মা রাতে আজ ফেরেনি। ফিরলে কুকুরটাকে বুকে নিয়ে শুতে পারত না। জানালাতে এখন শীতের সূর্য উঁকি মারছে। কিছু পাখি উড়ছিল আকাশে। ঘর থেকে তাড়াতাড়ি বের হবার জন্য জানালায় শীতের সূর্য দেখল, আকাশে কিছু পাখি উড়তে দেখল। এই সব দেখলেই ওর সেই মানুষটার কথা মনে হয়। সামনে একটা ঘোড়ার মুখ, পেছনে লেজ, মাঝখানে মানুষটা বহুরূপী সেজে আছে। তখন ঢোল বাজে। নটবর ঢোল বাজায়। দুপাশের দরজা জানালা খুলতে থাকে। মা শুধু জানালাটা বন্ধ করে রাখবে। সনাতনকে বের হতে দেবে না। বের হলেই তিরস্কার করবে—কোথাকার কোন এক মানুষ, তুমি সেখানে যাবে না সনাতন। ওরা ভালো লোক নয়। ওরা তোমাকে নিয়ে দেখবে কোথাও একদিন চলে যাবে।
কুকুরটাকে সে পথ থেকে কুড়িয়ে এনেছে। শীতের ঠান্ডায় কুকুরটা মরে যাচ্ছিল। সে ওকে সামান্য উত্তাপ দিয়ে বাঁচিয়ে তুলেছে। মা বাড়ি না থাকলে শীতের রোদে সে কুকুর নিয়ে বসে থাকে। বুড়ি দিদিমা সনাতনকে শুকনো রুটি করে দেয়। রোদে বসে সনাতন কুকুরের সঙ্গে রুটি ভাগ করে খায়। মা আজ রাতে ফেরেনি। কোনো কোনোদিন মার এমন হয়। সেই যে শীতের মানুষটা খেলা দেখিয়ে চলে গেল আর আসেনি। আগে মানুষটা প্রায়ই আসত খেলা দেখাত। মানুষটা যেন এক হ্যামেলিনের বাঁশিয়ালা—যায় যায় নদীতে নেমে যায়। কোথায় যেন কোন গল্পে সনাতন মার কাছে শুনেছে কত হাজার লক্ষ ইঁদুর নিয়ে মানুষটা চলে গেল। তারপর কি এক কারণে হাজার লক্ষ সহরের ছেলেমেয়ে নিয়ে পাহাড় ফাঁক করে ভিতরে ঢুকে গেল। মানুষটাকে দেখলেই মার বুঝি এমন কিছু মনে হয়। তখন মা সাজতে গুজতে বসে যায়। উঁচু করে খোঁপা বাঁধে। বড়ো করে কপালে টিপ দেয়। কপালে টিপ পরলেই মাকে খুব ভালো লাগে, তখন সে মাকে ছুঁতে পারে। মার সঙ্গে কথা বলতে পারে। কিন্তু আতর মাখা শাড়ি পরলেই মাকে যেন আর চেনা যায় না। বড়ো দূরের মনে হয়। মা তখন বোকা সনাতনকে কাছে ঘেসতে দেয় না। যেন মার সারা শাড়ি ব্লাউজে ছুঁয়ে দিলে দাগ লেগে যাবে। সে মাকে কিছুতেই আর ছুঁতে সাহস পায় না। কেবল মনে হয় এ শীতে ঠিক মানুষটা জাদুর ঘোড়া নিয়ে চলে আসবে। ঘোড়ার খেলা দেখাবে। সে ঘোড়ার চড়ে নিরুদ্দেশে চলে যাবে।
সনাতন তার কুকুরটার জন্য বাবুদের বাড়ি থেকে একটা শেকল চুরি করে এনেছে। সে আর ভয়ে ওমুখো হচ্ছে না। গেলেই বাবুদের বড়ো ছেলে ওর হাত পা বেঁধে মারবে। সে শেকলটাকে কুকুরের গলায় পরিয়ে চুপি চুপি বের হয়ে গেল। বস্তির পথ সদরে গিয়ে পড়েছে। সে সদর রাস্তায় পড়ে ট্রাম বাস দেখতে পেল। এই বড়ো রাস্তায় এসে পড়লেই সনাতনের মন প্রসন্ন হয়ে ওঠে। বড়ো রাস্তায় দাঁড়ালে সে মন্দিরের চূড়া দেখতে পায়। মন্দিরের চূড়ায় রোদ নামলে সব কিছুই নির্মল মনে হয়। ওর তখন ভিতরে ভিতরে একটা পবিত্র ভাব জাগে। বাবুদের শেকলটা সে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে—এমন ভাবে।
সে রাস্তা ধরে কুকুরটাকে নিয়ে ছুটবে ভাবল। ছুটলে শীত কমে যায়। রাস্তা পার হলে মন্দির, খোলা মাঠ, মাঠ কত বড়ো, কতদূরে চলে গেছে, সে মন্দিরের চাতালে চুপচাপ বসে থাকতে ভালোবাসে। সে ভাবল আজ আর মন্দিরে গিয়ে হাত পাতবে না। কুকুরটাকে নিয়ে চাতালের একপাশে বসে খোলা আকাশ দেখবে। বস্তির ঘরে থেকে সে বড়ো আকাশ দেখতে ভুলে গেছে। যখন ওর কিছুই ভালো লাগে না, যখন মা বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশে যায়, বুড়ি দিদিমা কেবল, সনাতন মন্দিরে যা, মন্দিরে যা করে তখন ওর সেই মানুষটার মতো কোথাও চলে যেতে ইচ্ছা করে। ফুল ফল পাখি দেখার ইচ্ছা হয়। অথবা মন্দিরের ও-পাশে যে বড়ো মাঠ আছে সেখানে চুপচাপ বসে আকাশে পাখি ওড়াতে ইচ্ছা যায়। কবে যে সেই মানুষ আসবে, নটবর ঢোল বাজাবে-ঢোল বাজালে সে পাছায় হাত রেখে মার জানালার সামনে ঘুরে ঘুরে নাচতে পারবে।
বের হবার মুখে সে দেখে এসেছে, বুড়ি দিদিমা বারান্দায় একপাশে ছেড়া কাঁথার ভিতর কেমন গুটিশুটি দলা পাকিয়ে আছে। অন্যদিন বুড়ি সকাল সকাল উঠে সনাতনকে ডেকে দেয়। মন্দিরের পথে পুণ্যর্থীরা যায়। সনাতন তাদের কাছ থেকে দু-পয়সা এক পয়সা মেগে আনে। মেগে আনলে ওরা দুজনে মাকে লুকিয়ে চানা ভাজা অথবা বাদাম ভাজা এবং সুদিনের সময় ফুচকা খেতে খেতে বুড়ি বসে বসে টবকা টবকা কথা কয়। বুড়ি যেন আরে-ঠারে মার সম্পর্কে কী বলতে চায়। সনাতন বড়ো হয়ে যাচ্ছে, বুড়ি বুঝি বুঝতে পারছে। ওর বাবার কথা বুড়ি কিছুতে বলে না। বাবাকে সে কোনোদিন দেখেনি। পৃথিবীতে মার একমাত্র রাগ সেই মানুষটার ওপর। শীতের দেশ থেকে যেন মানুষটা মা-র জানালার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। বাবার কথা বুড়িকে শুধালে তর তর করে বুড়ি অন্য কথা টেনে আনে। তখন মনে হয় বুড়ি বড়ো সেয়ানা। মা বাড়ি থাকলে, কোনোদিন সাহস পায় না বলতে, যা একবার মন্দিরে যা, মা লক্ষ্মীরা যাচ্ছে। গিয়ে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাক।
মার কেন জানি ইচ্ছা সনাতন ছোটোলোকের মতো হাত পেতে ভিক্ষা করবে। সনাতন মানুষ হবে। সনাতনকে বিদ্যাশিক্ষার জন্য মা দোয়াত কলম কিনে দিয়েছে।
রোদের ভিতর ওর হাঁটতে ভালো লাগছিল। কুকুরটা আগে আগে যাচ্ছিল। বড়ো মাঠ, খোলা আকাশ, দেখতে পেলেই ওর মনে নানা রঙের ফুলঝুরি ফুটতে থাকে। হাতে তার শেকল, সামনে তার পোষা কুকুর। মা, আজ রাতে ফিরে আসেনি। রাতে মা না ফিরলে সে জানে তার প্রাপ্য মায়ের কাছে সেদিন বেশি। মা পাউরুটি কিনে আনে, কলা কিনে আনে। মাকে বড়ো ক্লান্ত দেখায়। চোখ মুখ বিষণ্ণ। যেন মা সারারাত পথ হেঁটেছে। সারারাত মার চোখে ঘুম ছিল না। মা তখন কত ভালো কত সুন্দর। বুড়ি দরজার ও-পিঠে বসে থাকে। আর চুপি দিয়ে দ্যাখে, মা তাকে কী খাওয়াচ্ছে। এই ভালো খাওয়াটুকু দেখলে বুড়ির জিভে জল আসে। বুড়ির চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যায়। সনাতন রে, সনাতন—তোর মা তোকে কত ভালো খেতে দেয়। তার মা চলে গেলে মন্দিরে যা সনাতন, আমার জন্য কিছু চেয়ে নিয়ে আয়?
