থাকবে কেন। কাজের লোক বলে কি তারা মানুষ না! সিঁড়ি ধরে নামতে নামতে বড়ো বউমার মন্তব্য।
ঠিক কথা। খুবই যথার্থ কথা।
তিনিও জানেন, থাকবে না। পালাবে। তোষামোদ করে কাজের লোক না রাখতে পারলে, এখন যে খুবই বিড়ম্বনা, তাছাড়া এত বড়ো সংসারে, কর্তা গিন্নি মিলে দু-জন, তিন পুত্র, তিনি বউমা মিলে ছ-জন, আর চার নাতি-নাতনী, এই মিলে সংসার বড়োই বলা যায়, তার ওপর আরও তিনজন, এতসব লোকের খাওয়া-থাকা, শোওয়া, তাদের জলখরচ থেকে শুরু করে হাত খরচের বহর যে। কত বেড়ে যায়, প্রিয়নাথের মাথায় যে বোঝা কত ভারী হয়ে যায়, কেউ বুঝতেই চায় না। বউমারা ছেলেরা তো কেউ মাগনা খায় না, টাকা দিয়েই খায়। সুতরাং, খরচ কী বাড়ল বা কী কমল তাদের দেখার কথা না—তোমাকে বাপু গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতেই হবে।
সকালে উঠেই তিনি বাথরুম সেরে, মোটর চালিয়ে লিখতে বসেন। আধ এক পাতা লেখা হতে না হতেই বেদানা দরজায় হাজির। হাতে তিন চার রকমের বাজারের থলে।
আমি এগচ্ছি।
এগও।
লেখার কাগজ সরিয়ে তিনি উঠে পড়েন। তারপর ফর্দ মতো বাজার। সব মাছ সবাই খায় না। একমাত্র কাটা পোনা ইলিশ পার্সে এবং চিংড়ি মাছ সর্বজনগ্রাহ্য। তবে রমলা হাঁপের রুগি বলে, একমাত্র সে-ই চিংড়ি আর ইলিশ পাতে নেয় না। অন্য মাছ, যেমন প্রিয়নাথ পছন্দ করেন মৌরলা মাছ। নাতনীরা বউমারা মৌরলা মাছ কেউই খেতেই চায় না। প্রিয়নাথ পছন্দ করেন পাবদা মাছ, ছোটো বউমা পাবদা মাছ দেখলেই অক অক করে কলতলায় ছুটে যায়। কফের দলার মতো দেখতে—তিনি অবাকই হয়ে যান, লৌটটা মাছ হলেও কথা ছিল, পাবদা মাছ কফের দলা হয়ে গেলে তিনি যে নিরুপায়। মাগুর মাছ ছেলেরা এবং তিনি নিজে খুবই পছন্দ করেন, কিন্তু বড়ো নাতি খায় না।
কেন খায় না?
রমলা বলেছিল, তুমি ডেকে জিজ্ঞেস কর না।
হ্যারে পার্থ, মাগুর মাছ খাস না কেন?
সে কোনো জবাব না দিয়ে সিঁড়ি ধরে তিনতলায় ছুটে গিয়েছিল।
তার হয়ে বড় বউমা হাজির।
আর বলবেন না বাবা, বারান্দায় সেদিন একটা মুচি জুতো সেলাই করছিল। মাগুর মাছের চামড়া মুচিটার গায়ের চামড়ার মতো। ওর খেতে নাকি ঘেন্না করে।
এই গ্রীষ্মের দাবদাহে বাজারে পছন্দ মতো মাছ কেনা যে কত কঠিন তিনি ভালোই বোঝেন। মাছের বাজারে ঢুকলেই—চেঁচামেচি। বাবু, কেউ মেসো, কেউ কাকা যে যার মতো তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়ে নিয়েছে। তিনি যে সরেস মাছের খদ্দের তারা ভালোই জানে।
বাবু, সাড়ে চারশো!
না, চারশো। দ্যাখ চারশো-তে যদি দাও, এক কেজি দিতে পার।
বাবু পোষাবে না। তা পোষাতে নাই পারে—বাগদা চিংড়ি বলে কথা।
এইভাবেই একসময় রক্ষাও হয়। কে কী মাছ খায় সেই মতো কেনেন। রমলা চিংড়ি মাছ খান না। তাঁর জন্য আলাদা দু-আড়াইশো কাটা পোনা নিতেই হয়।
দু-দিনের বাজার তাঁকে এভাবে সারতে হয়—মাগুর মাছ একবেলা, ইলিশ না হয়, কাটাপোনা একবেলা, এই মাছের কেনাকাটা করতে তার ঘণ্টাখানেক কাবার হয়ে যায়। বেদানা তরকারির বাজার সেরে ফেলে—কে কী খাবে যেমন রমলার পাতে শাক না পড়লে ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। যেমন তিনি নিজে নিমবেগুন, অথবা উচ্ছে ভাজা প্রথম পাতে খেতে পছন্দ করেন। নতুন আম ওঠায় চাটনির জন্য আর টমেটো কেনা হয় না। ঝোলে, তরকারিতে টমেটো না হলেও আবার চলে না, সবার সব পছন্দ বুঝে রমলার ফুল বেলপাতা, নিজের জন্য মর্তমান কলাও কেনেন তিনি। কলা, দু-পিস পাউরুটি আর একটি সন্দেশ হলে তাঁর সকালের জলখাবার হয়ে যায়।
বাড়িতে সবারই দু-বেলা ভাত, চামরমণি চালের ভাত দু-বেলা—সোজা কথা! রাত্তিরে রুটি কিছুতেই আর চালু করা গেল না। দু-বেলাই মাছ, মাছ ছাড়া কেউ মুখে ভাত তোলে না। কাজের লোকদের জন্য রাতে মাছ না নিলেও হয়, এই ভেবে তিনি নিজে কিছুদিন রাতে মাছ পাতে নেন। তিনি না খেলে, কেউ কেউ যদি রাতে মাছের বাড়তি খরচ ভেবে না খায়, এবং তাঁর দেখাদেখি সংসারের অতিমাত্রায় খরচের প্রতি যদি সজাগ হয়, হলে কী হবে, তিনিই খান না, সবাই খায়। রমলা বিরক্ত হয়ে বলবে, তুমি না খেলে কারও কিছু আসে যায় না বোঝ না। রান্নাঘরটা কাজের লোকদেরই জিম্মায়। যে যার মতো ঘড়ি ধরে নামে, খায়, তারপর অফিস, হাসপাতাল, কলেজ, যার যেখানে কাজ চলে যায়। ছুটির দিনে অর্ডার মতো সরবরাহ হয়ে থাকে।
কেউ চাউমিন সকালে।
কারও লুচি ছোলার ডাল।
কারও এক গ্লাস দুধ, দু-পিস পাউরুটি।
ফ্রিজে কী আছে না আছে বেদানা খবর রাখে।
মেসো, ডিম আনতে হবে, দুধ আনতে হবে। পাউরুটি আনতে হবে। দুধ আনতে হবে। পাউরুটি আনতে হবে। বেদানাই কে কী খাবে না খাবে, নীচে নেমে জানিয়ে দেয়। প্রিয়নাথের একটাই কাজ লক্ষ রাখা। কোনো কারণেই যেন কেউ না ভাবে, তিনি ঠিক মতো কিচেনের সরবরাহ বজায় রাখতে পারছেন না।
প্রিয়নাথ আজ বাজার থেকে ফিরে দেখলেন, বেদানা ফেরেনি। তিন চারটি ব্যাগ বয়ে আনা তাঁর পক্ষে সম্ভব না বলেই পাঁচটা টাকা দেন রিকশ ভাড়া বাবদ। তিনি হেঁটে চলে আসেন। বেদানা এল না এখনও, কিচেনে হুলস্থল, কখন বাজার আসবে-কখন কী রান্না হবে, তিনি তো যতটা সত্বর সম্ভব বাজার সেরে তাকে ছেড়ে দিয়েছেন, সে না আসার কোনো কারণ থাকতে পারে না। রাস্তায় এগিয়ে দেখলেন, বেদানা হেঁটে আসছে।
