অপু বলল, ভাবলাম যখন কলকাতায় এলাম মাসিমা পুনুর সঙ্গে দেখা করে যাব। কেউ নেই। তুমি একা।
বিনু আবার মনে করিয়ে দিল,, নিবারণ আছে।
—নিবারণ আছে, আমাকে মনে করিয়ে না দিলেও চলবে।
বিনু বলল, চল তাহলে ভিতরে গিয়ে বসি।
আমি আর একদিন না হয় আসব।
ভিতরে নাই গেলাম।
-–আমার সব দেখে যাবে না! আমি কিভাবে বেঁচে আছি দেখে যাবে না!
অপু চারপাশের দেয়াল দেখছে। মানুষটার রুচি আছে। সোফা, ডিভানে। কারুকার্যময় কভার বিদেশি রেকর্ডপ্লেয়ার গমগম করে যেন এক্ষুনি রেকর্ড বেজে উঠবে। আসলে সে কি করবে ভাবছিল। আসলে সে যে গোপনে এখানে চলে এসেছে। কথাবার্তায় এতটুকু বুঝতে দিল না।
বিনু বলল, কবে এলে, কোথায় উঠেছ, তোমার কোনো খবরই আমি জানি না। অপু চোখ তুলে এক পলক দেখে নিল মানুষটি তেমনি আছে। এতটুকু স্বভাবে পরিবর্তন নেই। তার মানুষের সঙ্গে এ-মানুষের স্বভাব একেবারে আলাদা। জোরজার করে নিতে জানে না।
বিনু ফের বলল, একটু বসে গেলে তুমি খারাপ হয়ে যাবে না। আমারও ভালো লাগবে।
-সত্যি বলছ! অপুর চোখে সামান্য বিদ্যুৎ খেলে গেল।
–জানি না অপু। তুমি কত বদলে গেছ। এবার অপু কেমন সাহসী মেয়ের মতো হেঁটে যেতে থাকল বিনুর পাশাপাশি। লম্বা করিডোরে আশ্চর্য সব সুন্দর ছবি, জানালায় মানিপ্ল্যান্ট। বারান্দা পার হয়ে ওরা ডাইনিং রুমে ঢুকে গেল। পাশে দুটো ছোটো ব্যালকনি। ব্যালকনির পাশে বিনুর শোবার ঘর। সেন্টার টেবিল। বাতিদানে সবুজ ঝালরের ঢাকনা। ফুলদানিতে একটা তাজা পলাশের ডাল। ফুলগুলো লাল টকটক করছে। জানালাগুলো সব বন্ধ।
অপু কেমন সহজভাবে নিঃশ্বাস ফেলার জন্য এক এক করে জানালাগুলো খুলে দিতে থাকল। এখন মনেই হবে না, সে এ-বাড়ির কেউ নয়। জানালা খুলে দেবার সময় একবার ঘাড় ঘুরিয়ে বিনুদাকে দেখল। বিনুদা ভীষণভাবে ওকে দে কেউ নেই। নিবারণ কোথাও গেছে। ওর শরীরে সেই রক্তপ্রবাহ ফের ঝিমঝিম করছে। বিনুদার সঙ্গে আকাশ ছুঁতে ইচ্ছে করছে।
অপু বলল, কি সুন্দর ফ্ল্যাট তোমার বিনুদা। জানালাগুলো বন্ধ করে রাখো কেন! তুমি ভীষণ দেখছি অন্ধকারে থাকতে ভালোবাস।
বিনুর মনে হল জানালা খুলে দিয়ে অপু সবটাই খোলামেলা করে দিল। যদি কোনো ইচ্ছের কথা থাকে, বাইরের মাঠ, দূরের রেলগাড়ির শব্দ এবং বড় আকাশ কখনো তাদের ছোটো হতে দেবে না। বিনু না হেসে পারল না। ওর কেবল বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল অপু বিয়ের পর তুমি আরও সুন্দর হয়েছ। বর্ষার নদীর মতো তোমার এখন পাড়ে পাড়ে কাশফুল। আমাকে সামান্য ফুল তুলতে দেবে না অপু?
অপু কেমন ছেলেমানুষের মতো হাত পা ছড়িয়ে বিনুর বিছানায় বসে পড়ল। বলল বিনুদা, এখানে কখনো আসব, তোমার সঙ্গে কখনো পালিয়ে দেখা করতে পারব স্বপ্নেও ভাবিনি।
বিনু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এখন সিগারেট খাচ্ছে। মাঝে মাঝে চুরি করে দেখছিল অপুকে। অপু কত কথা বলে যাচ্ছে! কিছু শুনছে, কিছু শুনছে না। অপু কেন এখানে এসেছে। তার স্বামী এখন কোথায়, কবে তাকে নিতে আসবে, তার বাবার খবর কী, সে কবে চলে যাচ্ছে ফের, তার কিছুই বলছে না।
বিনু বলল ঠিকানা কী করে পেলে?
—সব খবর রাখি মশাই।
–পুনুর বিয়ে হয়ে গেছে জানতে?
—সব জানতাম।
—সব জেনে এভাবে চলে এসেছ! এটা ঠিক করনি।
অপু আদৌ পাত্তা দিচ্ছে না তার কথা। সে তার খুশিমতো এখানে পালিয়ে এসেছে। সে বলে আসতে পারত, তবু কি যে থেকে যায়, গোপনে কোথাও চলে যেতে এখনও তার ভীষণ ভালো লাগে। এ শহরে এসে সে এক দণ্ড দেরি করতে পারেনি।
বিনু বলল, কী খাবে?
—কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।
–কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। বিনু সামান্য দুষ্টুমি করতে চাইল।
–এই খারাপ কথা একদম বলবে না।
–কবে এসেছ এখানে? বিনু সামান্য ঘুরিয়ে দিল প্রসঙ্গ।
—আজই।
—কবে যাবে?
—জানি না।
—মানুষটি কোথায়?
–বাইরে গেছে।
—কবে আসবে?
—বেশি হলে ছ-মাস।
–অনেকদিন গেছে?
–গত মঙ্গলবার। এখন থেকে পুরো ছ-মাস বাবার কাছে।
–খুব কষ্ট তবে!
-আবার! একটু থেমে বলল, বাড়িতে যাবার আগে, তোমার এখানে হয়ে গেলাম। তোমাকে না দেখে যেতে পারলাম না।
-মেসোমশাই তাহলে এখানে।
—বাবা সল্ট লেকে বাড়ি করেছেন।
–তাই!
অপু বলল, এভাবে পালিয়ে দেখা করে গেলাম বলে রাগ করছ না তো! তুমি যা মানুষ। বলেই আগের মতো হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল অপু। আর আশ্চর্য অপু, বিনুদা ঘরে নেই। সে বলল, তুমি কোথায় বিনুদা?
-এখানে।
–কী করছ?
–চা।
–কেন তোমার নিবারণ?
–ওর চা তুমি খেতে পারবে না।
–আমি বুঝি চা করতে জানি না? বলেই এক লাফে উঠে বসল। বিনুর পাশে গিয়ে বলল, তুমি সরো। কোথায় কী আছে বল। করে আনছি। চা না খাওয়ালে তোমার কিছুতেই যখন চলছে না…
ওরা দুজন-যখন সামনা-সামনি বসে চা খাচ্ছিল ঘরে সামান্য সবুজ আলো, অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে দুজনের মুখের ছায়া তখন বিনু না বলে পারল না, তুমি না এলে ভালো করতে।
অপু চায়ের কাপ নীচে নামিয়ে রাখল। বলল, তার মানে।
–তুমি খারাপ হয়ে যাও, আমি চাই না অপু।
অপু কেমন বিস্মিত গলায় বলল, খারাপ! খারাপ আবার কী জিনিস!
—তুমি বুঝতে পারছ সব। দোহাই আর ব্যাখ্যা করতে বল না।
অপুর হাসি পাচ্ছিল। ভীষণ, হাসি পাচ্ছিল। বোধ হয় হেসে বলত, তুমি কি বোকা না বিনুদা! কিন্তু সে হাসল না। বরং খুব গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, বাজে কথা রাখ।
