তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, কী হল, এত দেরি!
তাঁর সাহস নেই বলার, রিকশার ভাড়া নিলে—অথচ এলে হেঁটে।
বেদানা বলল, কী করব, রিকশা না পেলে কী করব।
দেরি হয়ে যাবে বলে হেঁটেই চলে এলাম। এত বড়ো রাবণের সংসারের বোঝা কার টানতে ইচ্ছে হয় বলুন।
তিনি কথা বাড়ান না, কথা বাড়ালেই, তার মেজাজ অপ্রসন্ন হয়ে যাবে বুঝতে পারেন। এতে তাঁর লেখার ক্ষতি হয়। হাত মুখ ধুয়ে লেখার প্যাড টেনে আবার কয়েক লাইন লিখে ফেললেন। চারপাতা লেখা হয়েছে, আর চারপাতা লেখা হলেই, হাজারখানেক টাকা হয়ে যায়? এই হিসাব কাজ করছে কেবল মাথায়। বিকালেই কাগজ থেকে লোক আসবে লেখাঁটি নিতে। তিনি সকাল থেকে এভাবেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে দু-চার লাইন কিংবা আধ পাতা লেখেন।
তখনই ডোর বেল বেজে উঠল।
এই কুচি, দরজা খুলে দে।
আমরা স্যার বারোয়ারিতলা থেকে এসেছি।
তাদের আবদারের কথা এবার শুনতে হবে, চিফ গেস্ট, না হয় সভাপতি, এবং সংবর্ধনাও হতে পারে তিনি মুখ গম্ভীর করে রাখেন—আচ্ছা ঠিক আছে কবে যেন?
পয়লা মে।
আমি তো থাকব না ভাই।
তিনি আর কোনো কথা বলতেই রাজি না, প্যাড, কলম পাশে পড়ে আছে। কতক্ষণে উঠবে এরা, তারপর নিরাশ হয়ে চলে গেলে আবার আধপাতাও লেখা হয়নি, কুচি এসে হাজির। ঠাম্মার ওষুধ দাও। কুচি এখন রমলার দেখাশোনা করে, রমলা এত ভোগে, অথচ তিনি হাতে ওষুধ না তুলে দিলে, রমলা ওষুধ খেতে ভুলে
যায়। তাঁকে অগত্যা উঠতে হয়। ওষুধ দিয়ে আসতে হয়। কুচি জল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কোন ওষুধ কখন খেতে হবে তাও মনে করিয়ে দিতে হয় প্রিয়নাথকে।
প্রিয়নাথ নীচে নেমে দেখলেন, ঘর ফাঁকা, যাক বাঁচা গেল। ঘড়ির দিকে তাকালেন, দশটা বাজে, আর দু-ঘণ্টা হাতে সময় আছে, বারোটায় তাঁকে খেয়ে নিতে হয়, রমলা ঠিক বারোটা বাজার আগেই স্নান সেরে ঠাকুরকে ফুলজল দিয়ে নীচে নেমে আসবে। তাঁর দেরি হলে রমলা খেপে যাবে, এই দু-ঘণ্টার মধ্যে বোধহয় বাকি চারপাতা শেষ করা যাবে না।
আজকাল লেখার জন্য শব্দ বেঁধে দেওয়া থাকে, কখনো তিন হাজার, আবার কখনো ত্রিশ হাজার। পাটিগণিতের মতো অঙ্ক কষে, ক-পাতা কত লাইন, লিখে না দিলে কাগজের অসুবিধা। সব খেয়াল রেখে আর মাত্র চারপাতা। খাওয়ার পর শরীরে বড়োই আলস্য দেখা দেয়। দিবা নিদ্রার অভ্যাস আছে। ঘুম থেকে উঠে বাকি যেটুকু থাকে লিখতে হবে। আর যদি দু-ঘণ্টায় চার পাতা হয়ে যায়—তার লেখার গতি এবং ঘণ্টার পরিমাপ হিসাব মতো না হলে গল্প শেষ নাও করে উঠতে পারেন, ইচ্ছে করলে রাতে লিখতে পারেন, তবে নিশ্চিতভাবে রাতে লিখবেনই এমন বলা যায় না কারণ লোডশেডিং গরম এবং মশার উৎপাত এত বেশি যে রাতে কিছুই করা যায় না। মশারির নীচে ঢুকে কেবল বই পড়া যায়। আর খুবই অনিদ্রায় ভোগেন বলে হাই তোলা যায়।
তাঁর আর রমলার খাওয়া সারতে সারতে সাড়ে বারটা বেজে যায়। তখনই বেদানা ফেরে ছোটো দুই নাতনীকে নিয়ে। স্কুল বাস থেকে তাদের নামিয়ে দেওয়া হয়, বেদানা তাদের প্রায় টানতে টানতে নিয়ে আসে। এই সময়টায় তিনি চেয়ারে বসে থাকেন। মোটরে আর এক দফা জল তোলেন, কারণ ট্যাঙ্কের জল এই সময়টায় যেটুকু হয়, তুলে রাখেন—কোনো কারণেই যেন দুতলা তিনতলায় জলের অভাব না হয়।
এই সকালটায় নানা উৎপাতের মধ্যে আরও একটি বড়ো উৎপাত—কারণ তিনি নিজেই জানেন না, কখন বাড়িটার পাহারাদার হয়ে গেছেন। যেমন ফোন, হ্যালো ম্যাডাম আছেন। তিনি ডাকেন, কুচি কুচি কুচি এলে বলেন, দ্যাখ তো তোর বড়ো বউদি বের হয়ে গেছে কিনা কলেজে, না বাড়িতেই আছে।
বড়ো বউদি বের হয়নি।
নিয়ে যা। আপনি ধরুন। বাড়িতেই আছে। আবার দু-পাঁচ লাইন—
হ্যালো, ডাক্তার চক্রবর্তী আছেন?
না, নেই।
কোথায়?
হাসপাতালে।
কখন ফিরবে।
রাত হবে। ফোন ছেড়ে আবার পাঁচ-সাত লাইন—
হ্যালো—
বলুন।
আমি বাবা সুপ্রিয়া, আপনার নাতনীরা ফিরেছে?
হ্যাঁ ফিরেছে।
একটু দিন তো ওদের—আবার আট-দশ লাইন—
হ্যালো—
বলুন।
আমি সুকুমার দাস বলছি।
বলুন।
এফ এমে আপনার সাক্ষাৎকার শুনেছি। আপনি যে আমার গাঁয়ের লোক জানতামই না।
তারপর এত কথা যে তিনি বাধ্য হয়ে শুধু শুনে যান। হুঁ হাঁ করেন। কতক্ষণে ফোনের আবদার শেষ যে হবে!
আপনাকে আমাদের বাড়ির সবাই দেখতে চায়। গাড়িতে নিয়ে আসব। কবে সুবিধা হবে।
আপনাকে জানাব। আপনার ফোন নম্বরটা দিন, আসলে যেভাবেই হোক এসব আবদার থেকে আত্মরক্ষার তাঁর উপায় থাকে না বলেই তিনি ফোনের নম্বর চেয়ে নেন, আর দু-পাতা যে তাকে শেষ করতেই হবে। ঘড়ির দিকে তাকান-রমলা ঠিক বাথরুমে ঢুকে গেছে। সে বের হয়ে এলেই তাঁকে চানের ঘরে ঢুকতে হবে।
নাতনীদের খাওয়া হলেই সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে যায়। তারা গিয়ে যে যার বিছানায় শুয়ে পড়ে। তাঁকেও উপরে উঠে যেতে হবে। তাঁরও খাওয়াদাওয়ার পর একটু গড়িয়ে না নিলে, শরীরের জড়তা কাটে না। আর দু-পাতার মধ্যে গল্পটা শেষ করতে হবে—কিন্তু হাতে যে সময় নেই। সন্ধ্যায় কাগজের লোকটি আসবে তিনি যে কী করেন।
এখন বাড়িটা বলতে গেলে খালি। বড়ো বউমাও বের হয়ে গেছে। পার্থর স্কুল চারটায় ছুটি হয়। বাড়ি ফিরতে ফিরতে পাঁচটা। আসলে পাঁচটার পরই সবাই ফিরতে শুরু করে। কুচির কাজই তখন বারান্দায় বসে থাকা-রান্নার মেয়েটাও চলে আসে, ঘরে ঘরে কুচি পছন্দমতো জলখাবার দিয়ে আসে। কিন্তু এই দুপুরে বাড়িটা খুবই নির্জন। বেদানা নাতনীদের ঘরে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমায়। কোনো দরকারে তাকে ডেকে তোলারও সাহস হয় না।
