পুত্ররা বাবা-মার অসুবিধে হবে ভেবেই, যা দেওয়ার তারাই দেয়। মাইনে, পুজোয় শাড়ি, অসুখে-বিসুখে ওষুধ, পুজোয় বখশিস—সব। মা-বাবার প্রতি তাদের গুরুদায়িত্ব এভাবেই পালন করছে। কাজেই তিনি ইচ্ছে করলেই বলতে পারেন না, না দরকার নেই!
তখন এক কথা।
আপনি কে?
মাইনে দেয় বাবুরা।
তারাই বলবে, যাব কি থাকব।
ঝড়েশ্বর অবশ্য বলতে পারেন, দ্যাখ বাবা, এত অপচয় আমার সহ্য হয় না। আমি গরিব বাবার ছেলে, তোমরা যে কাজ করছ, তার মাইনে যে মাত্রাতিরিক্ত তোমরাও বোঝ, আমিও বুঝি। বাড়ি ছাড়া বাড়ি না হয়ে যায়, তাই পুত্ররা বাড়িটার তদারকিতে তোমাদের রেখে গেছে। দোতলা, তিনতলায় অর্ধেকটাই এখন তালা দেওয়া। যার যার এলাকা, তালা দিয়ে রেখে গেছে। কারও দুটো ঘর, কারও তিনটে ঘর, বাথরুম, বারান্দা, খাট, ড্রেসিং টেবিল, আলমারি সবই রয়েছে। মাসে দু-মাসে তারা এলে, সব সাফসোফ হয়। না থাকলে, না এলে, ঘরগুলি সাফ হয় না, মাইনে ঠিকই আছে, বারন্দায় ঝাঁট পড়ে না—মাইনে ঠিকই আছে, মোছামুছির বালাইও থাকে না। এখনও দোতলা এবং তিনতলায় মিলে চার-পাঁচটা ঘরে ন্যাতাই পড়ে না। মাইনে তো অর্ধেক হয়ে যাওয়ার কথা। আর রান্নাঘরটা তো লঙ্গরখানা, খুশিমতো খাওয়াদাওয়া। ভালোমন্দ তোমরা আগে খাও, আমরা পড়ে থাকলে খাই। কাজেই ঝড়েশ্বর বোঝেন, তাঁর মাথা গরম হলে সবাইকে তিনি ঝেটিয়ে বিদায় করতে পারেন। এখন আর এক বাই উঠেছে ছোটপুত্রের—একজন চব্বিশ ঘণ্টার লোক না হলে চলছে না। মাঝে আরার বন্দোবস্তও হয়েছিল, মাসচারেক ছিলও, তবে শুধু খাওয়া আর ঘুম, এবং মশারি টাঙানো ছাড়া, অথবা টেবিলে তাঁদের ভাত, ডাল, মাছ, সবজি সাজিয়ে দেওয়া ছাড়া কাজও বিশেষ ছিল না।
তিনি রাজি ছিলেন না।
কী দরকার, চব্বিশ ঘণ্টার লোকের!
তোমাদের বয়েস হয়েছে। বাজারে গেলেই লোকের দরকার। একা কোথাও বের হওয়া ঠিক না। কখন কী হবে, খবর কে দেয়! বড় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। রোজ ছুটেও আসতে পারি না। টেনশন। কেউ থাকলে কিছুটা নিরাপত্তা থাকে। বোঝ না। ছোটোপুত্রই আয়ার ব্যবস্থা করে যাওয়ার সময় বসেছিল, পেছনে লেগে থেক না।
রাত আটটায় আসত। সকালে বাজার করে ফিরত তার সঙ্গে। তারপর ছুটি। রাতে খেত, সকালেও একপেট খেত। সারাদিন বোধহয় আর না খেলেও চলত। সঙ্গে রোজ পঞ্চাশ টাকা।
ঝড়েশ্বরের গা জ্বালা করত। এত পরিশ্রমের উপার্জনে, শুধু শুয়ে-বসে ভাগ বসাবে।
এক দুপুরে ফোন।
হ্যালো, হ্যাঁ আমি বলছি। কাল থেকে আসতে বারণ করেছি।
বাবা আপনারা দুজনে একা বাড়িটায় থাকবেন! মার শরীর ভালো না।
সারাটা দিন তো একাই থাকি। একাই বা বলছ কেন, তোমার মা কি সংসারে একেবারেই বাতিল হয়ে গেল! তিনি তো আছেন। সারাদিন একদণ্ড শান্তিতে থাকতে দেন না। বউমারা তোমাদের ফুসলে-ফাঁসলে নিয়ে গেছে, এই এক অভিযোগ। আমার ব্যক্তিত্বের অভাব কাউকে কিছু বলি না, তা না হলে সাহস হয় কী করে, আলাদা ফ্ল্যাট কেনার। আমরা কেউ না!
তিনি ফের বলেছিলেন, রান্নার মেয়েটা তো বারোটার আগে যায় না। কখনো একটা। আমাদের খাইয়ে সে যায়। নিজেও খায়। যত বেলা বেশি হয়, তত তার ক্ষুধা বাড়ে। তার তো সকালে শুধু রুচি-চা খাবার কথা ছিল। ঠিকা মেয়েটাও সঙ্গে বসে যায়। আমি দেখেও দেখি না—আরে বাজারটা তো আমাকেই করতে হয়? লোক বাড়লে কাজ বাড়ে বোঝ না! তোমার মা তো সারাদিন কখনো বাইরের দরজায়, কখনো ভাঁড়ারে তালা দিয়ে বেড়ায়। তারপর চাবি কোথায় রাখে মনে রাখতে পারে না, সারাদিন তারও কাজ মেলা। চাবি খুঁজতে খুঁজতেই তার বেলা যায়।
না বাবা, এভাবে হয় না। এভাবে আপনাদের ফেলে রাখা যাবে না। আপনারা বরং আমার এখানে চলে আসুন। কী হবে বাড়ি দিয়ে! আপনিই তো বলেছেন, বাড়িতে থাকা কঠিন। লোক বাড়ছে, বাড়ি হচ্ছে, উৎপাত বাড়ছে, আপনার প্রতিষ্ঠায়, প্রতিবেশীদের কেউ কেউ ঈর্ষাকাতর। কী দরকার ওখানে থেকে!
তা দিনকাল ভালো না, তিনিও জানেন। বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এত সস্তায় কে দেয়! এত বড়ো বাড়ি বিশ-বাইশ লাখ টাকার কমে করা যায় না। বাড়িটারও খামতি আছে—জমির পাট্টা নেই। কো অপারেটিভের নামে তার এক সময়ের প্রিয়জন, এভাবে ঠকাবে বিন্দুমাত্র বুঝতে পারেননি। বাড়ির ছাদ ঢালাইয়ের পর জানতে পারেন, কো-অপারেটিভের সরকারি স্বীকৃতিই নেই। তবু মাথা গোঁজার ঠাঁই, সবাইকে নিয়ে এক ছাদের তলায় থাকায় স্পৃহাতেই এত বড়ো বাড়িটা করেছিলেন। নিজের রক্ত-মাংস দিয়ে গড়া যেন বাড়িটা। সেগুন কাঠের দরজা, দামি মোজাইক টাইলসের মেঝে, বাজারের সেরা ইট, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজের ফাঁকে ফাঁকে—এই বাড়ি নিয়ে-কেমন এক নেশায় পড়ে গেছিলেন। এখন সেই বাড়িটাই তাঁর কাছে উপদ্রবের সামিল। তার ওপর ছোটোপুত্রের বায়না, তোমরা এখানে চলে এস।
বললেই যাওয়া যায় না। তারও স্বাধীনতা আছে। নিরুর স্বাধীনতা আছে। পুত্রদের কারও ফ্ল্যাটে উঠে যাওয়ার অর্থই ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা। নিরু রাজি হবে না কিছুতেই।
বাড়িটা বিক্রি করে একটা ফ্ল্যাট কিনতে পারলেও হত। এমন ভাবলেই বুক চিরে যেন রক্ত নির্গত হতে থাকে। এত শখের এত পরিশ্রমের বাড়ি, বললেই কি বিক্রি করা যায়! বাড়িটাকে ঘিরে সন্ত্রাসেরও শেষ নেই। পুত্ররা চায় না, বাড়িটায় তিনি একা নিরুকে নিয়ে থাকেন। অন্তত কেউ পাশে থাকুন।
