পল্লব চলে গেল।
জানলায় বসে আজ তাঁর আর একটি শব্দও লেখার ইচ্ছে হল না। শুধু আকাশ দেখছিলেন, তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতাটি আজ অভুক্ত। পায়ে পায়ে বড়ো হয়ে ওঠা স্নেহ মায়া মমতা তাঁকে তাড়া করছিল। অজ্ঞাতেই কখন যে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছেন।
প্রাণের সাড়া
নীচের বারান্দায় কারা কথা বলছে, এত সকালে কে এল। ঝড়েশ্বর উঠে বসলেন। দেয়াল ঘড়িতে চোখ গেল—ছটা বেজে গেছে। সারারাত গরমে ভাজা ভাজা হয়েছেন, তোররাতের দিকে ঘুমটা লেগে এসেছিল। বয়স হয়ে যাওয়ায় ঘুম এমনিতেই তার কম। রাতে দু-তিনবার টয়লেটে না গেলেও চলে না। লোডশেডিং, সেই রাত আটটায়, তারপর আর কারেন্টের পাত্তা নেই। জ্যৈষ্ঠের গরম, চাতক পাখির মতো আকাশ-বাতাস একটুকু বৃষ্টির জন্য কবে থেকে ছটফট করছে।
কারা কথা বলছে নীচে? কাজের মেয়েটা, এবং মনে হল নিরু সঙ্গে। দুজনেরই বেশ ব্যস্ত গলা পাওয়া গেল।
ভিতরে এসে বসো। এত রোগা! পারবে! বাচ্চা। তোমাকে তো আরও বড় মেয়ের কথা বলেছিলাম।
পারবে মাসিমা। গাঁয়ে থাকে, গরিবের ঘরে বড়ো হয়, খেতে-পরতে পায় না। জল-বাতাস লাগলে দেখবেন দুদিনে ফন ফন করছে।
ঝড়েশ্বর ভাবলেন—তাহলে সেই লোকটা এসে গেছে। সল্টলেকে রিকশ চালায়, পূর্ত ভবনে পেনশনের লাইফ সার্টিফিকেট জমা দিতে গিয়ে নিরু লোকটাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। কাজ সেরে অফিস থেকে বের হতে তার দেরিই হয়ে গেছিল, ফিরে দেখে গাছের ছায়ায় লোকটা রিকশয় ঘুমিয়ে পড়েছে। ইস, খুবই দেরি হয়ে গেছে, নিরুর যত বয়স হচ্ছে, তত ন্যায়-নীতিবোধের কামড় বাড়ছে। ফলে খুবই সহৃদয়, নিরু না বলে পারেনি, দেরি হয়ে গেল! কিছু খাবে? বলে ব্যাগ থেকে ভাড়া বাদেও অতিরিক্ত দশটা টাকা দিয়ে বলেছিল, খেয়ে এস। পেট তো পড়ে গেছে। সকালে কী খেয়ে বের হয়েছিলে?
নিরুর এমনই স্বভাব, রিকশয় উঠতে কথা, বসতে কথা, চলতে কথা। নাম, কোথায় থাকে, ছেলেপুলে কি? সারাদিনে কত রোজগার, ঝড় বাদলায় বন্ধে কী করে চলে! নিরুকে নিশ্চয়ই রিকশওয়ালা তোয়াজ করে কথা বলেছে, তোয়াজ করলেই নিরু কেমন বড়ো বেশি বিবেচক হয়। কে বলবে, বৈকুণ্ঠের রিকশয় সে সেদিনই উঠেছে। যেন কতকালের চেনা।
তাহলে সেই বৈকুণ্ঠ হাজির। সুন্দরবনের বাঁদা অঞ্চলে কোথায় কোন সুদূরে থাকে। ট্রেনে, বাসে, ভটভটিতে যেতে হয়—হেঁটেও যেতে হয় ক্রোশতিনেক সকালে বের হলে গাঁয়ে পৌঁছতে তার সাঁজ লেগে যায়। নদীনালা, খাঁড়ি আর সুন্দরী গাছের জঙ্গল। নদী পার হয়ে বাঘও চলে আসে—সুযোগ পেলে। বেনা ঘাসের মাঠের মধ্যে ফরেস্টার বাবুদের কোয়ার্টার। তার বউ সেখানে জল বাটনা দেয়। নিরু এসে কত খবর দিয়েছিল। তার বড়ো মেয়েটাকে রাখার একটা জায়গা খুঁজছে। খেতে-পরতে দিলেই হবে। আর যদি কিছু টাকা ধরে দেন মাসিমা—এই পর্যন্তই কথা।
ঝড়েশ্বর আর বসে থাকতে পারলেন না। তাঁর ঘুম ভেঙে যাবে বলে নিরু নীচের বারান্দায় খুবই আস্তে কথা বলছে। বৈকুণ্ঠ গাঁয়ের লোক, আস্তে কথা বলার অভ্যাস নেই। সে জোরেই কথা বলছে। মাঝে মাঝে নিরু বলছে, আস্তে কথা বল। বাবুর ঘুম ভেঙে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে বৈকুণ্ঠের গলার স্বর নিস্তেজ। এমনই যখন চলছিল, তিনি শিয়রের কাছ থেকে চশমাটা চোখে পরে চাবির গোছা হাতে নিয়ে স্লিপার পায়ে গলিয়েও কী ভেবে আর গলালেন না। সিঁড়িতে নামার সময় চটির ফট ফট শব্দে নিরু বুঝতে পরবে, তিনি নামছেন। নিরুর অনেক কিছুই তখন পছন্দ না, সেজন্য নিরু সতর্ক হয়ে যেতে পারে।
এ-বাড়িটায়, এখন বলতে গেলে তাঁরা দুজন। পুত্ররা সবাই কাছাকাছি জায়গায় ফ্ল্যাট কিনে উঠে গেছে। সতের-আঠারো বছরে, বলতে গেলে বাড়িটা খালিই হয়ে গেল। বাড়িটাতে ঘরেরও অভাব ছিল না। দু-তলা, তিনতলা মিলিয়ে মেলা ঘর। এক একটা অংশে, বাথরুম এবং দুটো শোবার ঘর, পুত্রদের বিবাহিত জীবনে কোনো অসুবিধা না হয় ভেবেই করা। রান্নার লোক, ঠিকে ঝি এবং সব সময়ের টুকিটাকি কাজের জন্যও একজন চব্বিশ ঘণ্টা থাকার মতো কাজের মহিলার বন্দোবস্ত আছে।
তবু কাউকে ধরে রাখা গেল না। কী যে অসুবিধা, তবে অসুবিধা থেকেই যায়, নানা কারণে ঠোকাঠুকিও হয়, মানিয়ে নেওয়ার মতো জীবনই তৈরি হয়নি হয়তো।
তিনি নীচে নেমে আসার সময়ই বাড়িটার ভবিতব্য ভেবে কষ্ট পাচ্ছিলেন।
নীচে নেমে দেখলেন কাকলাশ মতো একটি লোক বসার ঘরে মেঝেতে বসে আছে। আর একজন বালিকা, আট-দশ বছরের, ছেঁড়া ফ্রক গায়ে দিয়ে, নিরুর প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। তাঁকে দেখেই নিরু বলল, বলেছিলাম না বৈকুণ্ঠ ঠিক লোক নিয়ে আসবে। বৈকুণ্ঠের বড়ো মেয়ে, ফুলি, এই প্রণাম কর। দাদু বলে ডাকবি।
তাহলে সব ঠিকই হয়ে গেছে। কিন্তু এতটুকুন মেয়ে, শীর্ণকায়, চোখ কোটরাগত, অনাহার এবং অনিদ্রার ছাপ চোখেমুখে, কতটা পারবে বুঝতে পারলেন না ঝড়েশ্বর। কিন্তু কিছু বলারও উপায় নেই। নিরুর ফুটফরমাশ খাটায় লোকের যে দরকার তিনিও বোঝেন। কোমরে-হাঁটুতে বাতের ব্যথা লেগেই আছে–বয়স হলে শরীরও ভালো যায় না, রান্নার মেয়েটা, রান্না করে চলে যায়, ঠিকা ঝি কাজ করে চলে যায়, চব্বিশ ঘণ্টার কোনো লোকই আর থাকে না, বিপদে আপদে বাড়িতে কেউ না থাকলে এ-বয়সে দিশেহারা হতেই হয়। নিরুকেও দোষ দেওয়া যায় না। শিখিয়ে-পড়িয়ে নিলে ফোন ধরতে পারবে, বাজার থেকে দৌড়ে দরকারি টুকিটাকি জিনিসও নিয়ে আসতে পারবে, বড়োই জরুরি সংসারের পক্ষে। তবে বড়ো করে না তুললে, কোনো কাজেই লাগবে না।
