আর বিনু এটা কখনও বুঝতেই পারিনি। সে অপু এবং তার বাবা মাকে স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। অপু তেমনি হাসিখুশি ছিল। সে বুঝতেই পারেনি, অপুকে নিয়ে তার বাবা মা দূরে চলে যাচ্ছে। আর এদিকে সহজে ফিরছে না। সে স্টেশনে গাড়ি ছাড়ার সময় বলেছিল, গিয়েই চিঠি দেবে অপু। তোমার চিঠি পেলে ছুটি নিয়ে চলে যাব।
অপু বলেছিল, আচ্ছা।
তারপর আর অপু তাকে চিঠি দেয়নি। কতদিন হয়ে গেল। সে একটা চিঠির আশায় কতদিন জানালায় দাঁড়িয়ে থেকেছে। চিঠি আসেনি।
তারপর একদিন রোজ দশটা চিঠির মতো একটা চিঠি—তাও মার নামে। অপুর বিয়ে। সরল সহজ নিমন্ত্রণের চিঠি। আর কিছু না। কেয়ার অফ শুধু সুবিনয় মজুমদার। সে অপুকে যে একটা চিঠি লিখবে ভেবেছিল তাও আর পারল না।
এবং এ-ভাবে যখন বিনুর ছুটির দিনগুলো ভীষণ লম্বা হয়ে যেত তখন বার বার মনে পড়ত অপুকে। জানালায় দাঁড়ালেই মনে হয় অপু যেন বার বার তার হাত ধরে আকাশ ছুঁয়ে দেখবে বলছে, সে কিছুতেই পারছে না।
আর এ-ভাবে জানালায় দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারল ক্রমে সূর্য রেল-ইয়ার্ডের ও পাশে অস্ত যাচ্ছে। গাড়িগুলো টংলিং টংলিং শব্দ করে চলে যাচ্ছে। ক্রমে আকাশ অন্ধকার হয়ে উঠছে। নিবারণ ঘরের আলো জ্বেলে দিচ্ছে এক এক করে। আশ্চর্য শূন্যতার ভেতর সে এখন বেঁচে আছে। পুনুর বিয়ে হয়ে গেছে। মা মাঝে মাঝে তীর্থে চলে যান। এত বড়ো ফ্ল্যাটে সে আর নিবারণ। আর কেউ না। অপু এ-সব একেবারে জানে না। ওর তখন শুধু অপুর নামে একট চিঠি লিখতে ইচ্ছে হয়–তোমাকে পাওয়ার মতো সব কিছু হয়েছে আমার অপু। সুন্দর ফ্ল্যাট, বিশ্বস্ত চাকর ছোট্ট পুলের বাগান, দুটো নীর রং-এর বেতের চেয়ার, একটা ছোট্ট সাদা রং-এর গাড়ি। সবই হয়েছে। তবু ছুটির দিনে আর কোথাও যাই না। বাসাতেই শুয়ে বসে সারাটা দিন কাটিয়ে দিই। কোথাও বেড়াতে বের হলে নিজেকে বড় একা মনে হয় অপু। আমার কিছু ভালো লাগে না তখন।
তারপর মনে হয়ে বিনুর অপুকে সে যেন প্রতিদিন এ-ভাবে একটা চিঠি লিখতে পারে। প্রতিদিন একটা করে নীল রং-এর খাম ডাকবাকসে ফেলে দিয়ে আসতে পারে। কোনো ঠিকানা থাকবে না। শুধু নাম লেখা থাকবে অপু। চিঠিটা অপু পেল কি পেল না আসে যায় না। সে চিঠি অপুকে লিখেছে, তার নিজের কাছে এর চেয়ে বেশি দামি আর কিছু নেই। আর যদি কেউ এসে দেখতে পায়, ওর টেবিলে, বালিশের নীচে, ড্রয়ারে সেলফে সর্বত্র, এমন অনেক চিঠি, চিঠি লিখে রাশি রাশি কাগজ সারা ঘরে ছড়িয়ে রেখেছে—অবিশ্বাস করার কিছু নেই। বিনু সময় পেলেই অজস্র চিঠির বেলুন আকাশে উড়িয়ে দিতে ভালোবাসে। আসলে মানুষ বোধ হয় দুঃখ নিয়ে বেঁচে থাকতে ভালোবাসে। সবাই কিনা বিনু জানে না, তার তো বেশ ভালো লাগে।
আর তখনই মনে হয় মার মুখ অভিমানে ফেটে পড়ছে। বিনু, তুই আর বিয়ে-থা করবিনে। বয়স তোর জন্য বসে থাকছে!
সে হেসে বলত মা বিয়ে বিয়ে করছ, হয়ে গেলেই তো শেষ। সে কখনও ঠাট্টা করে বলত ইস আমার বিয়ে, ভাবতে কি মজা লাগে না। বিয়ের কথা ভাবলেই আর ঘুম আসতে চায় না মা। তারপর সে মায়ের মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলত, আচ্ছা মা, বাবার সঙ্গে যখন তোমার বিয়ের কথা হল, ঘুম আসত তোমার?
মা তখন ছোট্ট মেয়েটির মতো ফিক করে হেসে দিত। বলত, নাক ডাকিয়ে ঘুমোতাম।
-মা তুমি সত্যি কথা বলছ না।
–হ্যাঁরে সত্যি কথা। তোর বাবাতো আমার দাদার বয়সি। দাদার সঙ্গে একই স্কুলে পড়ত। আমাদের বাড়িতে বিয়ের আগে কত এসেছে।
–মা–আ, তুমি ভালোবেসে বাবাকে বিয়ে করেছ। সব্বাইকে বলে দেব।
বিনু ভা…ল হ…চ্ছে…না।
তখনই নিবারণ এসে বলল, দাদাবাবু আপনাকে কে ডাকছে। বিনুর চিন্তাভাবনা সহসা ভেঙে খানখান হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, যেমন সে প্রতিদিন ছুটির দিনে বিকেলে জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে, আজও তেমনি ছিল। কত কিছু মনে হচ্ছিল তার। নিবারণকে ডেকে বলল, বলতে বল। যাচ্ছি।
পার্লারে ঢুকে সে হতবাক। অপু চুপচাপ বলে আছে। পাশে ছোট্ট অ্যাটাচিকেস। ওর কপালে খুব ছোটো সিঁদুরের টিপ। সে পরেছে মুগা রং-এর মণিপুরী শাড়ি। পায়ে আলতা। আর আশ্চর্য সৌরভে সারা ঘর ম ম করছে। বিনু বলল, অপু, অপু, তুমি।
অপুর চোখ ভারি চঞ্চল। সতেজ। নতুন অভিজ্ঞতা অপুর শরীরে। বিনু আনন্দে চিৎকার করে ডাকল নিবারণ তুই ওকে চিনিস না।
নিবারণ বলল, অন্ধকারে ভালো দেখতে পাইনি বাবু।
বিনু বলল, অপু তুমি এখানে ভাবতে পারছি না।
অপু শুধু বলল, এলাম। তুমি কেমন আছো?
—আমি ভালো আছি অপু।
অপুর বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, তুমি ভালো নেই বিনুদা। তুমি মিথ্যে কথা বলছ। সে এসব কিছুই বলল না। শুধু বলল, মাসিমা, পুনু।
-মা তো এখানে নেই। পুনুর বিয়ে হয়ে গেছে।
–তুমি একা।
–না। বিনু ফের একটু থেমে বলল, আমি আর নিবারণ।
অপু বলল, দাঁড়িয়ে থাকলে কেন? বোস। একা বেশ ভালোই আছ দেখছি।
-এই চলে যাচ্ছে। বিনু কথাবার্তায় কেন জানি আর সহজ হতে পারছে না। সে ঘাবড়ে গেছে।
-তোমার মতো মানুষের চলে গেলেই হল।
তারপর কেউ কিছু বলছে না। চুপচাপ। দূরবর্তী কোনো বনে টুপটাপ পাতা ঝরে পড়ছিল বোধ হয়।
বিনুর তখন মনে হল, অপুর আর আগের স্বভাবে নেই। খোঁচা দিয়ে কথা বলতে শিখে গেছে। অভিজ্ঞতায় ভীষণ সতেজ এবং দু-পাড় ভরে আছে বর্ষার নদীর মতো।
