জানালায় শঙ্করী দাঁড়িয়ে থাকলেই বলতেন, চলে আসবে।
শঙ্করীর খুবই ব্যাকুল কথাবার্তা।
বাবু মাস তো শেষ হয়ে গেল।
আসবে। কত কাজে আটকে যেতে পারে। পালাগান গায় যখন, এক জায়গায় আটকে থাকার পাত্র সে নয়। কোথাও গ্যাছে, দু-চারদিন দেরি হতেই পারে। মচ্ছব থাকলে, তো কথাই নেই। খাওয়ার লোভ ভাদুর বেশি মাত্রাতেই। খাওয়ার লোভে পড়ে গেছে হয়তো।
দিন যায়। ভাদু আর আসে না।
মাস যায়, ভাদু আর আসে না।
দশ ক্রোশ রাস্তা, হাঁটাপথে। বাসটাসের। রাস্তা হলেও না হয় এক কথা ছিল, শঙ্করীর কেমন পাগল পাগল অবস্থা। পরপর দু-মাস বেপাত্তা থাকলে চিন্তা হওয়ারই কথা। শঙ্করী বাবুকে ফেলে যেতেও পারে না। তার খাওয়াদাওয়ায় রুচিও যেন নেই—একদিন সেই পাগল পাগল অবস্থাতেই শঙ্করীর হঠাৎ কী হল। সকালবেলায় চা-জলখাবার দেওয়ার সময় সহসা বলে ফেলল, বাবু আমি ঘুরে আসব। মন মানছে না। দু-চারদিন একটু কষ্ট হবে আপনাদের। আমারও মরণ। মন মানছে না। ঠিকা কাজের মেয়েটা তো আপনার আছে, সে-ই না হয় ডাল-ভাত করে দিয়ে যাবে।
নিরু বলেছিল, যাও। সত্যি তো ভাদুর আক্কেলখানা কি, আসতে পারছিস না, একটা খবর তো দিবি! চিন্তা হয় না। আমরা ঠিক চালিয়ে নিতে পারব। অসুখ বিসুখ হতে পারে। তুমি বাড়ি থেকে বরং ঘুরেই এস।
শঙ্করী গেল ঠিক, তারও পাত্তা নেই।
যে গেল খুঁজতে, সেও বেপাত্তা।
ঝড়েশ্বর পড়ে গেলেন মহাফাঁপরে।
আবার চব্বিশ ঘণ্টার কাজের লোক খোঁজা, পাওয়া যায়, তবে শঙ্করীর মতো বিশ্বাসী মানুষ পাওয়া কঠিন। অগত্যা তিনি নিজেই রওনা হবেন ঠিকঠাক যখন, শঙ্করী নিজেই এসে হাজির। সেই এক পাগল পাগল অবস্থা।
সে এসেই বাবুর পায়ে পড়ে গেল।
কী হয়েছে?
শঙ্করীর এক কথা, বাবু গো, গোঁসাই আমার কোথায় নিখোঁজ হয়ে গেছে।
বল কি! কোথায় যাবে। পাড়া-প্রতিবেশী কেউ জানে না, তোমার ছেলেমেয়েরা কেউ জানে না, কোথায় গেছে?
না গো বাবু, কেউ কিছু বলতে পারে না। ঘর তালাবন্ধই পড়ে আছে। ঘর খুলে খুঁজেছ!
কী খুঁজব?
তোমার পাসবই রেখে গেছে কিনা?
আজ্ঞে মানুষটাই নিখোঁজ, আমার পাসবই দিয়ে কী হবে গো বাবু। আপনি কেন আমার এত বড় সর্বনাশ করলেন গো বাবু। কী দরকার ছিল, পাসবইয়ের কথা বলার! এখন আমি তাঁরে কোথায় খুঁজে পাই?
ঠিক আছে, স্নানটান করে কিছু খাও। পরে ভেবেচিন্তে কিছু না হয় করা যাবে।
আমার যে খেতে ইচ্ছে করে না। কেবল তারে খুঁজে দেখতে ইচ্ছে করে। কোথায় না গেছি! কীর্তনিয়া ঠাকুর প্রসাদের কাছে গেলাম, কোনো খবরই দিতে পারল না। কত জায়গায় গেলাম, কেউ কিছু জানে না। গোঁসাই কার কীর্তনের পালায় গান গাইত তাও কেউ বলতে পারল না একটা খবর আছে, দেশের টানে বর্ডার পার হয়ে যদি চলে যায় আপনাকে খবর না দিলেও নয়, বর্ডার পার হয়ে চলে যাব। গোঁসাই ভেবেছে কী— মন তার উদাস বুঝি। আমি মানুষ না!
ঝড়েশ্বর আর একটাও কথা বললেন না।
তবু ঝড়েশ্বরের যে কী হয়!
শোন।
শঙ্করী মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিল, ফোঁপানি কিছুতেই কমছে না, বাবু যত নষ্টের গোড়া, পাসবইয়ের পেছনে লেলিয়ে না দিলে, গোঁসাই কখনো দেশান্তরী হত না। ঝড়েশ্বর না বলে পারলেন না, পাসবইটা কি পেলে? সে তো না হয় চলে গেছে। এতগুলি টাকা, ঘরে রেখে গেছে কিনা খোঁজাখুঁজি করলে না! তোমার ছেলেমেয়েদের কাছে যদি রেখে যায়—
না গো বাবু, গোঁসাই তার সুটকেস নিয়ে চলে গেছে। গোঁসাই তো বলেছে, পাসবই সুটকেসে তালা দেওয়া থাকে।
নাও ভালোই হয়েছে। মন খারাপ করে কী হবে? হাতমুখ ধুয়ে কিছু খাও। চেহারা কী করেছ! চোখমুখের দিকে তাকানো যায় না। দেখি পুলিশ তোমার পাসবই যদি উদ্ধার করতে পারে। উজ্জ্বলকে ফোন করে, আসতে বলি।
বাবু গো আপনি আমার আর সর্বনাশ করবেন না গো বাবু! পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা। আমি নিজেই খুঁজতে বের হব।
তাহলে কি কাজ ছেড়ে দিচ্ছ!
না না। খুঁজে পেলেই চলে আসব। মাসের টাকাটা যদি আগাম দেন।
নিরু দরজায় দাঁড়িয়ে সব শুনছে।
ঝড়েশ্বর স্ত্রীর ওপরই খাপ্পা হয়ে গেলেন।
নাও বোঝ—প্রাণের সাড়া বাড়িটায় কোথায় গেল! তিনি তো চললেন।
শঙ্করী এখুনি কেমন বেপরোয়া হয়ে গেল—আমি যাচ্ছি না গো বাবু। আমাকে ছাড়িয়ে দেবেন না। গোঁসাই আমাকে ফেলে যাবে কোথায়! জায়গা আছে তার। এত মান-অপমান থাকলে হয়! বাবু কি মিছে কথা বলেছে, পাসবই বলতে কথা। ঠক-জোচ্চরের অভাব নেই, বাবু পাসবইটা দেখতেই পারে। সেই রাগে দেশান্তরী! তোমারে সন্দেহ করছে বাবু!
শঙ্করীর এমন সব কাণ্ডে নিরু ফুঁসছে!
দাও বিদেয় করে। ধর আগাম টাকা। খোঁজ গিয়ে তোমার গোঁসাইকে।
গোঁসাইকে খুঁজতে সেই যে গেল আর শঙ্করীও ফিরে এল না। ঝড়েশ্বরও আর খোঁজ নিলেন না। না, চব্বিশ ঘণ্টার লোকের আর দরকার নেই এমনও ভেবেছিলেন—নিজের কাজ নিজেরাই করে নেবেন। এত বড়ো বাড়িটায় দুটো জীব একা থাকাও যে কঠিন। লোকজনও আসে দরজা খোলা বন্ধ করার কাজটাও কম না। নিরু শেষ পর্যন্ত আর একটাকে নিয়ে এল—আর কিছু না হোক কেউ এলে, নিভা কিংবা মায়া, যেই আসুক দরজা খুলে দিতে পারবে, কাজ সেরে চলে গেলে দরজা বন্ধও করতে পারবে। এই বয়সে বারবার সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামা-ওঠাও কম হ্যাপা না।
ফুল ফলের জন্য
জানালা খুলতেই রোদ এসে পড়ল ঘরে। শীতে সারারাত কষ্ট পেয়েছে সনাতন। ঠান্ডা, হিম ঠান্ডায় ওর হাত পা ক্রমে যেন স্থবির হয়ে আসছিল। কুকুরছানা বুকে নিয়ে শুয়েছে। এত ঠান্ডা যে, কুকুরটা পর্যন্ত বুকের কাছে কুঁই কুঁই করেছে সারারাত। এই রোদ ওকে সামান্য উত্তাপ দিল শরীরে।
