কে বলেছিল অসময়ে ওপরে যেতে। বাড়িটায় এটুকু প্রাণের সাড়াও তুমি সহ্য করতে পার না। কেউ থাকে। পালাবে না। তোমার ঘটে এটুকু এলেমও নেই। দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষ, ওরা দিবানিদ্রা দিচ্ছে আর তুমি গিয়ে সেখানে হাজির হলে। তোমার কোনো কাণ্ডজ্ঞান আছে! তার পাসবই গেল কি থাকল, তোমার কী? শঙ্করী তো কচি খুকি না! সে তার নিজের ভালোমন্দ না বুঝলে তোমরা কী? তার গোঁসাই তারে মারে কি রাখে, সে বুঝবে।
ঝড়েশ্বর চুপচাপ শোনেন, কোনো মন্তব্য করেন না। মন্তব্য করলেই নিরুর চোপা শুরু হয়ে যাবে। তবু কী যে হয় তার, একটা দামড়া বাড়িটায় যখন-তখন ঢুকে যাবে, রাত্রিবাস করবে, ভালোমন্দ খাবে, শত হলেও গোঁসাই সে শঙ্করীর। সে এলে শঙ্করী নানা অজুহাতে একটু বেশি বেশিই নানা কিশিমের পদ তৈরি করে—
বাবু, দুধ জমে গেছে। আপনাদের জন্য পায়েশ করে রাখি।
রাখ।
দুধ জমে গেছে, ক্ষীর করে রাখি?
রাখ।
সন্দেশ করে রাখি।
রাখ।
বাজারে যাচ্ছেন, ভালো ইলিশ যদি পান। মাসিমা বলছিল, এ-বাজারে ভালো মাছ পাওয়া যায় না। বাগুইহাটির বাজারে গেলে পাবেন। পদ্মার ইলিশের ছড়াছড়ি।
গোঁসাই এলেই এটা শঙ্করীর বেশি হত।
সব তিনি চোখ বুজে সহ্য করেন। মেয়েটার হাতটান নেই। চুরি করে খায় না। দীক্ষা নিয়েছে গুরুর কাছে—মাগগিগণ্ডার বাজারে এমন কাজের লোক পাওয়া সত্যি কঠিন–নিরুকে কুটোগাছটি নাড়তে দেয় না, নিরু বাথরুমে ঢুকলেই শঙ্করীর এক কথা—মাসিমা ছাড়া কাপড় কাচতে যাবেন না। আমি আছি কী করতে মাসিমা, আমি তো মরে যাইনি।
ঝড়েশ্বর জানেন, পাসবই নিয়ে লড়ালড়ি করতে গিয়ে শঙ্করী যদি হাতছাড়া হরে যায়, তবে তাঁর রক্ষা নেই। তিনি শুধু দেখতে চান, টাকা ঠিকমত তার জমা পড়ছে কিনা। শঙ্করীর রক্ত জল করা পয়সা কেউ না আবার মেয়ে দেয়।
তার তো কোনো খরচ নেই।
শাড়ি সায়া ব্লাউজ যা লাগে দেন।
কাচাকাচির সাফও দেন। শঙ্করীর আলাদা সার্ফ, আলাদা সাবান।
অসুখ-বিসুখে ডাক্তার, ওষুধ—সব কিছুরই ব্যবস্থা আছে। ভবিষ্যতে তার কষ্ট না হয়। শরীর তো, কখন পড়ে যাবে–বুড়ে হলে খাওয়াবে কে? কিছু টাকাপয়সা ব্যাঙ্কে থাকলে সেই লোভে পুত্র-কন্যারা শেষ সময়ে মুখে গঙ্গাজলটুকু অন্তত দেবে। এতসব চিন্তা থেকেই, তিনি শঙ্করীর পাসবই দেখতে চাইছেন।
শঙ্করীর বছর চল্লিশও বয়েস হবে না। মুখে শ্ৰী আছে। খুবই মজবুত গঠন। তার প্রথম সন্তান পুত্র। পনেরো বছর বয়সেই আঁতুড় শুরু। তারপর বছর পার না হতে মেয়ে, তারপর আবার বছর পার না হতে আর একটি মেয়ে, শেষে হেলথ সেন্টার থেকে নাড়ি কাটিয়ে এখন একেবার ঝাড়া হাত-পা। ওতেও শানাচ্ছিল না, বছরখানেক আগে দীক্ষাও হয়ে গেছে। শঙ্করী থাকলে বাড়িটাতে প্রাণের সাড়া থাকে তাও তিনি টের পান, সরলসোজা হলে যা হয়! কথায় কথায় হেসে গড়িয়ে পড়ত। ডাক খোঁজে খুবই আন্তরিক।
সেই মেয়েটার শেষে কিনা পাসবই নিয়ে মরণ হল।
ঝড়েশ্বর এখনও শঙ্করীর জন্য কষ্ট পান।
তার টাকাপয়সা ব্যাঙ্কে জমা হচ্ছে কি হচ্ছে না, তাঁর কী দায়! নিরু বলত, তোমার এই পরোপকারী ভাবটা ছাড়। তোমার বাড়িতে কেউ থাকে!
শঙ্করী বাবুর তাড়াও সহ্য করতে পারছিল না।
কী হল শঙ্করী, বাড়ি যাও।
যাব।
যাব বললে তো আর হয় না, যেহে হয়। বাবু আর মাসিমাকে একা ফেলে যায়ই বা কী করে! খুবই ন্যায্য কথা।
ঝড়েশ্বর বলেছিলেন, ঠিক আছে, ভাদু মাসের শেষে আসে। ওকে বল, বাবু পাসবইটা দেখতে চেয়েছে। আবার যখন মাইনে নিতে আসবে, পাসবইটা সঙ্গে যেন আনে।
বলব। বলে বালতিতে ছাড়া কাপড় ভেজাতে বাথরুমে ঢুকে গেছিল।
গোঁসাই মাসের শেষে হাজির।
ঝড়েশ্বরই বলেছিলেন, তোমার সঙ্কোচ যখন শঙ্করী, আমিই না হয় বলব। কত নিয়মকানুনের বালাই থাকে—ভাদু হয়তো লিখতে ভুল করতে পারে, লেখাপড়া কতটা জানে, তাও জানি না। চোর-বাটপাড়ের তো অভাব নেই। ব্যাঙ্কের বাবুরাও খুব সুবিধের লোক হয় না। কোথায় কি গোঁজামিল থাকবে—ভাদু বুঝতেও পারবে না।
বাবু, গোঁসাই এত কথা বললে রাগ করতে পারে। আপনি বরং বুঝিয়ে বললে কথা ফেলতে পারবে না।
সেইমতো গোঁসাই এলে তিনি বলেছিলেন, ভাদু আবার যখন আসবে পাসবইটা সঙ্গে এন।
তা বাবা, আমি ঠিক আনব। আপনি ঠিকই বলেছেন। ভাদু দু-দিনের জায়গায় চার-পাঁচদিন থেকে যাওয়ার সময় বলে গেল পাসবইটা আপনার কাছেই রাখবেন বাবু, আমি বাড়ি থাকি না, শঙ্করীও ঘরছাড়া, তালাবন্ধ ঘরে রাতে ঢুকে কেউ চুরি করে নিলে আমার ধর্ম থাকবে না। আপনি খুবই বিচক্ষণ ব্যক্তি—পাসবইয়ের এত কি আমরা বুঝি!
ঝড়েশ্বর ভেবেছিলেন, যাক, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। শঙ্করীর কষ্টের উপার্জন, বয়স তো এক জায়গায় থেমে থাকে না, শেষ বয়সের সঞ্চয় বলতে কথা, তাঁর পক্ষে চোখ বুজে থাকাও সম্ভব নয়, শঙ্করীর ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি উচিত কাজই করেছেন।
ভাদু নিজেও একবাক্যে রাজি।
অসুবিধার আর কিছু থাকল না।
ভাদু ঠিক নিয়ে আসবে!
মাসের শেষে শরীরের রোখ দমনও হয়, হাতে টাকাপয়সাও হয়—ভাদু ঠিক চলে আসবে।
বরং মাস শেষ হওয়ার অনেক আগেই চলে আসতে পারে।
দিন যায়।
ঝড়েশ্বর ক্যালেন্ডারের খাতা দেখেন।
কিন্তু ভাদু আসে না।
শঙ্করী জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে। বড়ো রাস্তার মোড় থেকেই বাড়িটা দেখা যায়। ভাদুর আসার কথা থাকলে, শঙ্করীর শরীরেও যে রোখ চেপে যায় ঝড়েশ্বর ভালোই টের পান।
