কত মাইনে চায়? ঝড়েশ্বর না বলে পারলেন না। নিরু বলল, কী দিতে হবে বৈকুণ্ঠ?
বড়ো বিগলিত বৈকুণ্ঠ।—দেবেন আপনাদের যা মনে লয়।
না, যা মনে লয় না। সাফ সাফ বলে নেওয়া ভালো। পরে ঝামেলা পাকালে মুশকিল। এই নিভা বৈকুণ্ঠকে চা করে দাও।
ঝড়েশ্বর সোফায় বসে পড়েছেন, ফুলি দরজায় চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর বড়ো বড়ো চোখে কেমন ঘরবাড়ি দেখছে।
নিভা বলল, আমার দেরি হয়ে যাবে মাসিমা।
বাড়িটা সাফসোফ রাখা, থালাবাসন মাজা, কাচাকাচির কাজ তার। চার-পাঁচটা বাড়িতে একলপ্তে কাজ করে বলে, সময়মতো না ঢুকতে পারলে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। নিভাননী যে কাউকে ছেড়ে কথা বলার পাত্রী নয়, ঝড়েশ্বর ভালই জানেন। সারাদিনই প্রায় তার কাজ-এ-বাড়ি সে-বাড়ি ঢুকে বসে থাকলে তার চলে না। মাসিমার যে দরদ উথলে পড়ছে টের পেয়েই নিভা সরে পড়তে চাইছে। তারপর বললেই হল, নিভা বৈকুণ্ঠকে রুটি করে দাও। আলুর সেঁচকি করে দাও।
রান্নার মেয়ে মায়ার আসতে দেরিই হয়। সে একবাড়ির কাজ সেরে, এ-বাড়িতে ঢোকে। লোক থাকলেই কাজ বাড়ে, কাজের মেয়েরা এটা ভালোই জানে, আর যদি মেয়েটা কাজ ধরে নেয় তবে তো কথাই নেই। কোনোদিন না মাসিমা বলে দেন, কাচাকাচির কাজ করতে হবে না। থালাবাসন মাজতে হবে না।
তারপর একদিন যদি বলে দেন, মোছামুছির কাজ তো ফুলিই পারে, তা হলেই হয়ে গেল—কেউ বাড়িতে কাজে ঢুকলে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে কেউ জানে না।
কেউ কাজে নতুন ঢুকলে যে নিভা কিংবা মায়া প্রমাদ গুনতে থাকে, ঝড়েশ্বর ভালোই জানেন। নতুন লোকটিকে না তাড়িয়ে তারাও শান্তি পায় না। কারণ এ বাড়িটায় দেখাশোনার লোকের অভাব বলে স্বাধীনতা একটু মাত্রাতিরিক্ত। বউমারাও নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত, রান্নাঘরে কেউ উঁকি দিয়েও দেখে না। আট দশ বছর ধরে একই মাসোহারা-ঝড়েশ্বর-পুত্ররা কিছু দিলেই খুশি ছিলেন, এতকিছু সুবন্দোবস্ত থাকা সত্ত্বেও বাড়িটা শেষ পর্যন্ত খালিই হয়ে গেল।
ঝড়েশ্বর মাথা চুলকে বললেন, পারবে তো? নিরু সোফায় বসে বলল, পারবে না কেন। কাজটা হাতি না ঘোড়া। এটা-ওটা এগিয়ে দেবে। পারবে না কেন?
না বলছিলাম, থাকতে পারবে তো? মন টিকবে তো? এই মেয়ে, পারবি থাকতে? বাবা-মার জন্য মন খারাপ করবে না?
ফুলির চোখ বড়ো হয়ে গেল, গোল গোল হয়ে গেল। কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।
ঝড়েশ্বর বললেন, দ্যাখ, বাড়ির মেয়ের মতো থাকবি, তারপর বৈকুণ্ঠের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমরা দুজনে বাড়িটায় থাকি তোমার মেয়ে কষ্ট পাবে না। যদি নিজের মতো থাকে, থাকতে থাকতে বড়ো হয়ে যায়, বিয়ের খরচ পাবে। কাছে থাকলেই মায়া বাড়ে। বড়ো করলাম, আর হুটহাট একজনকে ধরে গছিয়ে দেবে সে হবে না।
আসলে বাড়িটা এত খালি, কেউ থাকলেই যেন ভরে যায়।
নিরু বলল, মাকে ছেড়ে থাকা কঠিন, আমি তো ভেবেছিলাম, বড়োই হবে। বারো-চোদ্দো বছর, আর আট-দশ বছরের যে অনেক ফারাক বৈকুণ্ঠ। তোমার পরিবারের কষ্ট হবে, তার তো বুক খালি হয়ে যাবে।
ঝড়েশ্বর বললেন, বুক খালি কার না হয়। তুমি কি ভালো আছ? রাতের নৈঃশব্দ্য তোমাকে পীড়ন করে না! বল, দিনের বেলাটাও ভালো যায় না। কেমন সব শুনশান মনে হয়।
তারপরই কেন যে মনে হল, তিনিও নিরুর মতো কেমন নিজেকে বড়ো অসহায় বোধ করছেন। বৈকুণ্ঠ টের পেলে চেপে ধরতে পারে—বাড়িটায় সে এবং তার পরিবার যদি একটু থাকার জায়গা পায়, বাড়িটা তত খালি পড়েই আছে, তারা থাকলে বিপদে-আপদে কাজে আসবে। বলতেই পারে, বাবু আমাদের থাকতে দিন না। বনজঙ্গলে বউ ছেলে-মেয়ে ফেলে রেখে এতদূরে থাকা যে খুব কষ্ট।
নিরু বলল, কী হল বৈকুণ্ঠ, কত দেব?
না মাসিমা, আপনি বলুন।
দুশো টাকা পাবে। একটা লোকের খেতেও কম খরচা না। কলকাতায় খাওয়া পাওয়া যায়, থাকার জায়গা পাওয়া যায় না।
তাই দেবেন মাসিমা। আমি মাসপয়লা টাকাটা নিয়ে যাব।
নিরু বলল, ফুলি তো কথাই বলছে না! কিরে, তোর ভালো লাগছে না। আমাদের?
ও ভাববেন না, ঠিক মানিয়ে নেবে। আমি তাহলে উঠি।
এই যা, ও নিভা, মায়া আসেনি! একটু চা করে দিতে বললাম, তোমরা যে কী কর না! বলেই নিরু ডাইনিং প্লেস পার হয়ে গিয়ে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখল সব ফাঁকা।
নিরু ফিলে এসে বিরস গলায় বলল, তোমাকে যে চা খাওয়াব তারও উপায় নেই বৈকুণ্ঠ। মায়া যে কী করে! কত বেলা হল, এখনও আসার নাম নেই। তোরা মাগনা কাজ করিস! নিভা যাওয়ার সময় বলে যাব তো! নিভাও কিছু না বলে চলে গেল।
বৈকুণ্ঠ কাঁচুমাচু গলায় বলল, এত বড়ো বাড়ি, আর কেউ থাকে না। দাদা বউদিরা, তারপরই কী ভেবে বলল, সব কপাল মাসিমা, আমরা একটা ঘরে পাঁচজন শেয়ারে থাকি। বাগমারির বস্তিতে আলো নেই, পাখা নেই, আমাদের কোনো কষ্ট হয় না। মানুষ না থাকলে কীসের ঘরবাড়ি? বলেন!
ঝড়েশ্বর বললেন, থাকত। এখন নেই। এত বড়ো বাড়িতেও কুলাল না। এখন তো আমার শিরেসংক্রান্তি। বাড়িটা যে রং করাব, মেরামত করব, তারও ইচ্ছে হয় না। উদ্যম হারিয়ে ফেললে মানুষেরই এই হয় বৈকুণ্ঠ।
বৈকুণ্ঠ বলল, দুদিন কাজ কামাই করে নিয়ে এলাম। মাসিমা এত করে বলল, কাছে তো না! তারপর ট্রেনে, বাসে, ভটভটিতে কাল রাতে নিয়ে এসেছি। আমি উঠছি, এই পুলি, ভালো হয়ে থাকবি। দাদু-দিদার কথা শুনবি।
