আর বিনু কত সহজে যে বুঝে ফেলল, অপু আর আগের অপু নেই। অভিজ্ঞতা অপুকে ভীষণ বদলে দিয়েছে। সে শুধু আকাশ ছুঁয়ে দিলেই খুশি না, আরও কিছু চায়। অপুর মুখে চোখে ক্রমে উষ্ণতা জমে উঠছে। বিন্দুমাত্র শিথিলতা উভয়কে গ্রাস করবে। সে বলল, আমি ফুল ছিঁড়ে খেতে ভালবাসি। তুমিও। তবু আমার কাছে তুমি আগের অপু হয়ে যাও।
অপু বলল, আমরা সবাই। তারপর কিছু বলল না। যেন নিজের বাড়ি, নিজের ঘর, এমনভাবে দরজা জানালা সব ফের বন্ধ করে দিচ্ছে। অপুর অহমিকায় লাগছে। তুমি চিরদিন ভালো মানুষ থাকবে, ভারি মজা! আমি ব্যবহারে ব্যবহারে পুরোনো হয়ে যাই, তোমার তাতে বুঝি কিছু আসে যায় না। এসব সে বলতে পারত। ভাবো শুধু ঐশ্বর্য তোমারই আছে, আমার ঐশ্বর্য কিছু নেই! সে এবার বিনুর পাশে দাঁড়িয়ে বলল, নিবারণ কোথায়?
বিনু বলল, অপু নিবারণ রাতে বাইরের ঘরে থাকে। প্লিজ তুমি ছেলেমানুষী কর না।
অপু যে এখন কী করে। সে অপমানে মুখ লুকিয়ে রেখেছে বিনুর পিঠে। এবং বিনু বুঝতে পারলে, এতদিন পর অপু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
আর তখনই বিনুর কি হয়ে যায়। আবার সেই রিনরিন বাজনা মাথার ভেতর। যেন সে তেমনি অপুকে কাছে পেয়ে দুহাতে সব লুটেপুটে নেবে। সে আগের মতো ফের লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটবে—সে আর অপু। পৃথিবীতে সে আর অপু। আর কিছু লাগে না।
বিনু একটা শাদা চাদরে এবার শরীর ঢেকে দিল। নীল রঙের সামান্য বাতিটা জ্বলছে। দূরে সেই রেল-ইয়ার্ডের ঘটাং-ঘটাং শব্দ। ক্রমে নিশীথের সব শব্দ মুছে গেলে শুধু নীল আলোটা জেগে থাকল পৃথিবীতে। অনেক দুরে বনের গভীরে হায়েনারা যেন ডাকছে। আর কিছু না। পৃথিবী তারপর শব্দ গন্ধহীন এক আশ্চর্য পারাবারে নিথর হয়ে আছে।
প্রহসন
বয়স যত বাড়ে মেজাজ তত তিরিক্ষি হয়ে যাবার কথা। কিন্তু প্রিয়নাথ সারাদিন মেজাজ ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করেন। কিছুতেই তিনি নিজেকে আর রিপুর তাড়নার মধ্যে ফেলে দিতে চান না।
সকাল থেকেই শুরু।
লোডশেডিং। জল তোলা যাচ্ছে না। বাড়িতে এতগুলি লোকের বাথরুমের জল, এছাড়া কাচাকাচি আছে অফিস, কলেজ, স্কুল যাবার তাড়া, ট্যাঙ্কের জল না থাকলে দোতলা, তিনতলা সম্পূর্ণ কানা। একতলায় তবু চলে যায়। টিউবওয়েলের জল টেনে স্নানটানও সারা যায়—কিন্তু তখন কাজের লোকদের কী মুখ!
কে টানবে এত জল!
কে টানবে এত জল!
তা ঠিক, যেন সবটাই প্রিয়নাথের দায়। ডিপটিউবওয়েল না করার খেসারত। সবার যেন এক কথা, তাঁকে তাক করে, তুমি বোঝে। কে টানবে এত জল।
এই তো দু-বালতি জল উপরে তুলে দিলাম। হাত জোড়া, যাই কী করে! ছোড়দা বের হবে, সবে ভাত নেমেছে। কোনদিকে সামলাব!
রান্নার মেয়েটা আজ দেরি করে আসায় সকাল থেকেই বেদানার চোপা শুরু হয়ে গেছে। সবার আগে বের হয় তার ছোড়দা, হাসপাতাল বলে কথা। সে নিজেই ছোটো ডিকচিতে ভাত বসিয়ে দিয়েছে—গাড়ি এলেই ছোড়দা বের হয়ে যাবে। তারপরই তর তর করে নেমে আসবে মেজদা মেজবউদি। ওরা একসঙ্গে অফিস পাড়ায় যায়। গাড়িতে গেলেও এক ঘণ্টার কমে হয় না। বাড়িটা অফিস পাড়া কিংবা হাসপাতাল থেকে দূরে হয়ে যাওয়ায় সকাল থেকেই তাড়া—এই ঝমকি, টেবিলে ভাত দিয়ে দাও–মেজদা, মেজবউদি নামছে, এই ঝমকি মাসিমা আজ পোস্তর বড়া খাবে, তাঁর জন্য আলাদা পোস্তর বড়া করে রেখো। এই ঝুমকি, মান্তু নান্টুকে ডিমের ঝোল করে দেবে, মাগুর মাছ খেতে চায় না—প্রিয়নাথ নিজের বসার ঘরে বসে সবই শুনতে পান। বাড়িটা শহরের বাইরে হওয়ায়, স্কুল কলেজ হাসপাতাল অফিস সবই প্রায় এক দেড়ঘণ্টা দূরে হয়ে যায়। উলটোডাঙা কিংবা কাঁকুরগাছিতে বাড়িটা কেন যে করলেন না, সেই নিয়েও কম উম্মা নেই বউমাদের–ইস সকাল হতে না হতেই নাকে মুখে গুঁজে ছোটো-পারা যায়।
প্রিয়নাথ বোঝেন বউমাদের কথায় খোঁচা থাকে—এক সময় এতে তিনি ক্ষুব্ধ হতেন, আজকাল তাঁর সব সয়ে গেছে।
এমনিতেই জলের টানাটানি, জলের সাপ্লাই কমে গেছে—বিড়ালের পেচ্ছাবের মতো সরু হয়ে নীচের ট্যাঙ্কে জল পড়ে, সারাদিনে ট্যাঙ্ক ভর্তি হয় না, জল খরচের নানা বিধিনিষেধও তিনি সব কাজের লোকদের ওপর জারি করে দেন। এই যেমন,
শোনো ঝুমকি, খুচরো বাসনকোসন টিপকলের জলে ধুয়ে নেবে। লাইনের জলে হাত দেবে না। ঠিকা ঝি সুমিত্রা এলেও সতর্ক করে দেন, লাইনের জলে একদম হাত দেবে না। ট্যাঙ্ক ভরেনি। কাচাকাচি সব টিপকলের জলে সারবে। নীচের ট্যাঙ্ক ফাঁকা, উপরে জল উঠবে কী করে।
মুসকিল কুচিকে নিয়ে।
মাস তিনেক হল, বাড়িতে আমদানি।
অবশ্য রমলার দোষও দেওয়া যায় না। তার টুকিটাকি ফুট ফরমাস খাটার লোক নেই, প্রাতঃ ভ্রমণে বের হয়ে এক সকালে মেয়েটাকে নিয়ে হাজির।
প্রিয়নাথ সেদিন বাজারে বের হচ্ছেন, তখনই রমলা ঢুকে বলেছিল, নিয়ে এলাম মেয়েটাকে। দুশো টাকা দিলেই হবে। আমাদের তো দেখার কেউ নেই, এক গ্লাস জল চাইলে পাওয়া যায় না। দোতলা থেকে ডাকলে কেউ সাড়াই দিতে চায় না।
প্রিয়নাথ বললেন, ভালো করেছ।
সেদিন তিনি বাজারে বের হচ্ছেন, দেরি হলে পছন্দমতো মাছ পাওয়া যাবে না। স্ত্রীর নিবুদ্ধিতার প্রতি কোনো কটাক্ষ না করে বের হয়ে যাওয়াই আত্মরক্ষার প্রকৃষ্ট উপায়—কুচিকে নিয়ে তিনজন কাজের লোক, থাকা-খাওয়া, এবং তাদের শোওয়ার ব্যবস্থা, এছাড়া বাড়িটায় আলাদা বাথরুম নেই। কাজের লোকদের জন্য বাইরে কলতলায় ব্যবস্থা করে দিলেও, তারা কলতলায় খোলামেলা জায়গায় চান করতে রাজি না, সেই জন্য যদি থাকতে না চায় মুসকিল
