ফুলি শুধু তাকিয়ে আছে।
কখনো বাপের কথা শুনছে, কখনো বাবুর কথা শুনছে। কোনো কথা বলছে না।
ঝড়েশ্বর না বলে পারলেন না, কিরে ফুলি, তুই কি কথা বলতেও পারিস না?
সব পারে বাবু। দমে আছে। এতটা রাস্তা, বুঝতেই পারেন! আমি উঠি বাবু, না উঠলে আজও লস হবে। আমাদের খাটলে ভাত, না খাটলে—তারপর সে তার পেট দেখাল-উপোস।
ফুলির বগলের পুঁটলি বগলেই আছে।
ঝড়েশ্বর ভাবলেন, ফুলির উচিত পুঁটলি খুলে দেখানো।
ফ্রক আর এনেছে।
আছে আর একটা।
নিরু বলল, এই ফুলি চল তোকে বাথরুম দেখিয়ে দিচ্ছি। সার্ফ দিচ্ছি, সব ধুয়ে নে। বাজারে বের হলে তোর জন্য নতুন ফ্রক, চিরুনি, আয়না এনে দেব। সাফসোফ থাকবি। এই নাক খুঁটছিস কেন? তোর কি ঘেন্নাপেত্তা নেই! আয়।
ফুলি দাঁড়িয়েই থাকল। ঝড়েশ্বরের মনে হল, বৈকুণ্ঠ রওনা হলে ফুলিও পিছু পিছু দৌড় মারবে। দৌড় মারারই কথা—এখনও কথা বলছে না কেন! হাবা-কালা নয়তো! বাবাও হতে পারে। সে যাই হোক, থাকলে ক্ষতির প্রশ্ন নেই। মেয়েটা ছোটাছুটি করলেও বাড়িটা যেন প্রাণ ফিরে পাবে। কাজ করুক না-করুক, তাঁরা ছাড়াও বাড়িতে আর একজন আছে ভাবতেও ঝড়েশ্বরের ভালো লাগছে।
তাহলে বাবু যাই। বৈকুণ্ঠ একবার মেয়েকে দেখল, তারপর বাবুর পারে গড় হল। নিরুকেও প্রণাম করল।
ঝড়েশ্বর কেমন এই প্রণামের বহরে মুগ্ধ হয়ে বলল, মেয়ের জন্য ভাববে না। নিজের মতো থাকলে আখেরে ভালোই হবে। বড়ো হলে বিয়েও দিয়ে দেব। কাজের লোক তো আছেই। সব সময়ের লোক না থাকলে অসুবিধা, এটা-ওটা এগিয়ে দিলেও আমাদের অনেক কাছে থাকলে মায়া পড়ে যায় বোঝই তো!
আজ্ঞে যাচ্ছি।
মাঝে মাঝে এসে খবর নিয়ে যেও।
সে তো আসতেই হবে। মাসপয়লাতেই আসব। মাসের টাকাটায় সংসারে পঁচিশ-ত্রিশ কেজি চাল হয়। ওর ভাইবোনগুলো খেয়ে বাঁচবে। সোজা কথা!
তারপর সদর খুলে দিলে বৈকুণ্ঠ বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাড়িটা দেখল। রাস্তাঘাট দেখল। গলিখুঁজিতে মেয়েটা হারিয়ে না যায়, যদিও মাসিমা একখানা কার্ড দিয়েছে, ওতেই ঠিকানা লেখা ছিল, সেই ঠিকানা যে ভুলও নয়, নিজে এসে তাও দেখে গেল।
ফুলি জানালায় দাঁড়িয়ে রাস্তায় বাপকে দেখছে! বাপ হেঁটে যাচ্ছে। যতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল, জানালা থেকে নড়ল না। বাপ রাস্তার মোড়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেও জানালায় দাঁড়িয়ে থাকল। সদরে কেউ এসেছে। সদর খুলে দেওয়ার জন্যও লোকের দরকার। কে খোলে! নীচে এতবার ওঠানামা আর করতে পারেন না ঝড়েশ্বর।
তিনি ডাকলেন, এই ফুলি, দরজা খুলে দে।
ফুলি তরতর করে ছুটে এল। দরজা খুলে দিল।
ঝড়েশ্বর বসার ঘরে। মায়া ঢুকছে। দরজা খোলা-বন্ধ করাও একটা বড়ো কাজ। সকাল থেকেই কেউ না কেউ আসছেই। শহরে বাড়ি হলে যা হয়, বড়ো সতর্ক থাকতে হয়। কোলাপসিবল গেট আছে সদর দরজায়। তবে সদর কমই খোলা হয়। বাড়িটার ভেতরের দিকেও দুটো দরজা আছে। কাজের লোক, মুড়িওয়ালা, দুধওয়ালা, ছাত্রছাত্রীরা সবাই ঢেকে দ্বিতীয় দরজাটা দিয়ে। কলপাড়ের দিকেও একটা দরজা আছে, সেখানে নিরুর কিছু শৌখিন গাছপালা বড়ো হয়।
একটা টিউকলও আছে, বাসন মাজার আলাদা জায়গাও আছে। বেসিনে এত বাসনকোসন ধোওয়া যেত না—তখন তো বাড়িটায় বারো-চোদ্দোজন লোক। পুত্ররা, পুত্রবধূরা, নাতি-নাতনিরা… বাড়িটা মানুষের কলরবে ভরে থাকত। এখন তিনি আর নিরু। ফলি আসায় তারা তিনজন। কলপাডে আর কেউ যায় না। কলপাড়ের দরজাটা বন্ধ থাকে। গাছে জলটল দিতে হয়। গাছের গুঁড়িও খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়। মৌসুমি ফুলেরও চাষ আছে। অবসর নেওয়ার পর, নিরু এই গাছপালা নিয়েই বিকেলটায় ব্যস্ত থাকে। একটা পাতা পর্যন্ত পড়ে থাকতে পারে না।
আসলে বাড়ির গলিটা দিয়ে ঢুকে দ্বিতীয় দরজা। সেটাই বেশি খুলতে হয়। বন্ধ করতে হয়। যতক্ষণ তিনি নীচে থাকেন, ছাত্রছাত্রীরা তাঁর কেচিংয়ে ভিড় করে থাকে, সবাই হয় অনার্সের ছাত্র-ফিজিক্সের অধ্যাপক ঝড়েশ্বরের খুবই সুনাম, ভালো ছাত্র পেলে তিনি পয়সাও নেন না, এসব কারণে সুখ্যাতি আছে তাঁর—সব সময়ের জন্য মাসমাইনের লোকও ছিল তাঁর। কিন্তু যা হয়, সুযোগ পেলেই কোপ বসিয়ে চলে যায়। আর বয়েস হয়ে যাওয়ায় এবং পুত্ররা সব আলাদা ফ্ল্যাটে উঠে যাওয়ায়, বয়স্ক লোক রাখতে কেন জানি আর সাহস পাচ্ছিলেন না। নীচে যতক্ষণ থাকেন, তিনিই উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেন, বন্ধও করেন—এতে তাঁর কাজের অসুবিধা হয়, কিছু স্কুল বই আছে, প্রেসের লোকও আসে, বইয়ের প্রুফটুফ দেখারও কাজ থাকে। ছেলেমেয়েরা বাবা-মার খবর নিতেও আসে, ভালোমন্দ রান্না হলে কাজের লোক দিয়ে পাঠিয়ে দেয়, নিজেরাও আসে, ছুটিছাটায় তারা থেকেও যায়। বাড়িটা তখন জমজমাট। তিনি তখন বাজারে নিজে যান—নিরুর বাজার পছন্দ না তার। কে কী খেতে ভালোবাসে, সব বাছবিচার করে কেনেন—এটা তাঁর একটা হবি।
কিন্তু বাড়িটা খালি হয়ে যাওয়ার পর বাজার করার হবিটাও তাঁর চলে গেছে। দুজনের আর কী লাগে! একদিন বাজার করলে চার-পাঁচদিন চোখ বুজে চলে যায়। তবে রান্নার মেয়েটির হাতটান থাকায়, তাঁর হিসেব ঠিক থাকে না। বারবার মায়াকে সতর্কও করে দিয়েছেন, হলে কি হবে, সে নেবেই—কী করে সরায়, এই বিষয়টাই তাঁর মাথায় আসে না। কিচেন, ডাইনিং প্লেস সম্পূর্ণ আলাদা বলে নজর রাখাও কঠিন। নিরুকে বললেও বিপদ, সে পাহারা দেওয়ার নামে এমন সব জটিলতা সৃষ্টি করবে যে, তখন তাঁর মধ্যস্থতা ছাড়া উপায় থাকে না। মাছের পিস, মাংসের পিস, গুনেও রাখা হয়, চারদিন চলার কথা, তিনদিনও যায় না—সংসারে এত সব জটিলতায় পড়েই এই ফুলিকে তুলে আনা—অন্তত নিজের করে নিতে পারলে, সে-ই সব লক্ষ রাখতে পারবে।
