোনো চরিত্র আমাকে কুহকে ফেলে দেয়। গল্পে সে কিছুতেই ঠিকঠাক উঠে আসে না। তাকে ঠিক ধরা যায় না। কাহিনি হয়, কিন্তু সত্য প্রকাশ হয় না। আমার সৃষ্ট চরিত্র বাদশা মিঞা মাঝে মাঝে এভাবে তাড়া করে। তখনই মনে হয় গল্পে তার প্রতি এতটা নিষ্ঠুর না হওয়াই ভালো ছিল। বাদশা আমার সঙ্গে একই জাহাজে সমুদ্র সফরে বের হয়েছিল। তবে আমার নতুন সফর। জাহাজে তার সফরের সংখ্যা গোনাগুণতিতে শেষ ছিল না। কখনো কড় গুনে বেলত দেড় কুড়ি আবার সোয়া কুড়ি—তবু আন্দাজে বুঝেছিলাম, বিশবাইশ সফর সে করেছে।
আমার তখন বয়েস কম। বাড়িঘর ছেড়ে খুব বেশি একটা বাইরে যাইনি। কলেজে সবে ঢুকেছি—অভাব-অনটনের সংসারে কলেজে পড়া বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ে ভাবতেই রুজিরোজগারের আশায় বাড়ি থেকে নিখোঁজ হই।
কপাল-ফেরে আমার চাকরিজীবন শুরু জাহাজে। কী করে, কেমন করে তার গল্প এখন নয়। বলা অকারণ হবে বলেই বাদ দিচ্ছি।
সেসব কবেকার কথা। আবছা সব মনে পড়ে। বাদশার বয়েসটাকে প্রায় ধরে ফেলেছি। এ-বয়েসে চুপচাপ বসে থাকলে দেখতে পাই জাহাজটা যেন নিরবধিকাল ধরে চলছে। মালবাহী জাহাজের নাবিক আমরা।
