এ সব ভাবতে ভাবতেই তাঁর কেন যে মনে হল, পুত্রটি যা নাছোড়বান্দা, ঠিক তুলে নিয়ে যাবে।
তিনি বলেছিলেন, আমি খুঁজছি। তোমার মাও খোঁজ করছেন।
এই খোঁজাখুঁজির ঠেলাতেই শেষবেলায় ফুলি হাজির। শিবানীকে দিয়ে হল না, যদি ফুলিকে দিয়ে হয়। অন্তত সারাদিন তারা ছাড়াও কেউ একজন থাকবে। তাঁদের প্রতি থাকতে থাকতে ফুলির মায়া গড়ে উঠবে। এ বাড়িতে বসবাসের ফের আকর্ষণ গড়ে উঠবে।
তখনই নিরু এসে বলল—কী ঝামেলা বল তো?
কী হয়েছে?
ফুলি বাথরুমে ঢুকতে চাইছে না। দরজা বন্ধ করলেই চেঁচামেচি শুরু করে দিচ্ছে।
কেন! তুমি ওকে বকেছ!
বকব কেন! ওর নোংরা ফ্রক ধুয়ে চানটান করে নিতে বলছি। বিসুনের ধোওয়া ফ্রক প্যান্টি বের করে দিয়েছি। কী নোংরা সব। গায়ে পলেস্তারা পড়ে গেছে।
তুমি পারবে না। একদিনের ঘষামাজার কাজ না। নিভা চলে গেছে? না আছে। কলপাড়ে বাসন মাজছে।
সকালে নিভার কাজ সব ঘর-বারান্দা ঝাড় দেওয়া, মোছা। তারপর এ-বাড়ি সে-বাড়ির কাজ সেরে ফিরে এসে চা-ও খায়, চপাটিও খায়। কলপাড়ে বসে বাসনও মাজে। বেল, আটটা না বাজলে এ বাড়িতে চা-জলখাবার খাওয়া যায় না। তার কাজের চেয়ে জলযোগের লোভ বেশি। বাসন-কোসন মেজে রান্নাঘরে কতক্ষণে পা ছড়িয়ে বসবে, স্টিলের গ্লাসে এক গেলাস উত্তপ্ত চা আঁচলে চেপে খাবে, রুটি আলুর হেঁচকি খাবে। খাওয়ার কথা নেই, তবু খায়। কে খাবে বাবুর? তারা খায় বলে সংসার সচল বায়ুর বোঝা উচিত। মায়াও আছে, নিভাকে হাতে রাখতে না পারলে, চাল, ডাল, তেল, নুন সরানো কঠিন—নিভারও বায়নার অন্ত নেই–
কী হচ্ছে?
ফুলকপির ডালনা।
দাও তো দেখি, কীরকম রাঁধলে?
মায়া অক্লেশে হাতায় তুলে দেয়।
কী বসিয়েছ!
চাউমিন।
দাও তো–
অক্লেশে চাউমিন দিলে, নিভার সতর্ক নজর।
সস দাও একটু। বেশি সুযোগ পেলে ডিমের ওমলেট। বাবু-বিবি দোতলার ঘরে। সারা সকাল কাগজ আর কলম—কী যে লেখেন? না হয় পড়েন। আর টিউশিনি। দুজন থাকলে সুযোগ বেশি, তৃতীয় কেউ থাকলেই ঝামেলা, তার আর মায়ার আনতে চললেই হয়ে গেল। তৃতীয় জন থাকতে থাকতেই বুঝে যায়, এ বাড়িতে এ-দুজনের মৌরুসিপাট্টা।
লপ্তে লপ্তে কাজ, লপ্তে লপ্তে টাকা।
ঠাকুরের বাসন, পঞ্চাশ টাকা।
রান্নাঘরের এঁটো বাসন, একশো টাকা।
নালায় দু-বালতি জল ঢেলে দেয় তারজন্য পঞ্চাশ টাকা। জামাকাপড় কাচা–একশো টাকা, এত বড় বাড়ির ঘর-বারান্দা মোছা—তিনশো টাকা।
মায়া সকালে রান্না করে খাওয়ায় টেবিলে সাজিয়ে রেখে যায়। ঝড়েশ্বর চান করে বের হলে, নিরু পুজোর ঘর থেকে নেমে আসে। খেতে দেয়। তারপর বাকিটা ফ্রিজে ঢুকিয়ে রেখে দেয়। সাঁজবেলায় আবার মায়া আসে, ফ্রিজের খাবার গরম করে ফাঁক বুঝে এটা-ওটা খেয়ে যায়। কিছু নিয়েও যায়। যেতে-আসতে হাতে তার একটি পলিথিনের ব্যাগ ঝুলবেই। সকালে-সন্ধ্যায় তার আসল কাজ— নিয়ে যাওয়া। দিনরাতের কেউ না থাকলে হচ্ছে না, ছোটোপুত্র খরচের বহর দেখেই টের পায়।
দিন-রাতের বয়স্ক মহিলা রাখারও চেষ্টা করেছেন ঝড়েশ্বর। তবে রাখতে পারেননি।
এল একা। মাস যেতে না যেতেই মাইনে হাতে পড়তেই দেশে না গেলে চলছে না। সপ্তাহ কাটিয়ে একা এল না। সঙ্গে কচাকে নিয়ে এল।
কোথায় রেখে আসব বলুন? কেউ রাখতে চায় না। মরদ আমার নতুন বউ নিয়ে কোথায় ভেগে গেছে।
বাবুর শিরেসংক্রান্তি। নিয়ে গেলে ফেলতে পারবে না বাবু। এই ভরসা বউটির। তিনি যে কী বলেন! কিন্তু ঝড়েশ্বর বোঝেন, এক মাসেই সংসারের হাল বুঝে গেছে বউটি। হাতের কাছে কেউ না থাকলে বাবু-বিবি নাচার। নাও এবারে ঠ্যালা সামলাও। কিন্তু ঝাড়েশ্বর বোঝেন, বাড়িটার অপচয়ের বহর টের পেয়েই সঙ্গে পুত্রটিকে নিয়ে আসতে সাহস পেয়েছে। ছাড়িয়ে দিলে লোক পাবেন কোথায়! লোক পাওয়া সোজা!
কিন্তু ঝড়েশ্বর যে একগুঁয়ে এটাই বোধহয় দিন-রাতের মহিলাটির জানা ছিল না।
হবে না।
কী হবে না?
তোমার থাকা হবে না।
কেন?
আমার দরকার নেই। কার কাছে রেখে আসব বলুন! বাড়ির এক কোনায় পড়ে থাকবে। কোনো উৎপাত করবে না।
না, আমি রাখব না।
কে করবে কাজ?
নিজেই করে নেব? কিন্তু যায় না, বাড়ি ছেড়ে যেতে চায় না। তারপর অগত্যা পুলিসের ভয় দেখাতেই তিনি নিষ্ক্রান্ত হলেন।
তারপর এল শঙ্করী। মাস যেতে না যেতেই স্বামী এসে হাজির। টাকা নিতে এসেছে—ভালো। টাকা দিলেন, সেদিন গেল না। পরদিনও গেল না। তিনতলার ঘরটায় শুয়ে-বসে থাকে—আর কীর্তন গায়।
কী হল শঙ্করী! তোমার বরের যে নড়ার নাম নেই। মাঝে মাঝে কীর্তনও গায়। বাড়িটা যে পীঠস্থান হয়ে যাবে দেখছি।
আজই যাবে। আমার গোঁসাই বেশিদিন কারও বাড়িতে থাকে না। গেল ঠিক, মাস শেষ হলে আবার চলেও এল। ঝড়েশ্বরের ছোটোপুত্রের এক কথা, মেয়েটা বাবা বিশ্বাসী। বর এসে দু-চার দিন থেকে যায় তো কী হয়েছে! থাকুক না। তোমার তো কথা বলারও লোক নেই। বিশ্বাসী লোক পাবে কোথায়। কথা বলার লোক পাবে কোথায়?
তারপরের মাসে এল, যাওয়ার আর নাম করছে না।
ছোটোপুত্রকে না জানিয়েই বললেন, শঙ্করী এই নাও টাকাপয়সা। অন্য কোথাও ঠিক কাজ পেয়ে যাবে। সেখানে গিয়ে বরকে নিয়ে থাক। আমার অসুবিধা হচ্ছে। সেখানে গিয়ে যত কেত্তন গাও, মচ্ছব বসাও, আমার কিছু বলার নেই। আমি রাখতে পারব না।
