বউমাদের আসকারায় এই মহিলাটি যে মাথায় চড়ে যাচ্ছে। বউমাদের কাছে ভিজে বেড়াল, আর প্রিয়নাথের কাছে যেন ব্যাঘ। কিছু বলারও থাকে না। বউমারাই তার টাকা জোগায়। খাওয়ার খরচা তো সরকারি। প্রিয়নাথকে সমীহ করার কোনো কারণই থাকতে পারে না। কারণ প্রিয়নাথই বোঝেন এই মহিলা কেনাকাটার নামে কীভাবে টাকা সরায়। তিনি এটা জানেন বলেই আরও বেশি তাঁর ওপর খাপ্পা।
এই যেমন—
ক-কেজি আলু?
পাঁচ কেজি!
প্রিয়নাথ বোঝেন, মহিলাটি দামেও মারে, ওজনেও মারে। যতটা পারেন তিনি নিজে কেনাকাটা করার চেষ্টা করেন। বাজারেও সঙ্গে নিয়ে যান—এটাও বেদানার ক্ষোভের কারণ। যাই হোক, তাঁকে তাড়াতাড়ি গড়াগড়ি দিয়েই উঠে পড়তে হবে। বাকি দু-পাতা লিখে ফেলতে না পারলে, সম্পাদককে দেওয়া কথা ঠিক রাখতে পারবেন না।
তাও তিনটে বেজে গেল। হাতমুখ ধুয়ে লিখতে বসবেন সবে, দরজায় ডোর বেল বাজল, কে এল! কারও তো আসার কথা না।
তুই।
কী করব, চলে এলাম।
নিপুকে যে এস টি ডি করলাম, সে কিছু বলেনি। বাড়িতে কত রকমের অশান্তি জানিস! তোর বউদির এক কথা—কতকাল টানবে? তোর নাম শুনলেই কেমন হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এক কথা, পল্লব যেন এ বাড়িতে আর না আসে। আমি কী যে করি না!
পল্লব চুপচাপ বসেই আছে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। অভাবের তাড়নায় পাগলা। পাঁচটা মুখ, উপার্জন করার কেউ নেই। পল্লবের পুত্ররাও বড়ো হয়ে গেছে, বেকার, পল্লব সামান্য একটা চা-এর দোকান সম্বল করে, আর মাথার উপরে দাদা তো আছেই, এই ভরসায় সুদিনের অপেক্ষায় বেঁচে আছে।
বউদি কোথায়? পল্লব কেমন চোরের মতো কথাটা বলল।
উপরে। ঘুমিয়ে আছে।
পল্লব কিছুটা যেন স্বস্তি বোধ করছে, যাক ঘুমিয়ে আছে।
তখনই প্রিয়নাথ বললেন, কটার গাড়িতে এলি?
সকাল আটটার গাড়িতে
তখনই মনে হল সিঁড়ি ধরে কেউ নামছে। রমলা হলে ভয়ঙ্কর কাণ্ড বেধে যেতে পারে। অসুস্থ রমলা মাঝে মাঝে মানসিক অবসাদে ভোগে। তখন যে কী হয় তাঁর প্রিয়নাথ বোঝেন তাঁর ভাই-বোনদের প্রতি রমলার প্রচণ্ড উত্মা আছে। তাঁর ভাই বোনদের আর্থিক সঙ্গতি কম। তবু সবার চলে যায়—পল্লবের দু-বেলা অন্ন জোটানোই কঠিন। মাসে মাসে সে এসে উদয় হবেই, তবে এবারে সাংঘাতিক বিপদের মধ্যে আছেন, রমলা বলেই দিয়েছে, এলে এবার ছেড়ে কথা বলব না। ভেবেছে কী!
তাড়াতাড়ি তিনি উঠে গেলেন। চুপিসারে দেখলেন, না রমলা নয়। বেদানা। বোধ হয় কারও ফেরার কথা আছে, ফলের রস কিংবা দই-এর শরবত করতে নামতে পারে।
তিনি ডাকলেন, বেদানা, শোনো।
বলেন।
এদিকে, শোনো।
বলেন।
কিছুতেই আসছে না। শুধু বলেন বলেন করছে।
পল্লব এয়েছে। চা করে দাও। ডিম ভেজে দিও। চারপিস রুটি সেঁকে দাও। বেলা তিনটের সময় ভাতের বন্দোবস্ত করাও কঠিন। ভাতের কথা বললে, তিনি মুখ ঝামটাও খেতে পারেন—কেমন আতঙ্কের মধ্যে আছেন। পল্লব প্রায় চোরের মতোই বলল, কিছু খাব না। ছটার ট্রেন ধরব। ভাত খেতে গেলে দেরি হয়ে যাবে।
পল্লবও বোঝে চুপি চুপি কাজটা না সারতে পারলে দাদার সমূহ বিপদ। এতদূর থেকে এসেছে ভাইটা, কিছু না খেয়ে গেলে মন তাঁর ব্যাজার হয়ে যাবে–তখনই প্রিয়নাথ না বলে পারলেন না, আমার জন্য চা হচ্ছে–কত আর সময় লাগবে! এই বেদানা, আমাদের দু-কাপ চা করে দাও। বেদানা বলল, কাপ তো একটা–
কেন আমার কাপ কী হল।
আপনারটাই আছে, আর কাপ নেই।
তার মানে, এই তো ট্রেতে কাপ মেলা, এটাতে দাও।
এটা বউদির কাপ। ওঁর বাবা এ-কাপে চা খান এলে। বউদির বারণ আছে। প্রিয়নাথ কেন যেন উন্মত্তের মতো ডাইনিং হলে ঢুকে গেলেন। দেওয়ালের কাবার্ডে থরে থরে সাজানো দামি সব কাপ ডিশ। কাচের ভেতর থেকে জ্বলজ্বল করছে। তিনি প্রায় খেপে গিয়েই বললেন, এই তো সেদিন এক ডজন কাপ ডিশ কিনে দেওয়া হল, কোথায় গেল!
আমি কী করে বলব, কোথায় যায়? সরকারি জিনিস, যে যার মতো চা খায়, ভাঙে। কেউ কি দেখার আছে।
কাবার্ড থেকে বের করে নাও। বেদানা খুবই তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, আমি ধরি, আর মুখ ঝামটা খাই। বউদিরা রেখে দিয়েছে, ওদের আত্মীয়স্বজন এলে তারাই বের করে দেয়। চাবি। তাদের কাছে।
তোমার মাসিমার কোপ থেকে বের করে দাও।
দাঁড়ান চাবিটা নিয়ে আসছি।
প্রিয়নাথ আঁতকে উঠলেন, এই বাড়িঘর তাঁর। এই বাড়িটা করার সময় সবার সুযোগ-সুবিধার কথা ভেবে করেছেন, সংসারের জোয়াল এখনও তাঁর ঘাড়ে। তাঁর নিজের কেউ এলে, এই যেমন তাঁর বন্ধু-বান্ধব, অনুরাগী পাঠকও হতে পারে, রমলা সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসবে। কাপ ডিশ বের করে দেবে, তারা চলে গেলে আবার তুলেও রাখবে। এজমালি বাড়ি, এজমালি সংসার, সবই তাঁর, অথচ কিছুতেই তাঁর অধিকার নেই। তাঁর গরিব আত্মীয়স্বজনরা এলে, কারও সাড়া পাওয়া যায় না।
বেদানা সিঁড়ি ধরে উঠছে।
এই শোনো, তোমাকে যেতে হবে না। এক কাজ করো, আমার কাপটায় পল্লবকে চা দাও, আর গেলাসে না হয় আমাকে দাও। তোমার মাসিমাকে আর ডেকে তুলতে হবে না।
অথচ ভিতরে এতই খেপে আছেন, এত তীব্র কষ্ট হচ্ছে যে, লাঠি দিয়ে কাবার্ডের সব কাপ ডিশ কাচ ভেঙে দিতে পারলে তিনি যেন কিছুটা ধাতস্থ হতে পারতেন। এমনকী গোটা বাড়িটায় আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারলে আরও ভালো হত। অথচ পারছেন না। শেকড় ছাড়া জীবনে তিনি নিজেই যেন আজ উৎপাতের শামিল। রমলা জেগে গেলে আর এক কেলেঙ্কারিদেরাজ খুলে দিয়ে বললেন, তোর যা লাগে নিয়ে যা। এই প্রথম মনে হল তাঁর, পল্লব যতটা পারে তুলে নিয়ে গেলে তিনি যেন আজ নিজেকে প্রকৃতই হালকা বোধ করবেন।
