বুড়ির কথা মনে হলেই শীতের কথা মনে আসে। এখন এই শীতে গাছে গাছে পাতা ঝরার সময়। পাতা ঝরার সময় হলেই মানুষটা তার সাদা ঘোড়া নিয়ে চলে আসবে। সহসা ঢোল বাজলে মনে হবে ঘোড়াটা পথের ওপর নাচছে। বাঁশের কঞ্চিতে কাপড় দিয়ে তৈরি ঘোড়া, সাদা ঘোড়া—ঘোড়ার মুখে রংবেরঙের লাল নীল হলুদ রঙের রাঙতা, মাঝখানে তার জাদুকর, যেন ঘোড়া তাকায় না কেবল ঘুমায়, ঘোড়ার পিঠে জাদুকর, মাথায় রাঙতার টুপি, ছুটছে তো ছুটছেই। মানুষটা ঘোড়া নিয়ে খেলা দেখায়, জাদুর খেলা। চিঁহি চিঁহি করে ডাকে, আর দু-পয়সা এক-পয়সা যার যা সাধ্য দিয়ে দ্যাও চোখে মুখে এমন একটা হাসি লেগে থাকে।
ঘোড়ার খেলা আরম্ভ হলেই দরজা জানালা সব খুলে যাবে। ছেলে-ছোকরারা চারপাশে ভিড় করবে। ঘোড়াটার চারপাশে, যেন এই ঘোড়ার দিগন্ত জোড়া খ্যাতি —ঘোড়া এই সব দুঃখী মানুষদের জন্য কত কিছু নিয়ে এসেছে—খেলনা, ফুল পাতা পাখি, যা কিছু তোমার ইচ্ছা। তুমি ফুল হতে চাও, পাখি হতে চাও? তোমাকে সে সব দিয়ে থুয়ে চলে যাবে। সেই মানুষটা এলেই সে এবার বলবে, তুমি আমাকে সেই বড়ো মাঠে নিয়ে যাবে? মাঠের পাশে নদী থাকবে, কাশফুলের বন থাকবে আর নীল আকাশ থাকবে। একবার মার সঙ্গে ট্রেনে তেমন একটা দেশে আমরা চলে গিয়েছিলাম। বড়ো রাস্তা ধরে হাঁটলেই ওর কেবল সেই দেশটার কথা মনে হয়।
মা যখন বাড়ি থাকে না, দিদিমাই তার সব। সনাতনের তখন মনে হয় সংসারে তারা তিনটি মাত্র জীব। সে, দিদিমা এবং বুলি। মা তখন দূরের মানুষের মতো। তখন মনে হয় মা কেবল সাজতে খুঁজতে ভালোবাসে। আকাশে পাখি হয়ে উড়তে ভালোবাসে। সনাতন যেন সেই বিদেশি মানুষটার মতো অপরিচিত। দেখলেই রাগ হয়, মুখের ওপর জানালা বন্ধ করে দেবার মতো চোখে মা তাকিয়ে থাকে শুধু। সাজগোজের সময় সে কাছে থাকলে মা রাগ করে। বরং তার বুড়ি দিদিমাই তার তখন আপনার জন। মা সেজে গুঁজে বের হলে কে বলবে, এই হচ্ছে সনাতনের মা। সনাতন, দুই বাই একের এ নবীনচন্দ্র লেনের সনাতন-পরনের ইজের ছেড়া, পা ফাটা, চোখে পিচুটি এবং মুখের দুকষে ঘা। আগে আগে রাতে মা না ফিরলে সে বিছানায় বসে কাঁদত, বুড়ি তাড়াতাড়ি লম্ফ জ্বেলে সনাতনের মুখ দেখতে দেখতে ছড়া কাটতমা গেছে বনবাদাড়ে,-বাপ গেছে জাদুর দেশে, লক্ষ্মী ছেলে আমার রাজপুত্র, ঘোড়ায় চড়ে যা উড়ে যা। আরও কী সব সুর ধরে বলত। ছড়া কেটে অন্ধকারে বুড়ি দিদিমা ঘুম পাড়াত। ইদানীং কি হয়েছে, শীতের জন্য হতে পারে—কিংবা দুরারোগ্য ব্যাধি এই বুড়ির শরীরে, যার জন্য সনাতনকে মা বুড়ির সঙ্গে শুতে দেয় না। কাঁথা বালিশের ভিতর সারারাত বারান্দায় খোলা ঠান্ডায় কেবল গোঙায়। শীতে কষ্ট পায়। মা বুঝি ইচ্ছে করেই এবার শীতে, বুড়িটাকে মেরে ফেলবে।
রোদ খেয়ে কুকুরটার এখন তাজা প্রাণ। সনাতনের তাজা প্রাণ। কী সুন্দর রোদ। কী উত্তাপ। শরীরের সব ঠান্ডা মরে গেল। কেবল এখন দিদিমার ছড়া মনে আসছে। নিজেকে সুখী রাজপুত্র ভাবতে ভালো লাগে। তার জন্য ছোট্ট একটা আকাশ থাকবে, নদী থাকবে, ফুল ফল থাকবে, সেই মানুষটা এলেই সে সেইসব ফুল ফল পাখির জন্যে নিরুদ্দেশে চলে যাবে।
সে রোদের ভিতর কিছুক্ষণ বসে থাকল। খুপরি ঘরে আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। রোদ আসে না ঘরে, মাথার ওপরে প্রাসাদের মতো অট্টালিকা। ছায়া ছায়া ভাব সব সময়। সূর্য আকাশে উঠতে না উঠতেই মরে যায়। মা সেই ঘরকে কতরকমের ছবি দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে। একটা ছবিতে সে দেখেছে, এক পদ্মফুল–নীচে জল, জল কালো। পাশে লম্বা পাহাড়। নীচে রেললাইন। ছোটো ছোটো লাল নীল কাঠের ঘর। সাদা মাঠ, ঠান্ডায় বরফ পড়েছে। রেললাইন দেখলেই একটা ট্রেনের কথা মনে আসে। মা তাকে একবার সুন্দর জামাকাপড় পরিয়ে তারকেশ্বর নিয়ে গিয়েছিল। যাবার সময় সে দূরে একটা গাড়ি দেখেছিল, গাড়িটা থেমে আছে। মা বলছিল, ওটা মালগাড়ি। ওটা চলবে না। থেকে থেকে কেবল ঘণ্টা বাজাচ্ছিল, টংলিং টংলিং। টংলিং টংলিং ঘণ্টা ধবনি শুনলেই তার কেন জানি বাবার কথা মনে হয়। বুকের ভিতরটা ওর কেমন করতে থাকে তখন।
বড়ো পথ ধরে মেয়েরা সব স্কুলে যাচ্ছে। শীতের রোদে ওদের পোশাক কেমন ঝলমল করছে। নীল রঙের বাসে একদল ফুটফুটে মেয়ে বের হয়ে গেল। একটা কাক ডাকছে। দুটো শালিখ উড়ে গেল। দূরে কারখানায় ঘণ্টা পেটার শব্দ। সনাতনের বিস্বাদ লাগছিল—এক্ষুনি আবার ফিরে যেতে হবে। মা রাতে না ফিরলে একটু বেলা করে ফিরে আসে। মা এসে ওকে ঘরে না পেলে মারধোর করে। এমন খোলামেলা পথ, ফুটফুটে মেয়ে, রঙিন সব গাছ ফুল পাখি ছেড়ে ভিতরে নর্দমার মতো একটা অন্ধকার ঘরে ফিরে যেতে খুব খারাপ লাগছিল। ভাবাই যায় না। এত বড়ো একটা সদর রাস্তায় পিছনে দুই বাই একের এ বলে একটা খুপরি ঘর আছে। সেখানে তার বুড়ি দিদিমা কাঁথা বালিসের ভিতর ঠান্ডায় শক্ত হয়ে আছে।
ঘরে ফেরার মুখে সনাতন বুলিকে চাদরের তলায় লুকিয়ে ফেলল। যেন এই বুলির সঙ্গে সনাতনের একটা গোপন সলাপরামর্শ আছে। মা ঘরে আছে টের পেলেই চাদরের নীচে বুলি ভালো মানুষ হয়ে যায়। সন্তর্পণে সে বুলিকে ভাঙা তক্তপোষের নীচে হাড়িকুড়ির ভিতর লুকিয়ে ফেলে। মুখে একটা মালসা চাপা দিয়ে রাখে। মা যতক্ষণ বাড়ি থাকে ততক্ষণ সে বুলিকে লুকিয়ে লুকিয়ে শুকনো রুটি পাঁউরুটির অংশ, ছোলা ভাজা অথবা মুড়ি যা কিছু ওর ভাগে আসে, তার অংশ দেয়। বুলি চুপচাপ অন্ধকারে—যেন সে মৃত এক জীব, এই সংসারে তার অস্তিত্ব আছে বোঝাই দায়। মা ঘরে ফিরলেই দেখতে পায় সনাতন ভালো ছেলের মতো দোয়াত কলম নিয়ে বসেছে। সে অ আ ই ঈ লিখছে। মা তখন টেরই পায় না, এ-ঘরে একটা কুকুরছানা আছে।
