নিরুরও এক কথা, বিশ্বাসী লোক পাওয়া দুষ্কর। বর আসে, থাকে খায়, তোমার কী? বর আসবে না। ও বেচারারই বা দোষ কোথায়। শরীর বলে কথা।
ঝড়েশ্বরের এক কথা, থাকবে না বলেছি, থাকবে না। বর না কে দেখগে!
অগ্যতা শঙ্করী রফায় এসেছিল।
মাসে বাবু দু-দিন।
দু-দিনে হয়ে যাবে?
তা হয়ে যাবে বাবু। আমরা গরিব মানুষ, দু-দিনই পাই কোথায়!
বর থাকে কোথায়? কাজে ঢোকার সময় তো বলেছিলে সংসারে কোনো পিছুটান নেই। দুই মেয়ে বিয়ে হয়ে গেছে, পুত্রটি তোমার রাজের কাজ করে।
মিছে কথা বলি না বাবু। স্বোয়ামিও নাই। একা মানুষ। এই লোকটাই তো বুদ্ধি দিল, তোর গতর আছে, খেটে খাগে। তোর ঝুপড়ি পাহারা দেব। ব্যাংকে পাসবই করে দেব। বাবুর বাড়িতে খরচ নাই। খাবি থাকবি ব্যাংকে টাকা জমাবি।
তোমার গতর আছে, অন্য লোকে বুঝে ফেলল, তুমি বুঝতে পারনি।
কী করে পারব কন! লোকটা ঝুপড়িতে উঠে না এলে বুঝতেই পারতাম না। নর্ডার পার হয়ে চইলে এল, গাঁয়ের মেয়ে আমি, ছেলেমেয়েরা উড়ে গেছে। পরান খা-খা করে। ভাদু দাদার পরামর্শ, ঘরে বসে থাকিস না পোকায় কাটবে গতর। সকালে এল, ফকটে খেল। তারপর বারান্দায় বসে নীলময় প্রভুর গান জুড়ে দিল। মনে হল লোকটা থেকে গেলে মন্দ হয় না। গরিব মেয়েছেলের কেউ না থাকলে যে বড়ো সমস্যে বাবু। আমার পিছুটান থাকলে কাজে জুড়ে যাই, বলেন।
ঝড়েশ্বরের সহসা মনে হয়েছিল, এই তার দোষ। কাজের লোকের কাছে তিনি ইজ্জত রাখতে পারেন না। এত কথা এত ব্যাখ্যা তাঁর চাওয়া ঠিক হয়নি। চাপে পড়ে শঙ্করী সোজাসুজি বলেই দিল, স্বোয়ামী থাকলে, পোলাপান থাকলে পিছুটান থাকে বাবু। আমার কিছুই নেই। ভাদু দাদা পালাগান গায়, গলায় কণ্ঠি, সাচ্চা মানুষ। দু-চারদিন থাকে দু-চারদিন উড়ে বেড়ায়। পালাগান করতে কোথায় কোথায় চলে যায়। মাস মাইনের সময় আসে। টাকা নিয়ে যায়। ব্যাংকে জমা রাখে।
ব্যাংকের বই আছে তোমার? লেখাপড়া জান?
আজ্ঞে না।
নিয়ে আসবে। দেখব কত জমেছে।
ভাদু দাদা বড়সাধু মানুষ বাবু। ঠাকুর দেবতা নিয়ে কারবার। টাকাপয়সা চিনে না। খেতে পেলেই খুশি।
ঝড়েশ্বর ভাবলেন, তা খেতে পেলেই খুশি। অন্ন কিংবা শরীর। লোকটি শঙ্করীর আসলে রক্ষিতা, রক্ষিতা হয় কী করে, বরং রক্ষিতই বলা চলে। তিনি না বলে পারেননি, মেয়ে-জামাইরা আপত্তি করে না? লায়েক পুত্র আপত্তি করে না?
না গো বাবু, কে দেখে! একটা যখন লোক পাওয়া গেছে, গার্ডিয়ানের মতো আছে, আপত্তির কথা উঠেই না।
ঠিক আছে, আট-দশ মাস তো হয়ে গেল। কত জমেছে আমাকে এসে দেখাবে। তারপর কী ভেবে ঝড়েশ্বর বলেছেন, কত জমেছে বলতে পার।
নিরুর তখন কী ক্ষোভ!
ঝড়েশ্বর পড়ে যেতেন বিপাকে।
নিরুর সেই এক কথা, তোমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে?
শঙ্করীর পেছনে এত লাগলে হয়! তার টাকাপয়সা কী জমছে না জমছে, তুমি দেখার কে? তারটা সে বুঝবে।
না, ভাবছি যদি ঠকায়।
ঠকালে ঠকবে। তার বিশ্বাসের দাম দেবে না! এত পেছনে লাগলে কেউ থাকে! এমন জেরা শুরু করলে, সে বেচারা ফাঁপরে পড়ে সব গড় গড় করে বলে গেল। বোঝ না শঙ্করী কত সোজাসরল মানুষ। না হলে বলে, মাসে তার দু-দিন হলেই চলবে! লোকটা তোমার এখানে এসে যে ওঠে, কখনো মনে হয় খিচকে হারামজাদা? তোমাকে বাবু বলে না, কর্তাবাবুও না, সোজা তোমাকে বাবা সম্বোধন। প্রভু গৌরহরি বলে পায়ে তোমার গড়িয়ে পড়ে। এত সুবন্দোবস্ত আছে বাড়িতে তিনতলায় ফাঁকা ঘর, ফ্যান-লাইট, করিডর পার হলে বাথরুম, অপর্যাপ্ত জল, সে যে এখানে এসে উঠতে চায়, বোঝ না? বাবা বললে তো গলে যাও। তা ভাদু তোমাদের দিকে চালের দর কত? গ্রাম জায়গায় তরিতরকারি মেলা—
আর যায় কোথায়।
বাবা লাউটা গাছের। আপনের সেবায় লাগুক।
বাবা মাচানের শিম। আপনার সেবায় লাগুক।
বাবা, বাজারে ভালো মানচুক উঠল। আপনার সেবায় না লাগলে খেয়েও সুখ নাই।
তুমি তো বিগলিত। আর ভাদু, চলে গেলেই, সোজাসরল বউটাকে নিয়ে পড়। শঙ্করী, আমার বাড়িতে এসব চলবে না। চলে যাও। তোমাকে রাখব না। পিছুটান নেই, এই তোমার পিছুটান না-থাকা! শঙ্করী প্রাইভেসি পর্যন্ত থাকল না! তুমি কী!
শঙ্করীরও রেহাই নেই।
কী হল? বাড়ি যাও। ঝড়েশ্বরের এক কথা।
আপনাদের চলবে কী করে?
এক-দুদিন চালিয়ে নিতে অসুবিধা হবে না।
শঙ্করী না বলে পারল না, মাসিমার শরীর ভালো না।
সে তোমার ভাবতে হবে না। ভাদুকে বলবে, বাবু আমার পাসবইটা দেখতে চেয়েছে। নিয়ে যেতে বলেছে।
শঙ্করীও মুখঝামটা না দিয়ে পারেনি। আমার গোঁসাই রে আপনে সন্দ করেন বাবু। ঠাকুর-দেবতা ছাড়া লোকটা কিছু বোঝে না। পালাগানে একবার গেলে বুঝতে পারতেন, কেষ্ট কীর্তন পালা, গলায় গেঁদাফুলের মালা কপালে তিলক, নাকি তিলক, দু-হাত তুলে দোহারিরা চারপাশে ঘোরে, হারমানিয়াম বাজে। খোল করতাল বাজে আর সমস্বরে গান, হরে কৃষ্ণ হরে রাম, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে তার পরেই গোঁসাইর খাম্বাজ গলা, কহিলা যদুপতি, আমার বালগোপাল যায় ধেনু লইয়া, মথুরায়…। আর মানুষের দু-চোখ বহে যায় অশ্রুতে। আপনে গেলেও আসর সেরে উঠে আসতে পারবেন না। আর পয়সার পুস্পবৃষ্টি, সিকি, আধুলি, টাকা–কী নেই! পয়সার অভাব আছে তার?
আসলে ঝড়েশ্বরেরও গোঁ কম না। মাথায় কিছু ঢুকলে তা নড়তে চায় না। শঙ্করীর টাকাপয়সা থাকল কি গেল, কে ঠকাল শঙ্করীকে তাঁর দেখার কথাই না। কিন্তু ওই যে রোখ, রোখ চেপে গেলে যা হয়, শঙ্করী বিনি মাগনায় পয়সা পায় না। বাড়িটায় সারাদিন বেজায় খাটে, খাটে বলেই টাকাটা দিতে ঝড়েশ্বরের গায়ে লাগে না, তাই বলে মেয়েটার ঘাড়ে বসে খাবে! আর শরীরে রোখ চেপে গেলে দশক্রোস হেঁটে চলে আসবে! দু-দিনের অনুমতি এমনিতেই আছে, তিনতলার ফাঁকা ঘরটায় খাঁটিয়া পাতা থাকেই, বয়স হয়েছে বলে, ঝড়েশ্বর কিংবা নিরু কেউ ওপরে প্রায় ওঠেই না, সিঁড়ি ভাঙলেই হাঁপ ধরে, এমন সুবর্ণ সুযোগ ভাদু ছাড়ে! মাঝে মাঝে সাড়াও পাওয়া যায়, এই শঙ্করী কোথায় গেলে? আরে সাড়া দিচ্ছ না কেন? ঝড়েশ্বর ওপরেও উঠতে পারেন গিয়ে কী দেখবেন, যদি দেখেন মথিত হচ্ছে, তবে আর এক কেলেঙ্কারী। ধরা পড়ে গেলে শঙ্করীর মাথা হেঁট হয়ে যাবে তাঁকে মুখ দেখাতে পারবে না, লজ্জায় কাম-কাজ ছেড়ে পালালেই নিরুর চোপা শুরু হয়ে যাবে।
