যদিও তিনি জানেন রান্নার মেয়েটি খুবই ধুরন্ধর। দুদিনেই ফুলিকে হাত করে নেবে, সংসারে তার কেবল নাই নাই মাসের বাজার বিশ-বাইশ দিনে শেষ। তিন কেজি আলু দুদিনেই শেষ। চারদিনের বাজার তিনদিনও যায় না। কিছুকাল যে তালা-চাবির বন্দোবস্ত করেছেন তাও নয়। তারপর তালাও থাকে না, চাবিও থাকে না। নিরুর পূজাআর্চাতে সকালটা কেটে যায় পুজোয় বসলে তার সঙ্গে কেউ কথাও বলতে পারে না–
বাবু চা নেই, বাবু চিনি নেই, বাবু পোস্ত আনতে হবে।
মাসের বাজার শেষ। পাঁচশ পোস্ত, কে খায়! কদিন আলুপোস্ত হয়! ছোটো পুত্রটি বাড়ি এলে কিংবা থাকলে, পোস্ত হয়। তিনি কিংবা নিরু পোস্ত বিশেষ পছন্দ করেন না। দুজন লোকের রান্না তিন কেজি আলু তিনদিন যায় না, এক কেজি পেঁয়াজ তিনদিন যায় না। এক রান্নাঘর আর রান্নার মেয়েটাকে নিয়েই পাগল হওয়ার জোগাড়। তার ওপর অপচয় তো আছেই। ছাড়িয়েও দিতে পারেন না। পরের বস্তুটি আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি যে করবে না, এই আতঙ্কে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবলেও শেষে আর সাহসে কুলায় না।
শিবানী মেয়েটা মন্দ ছিল না। চালাকচতুর, যাক সে রান্নাঘরটায় নজর রাখতে পারবে। বছর দুই ছিল, কিছুদিন যেতে না যেতেই শিবানী তাঁদের চেয়ে রান্নার মেয়েটার বেশি বাধ্যের হয়ে গেল।
এই শিবানী, যা তো রসিকের দোকান থেকে দু দিস্তা কাগজ নিয়ে আয়।
শিবানীর সাড়া নেই।
কী হল! শুনতে পাচ্ছিস না শিবানী?
রান্নার মেয়ে মায়া তখন ডাকবে, এই শিবানী, তুই কোথায়! মেসো তোকে ডাকছে।
আর সঙ্গে সঙ্গে তিনতলা থেকে জবাব, যাই।
ঝড়েশ্বর কুপিত না হয়ে পারেন না।
তিনতলায় কী করছিস?
দিদুর ছাড়া কাপড় ধুয়ে মেলে দিচ্ছি তারে।
আসলে কিছুই করছে না। কাছেপিঠে থাকলেই কাজ, তাকে দেখলেই দিদুর কাজের ফরমাশ, যতদূরে গা বাঁচিয়ে থাকা যায়। ঝড়েশ্বর সবই বোঝেন, রান্নাঘরে থাকলে মায়াই তাকে এটা-ওটা খেতে দেবে।
নে যা।
বলে, চিংড়ি মাছ ভাজা দেবে খেতে, তেলের বড়া দেবে খেতে, এমনকী দুধরুটি মায়াও খাবে, সে-ও খাবে। সবই লুকিয়ে-চুরিয়ে, দুজনের সংসারে এত টানাটানি। তাঁর খাবার বেলায় দুধ থাকে না, চিনি থাকে না, এই তো কাল বিকেলে দু প্যাকেট দুধ আনা হল, সকালেই বলছে দুধ নেই। তোমার কি! তোমাদের চোখে লাগে না।
একদিন তিনি রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে আক, তাঁরা কেউ খাননি, শিবানী আর মায়া দুজনেই আম মুড়ি কলা দুধে হাপুস-হুপুস ফলার খাচ্ছে।
মাথা ঠিক থাকে?
তিনি বলেছিলেন, তোমরা কি মানুষ না!
শিবানী এককদম এগিয়ে গেল। বলল, খেলে কী হয়? তোমরা খাও না!
শিবানী এতটাই মাথায় চেপে বসেছিল যে ঝড়েশ্বর আর ধৈর্য রাখতে পারেননি। শিবানী তার খুশিমতো কাজ করত। অথবা মায়া যা বলত, এমনও হয়েছিল শেষদিকে, তিনি শিবানীকে কিছু বলতে সাহসই পেতেন না। মায়াকেই বলতে হত, শিবানীকে বল তো, দু-প্যাকেট সিগারেট এনে যেন রেখে দেয়। শিবানী সঙ্গে সঙ্গে চলে যেত।
লোকজন সকাল থেকেই বাড়িতে ঢুকছে। তাদেরও চা দিতে হয়। শিবানীই এনে দেয়। তারপর সেও এককাপ চা নিয়ে বসে যায়। তখন ডাকলে এক কথা, দাদু চা খাচ্ছি। চাও একটু নিশ্চিন্তে খেতে পারব না! এক দণ্ড বসতে দাও না। কী বাড়িরে বাবা!
যাঁর মারফতে শিবানীকে এনেছিলেন, তাকে ডেকে পাঠালেন।
সে এসে বলল, ভাই গোকুল আমাকে রক্ষা করো।
কী হল!
কিছুই হয়নি। এই শিবানী, তোর ফ্রক প্যান্ট ব্যাগে ভরে নে। এই নে তোর এ মাসের টাকা। গোকুল তোকে দিয়ে আসবে।
গোকুলদার দরকার হবে না। আমি একাই যেতে পারব।
তুই বাড়ি যা। গোকুল দিয়ে আসুক। তারপর বাড়ি থেকে একা খুশিমতো বের হবি, ঢুকবি। আমার দায় থাকবে না। তোর বাবাকে দেখা করতে বলবি।
গোকুলের এক কথা, কী করেছে দাদা!
কী করেছে!
তোমার মাসিকে ডাক্তার দেখাতে গেছি। ফিরে দেখি, মায়া নেই, শিবানী নেই। সদরে তালা দেওয়া।
মানে!
মানে আর কি! তিনি মায়ার সঙ্গে বের হয়েছিলেন পান খেতে। আজকাল একা একা বের হওয়া স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে।
কোথায় গেল! কাউকে কিছু বলে যাবে না। কিছু হলে তো আমাকেই ধরবে। দেখি তিনি পান চিবুতে চিবুতে ফিরছেন। ধমক দিতেই, অ মা এ কি কথা গ। আমি কি হারিয়ে গেছি! তুমি আমাকে বকছ। তোমাদের দেরি দেখেই তো এগিয়ে দেখছিলাম, ফিরছ কি না। একা এত বড়ো বাড়িতে থাকা যায়, বল!
তিনি নিজেই হতভম্ব। এই সব জটিলতায় এক সময় ঝড়েশ্বর ঠিক করে ফেললেন, না আর রাখা যাবে না। মাঝে মাঝে ভয়ও দেখাতেন, তোর বাবাকে ডেকে পাঠাব। তোকে আর রাখা যাবে না। ছাড়িয়ে দেব।
দাও না। আমার কি কাজের অভাব!
শিবানীর বেলাতেও তার বাবাকে ঝড়েশ্বর বলেছিলেন, নিজের মতো থাকলে, ওর ভালোই হবে। আমরা দুজন, আরও একজন থাকলে বাড়িটা প্রাণ পায়। ভালো হয়ে থাকলে, ওর বিয়ের জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না।
এজন্য শিবানীকে, নানা লতাপাতা আঁকা ফ্রক, প্যান্ট কিনে দিয়েছেন। তিনতলায় একটি পুরো ঘর ছেড়ে দিয়েছেন—ড্রেসিং টেবিল, আয়না, একটা ক্যাম্পখাট, কাফুই স্নো-পাউডার কিছুই বাদ দেননি। লতাপাতা আঁকা একটা টিনের সুটকেসও কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাখা গেল না।
একমাত্র মায়াকে তাড়ালে যদি হত, কারণ মায়া এবং নিভা, দুজনেই জানে, বাড়িতে সবাই থাকতে—তাদের মাইনে, জলখাবার, পুজোয় শাড়ি, নতুন বছরকার শাড়ি সব ঠিক হয়ে আছে।
