তখন বিনু ঘড়ি দেখত। কানের কাছে এনে দেখত, ঘড়ি ঠিক চলছে, না চলছে না। তারপর বলত, আর একটু বসি। সাতটা মাত্র বাজে। তুমি চলে গেলে ভারি একা হয়ে যাব আমি।
অপু আর কিছু বলতে পারত না তখন। সে তার সব জোর হারিয়ে ফেলত বুঝি। ঘাসের ভেতর সে পা আরও ডুবিয়ে দিত। শাড়ি টেনে আরও পা ঢেকে বসত। অস্পষ্ট আলো থাকত তখন চারপাশে। মাঠের এ-দিকটা ভারি নিরিবিলি মনে হত তাদের। সামান্য ঝোপ-জঙ্গল পাশে। ওরা বেশ সুন্দর করে ছেলেমানুষের মতো কখনো আইসক্রিম খেত, কখনো চা, অথবা কখনো বেলুন উড়িয়ে দিতে ভালোবাসত আকাশে। এবং মাঠের গাছপালার ভেতর ওরা হেঁটে যেতে যেতে কখনও ভারি অন্যমনস্ক হয়ে যেত।
—এই বিনুদা, কী ভাবছ!
–কিছু না।
–তা হলে দাঁড়িয়ে পড়লে কেন!
–দ্যাখো দ্যাখো অপু কি সুন্দর নীল আকাশ! আর কত বড়ো।
অপু বলত, ও আবার দেখার কি আছে।
বিনু বুঝি বলতে পারত, আকাশ মানুষের কাছে সব সময় নীল থাকে না। সব সময় এত বড়ো দেখায় না। অপু তোমার সঙ্গে হাঁটলে, আকাশটাকে ভীষণ নীল মনে হয়, আকাশটা মনে হয় ভীষণ বড়। ইচ্ছে করে তখন আমরা আকাশটা ছুঁয়ে দি। তারপর সহসা ভীষণ সতর্ক গলায় বলত—তোমার আকাশ ছুঁতে ইচ্ছা করে
অপু। অপু পায়ের নোখে তখন মাটি খুঁড়ত। ওর মুখ দেখা যেত না। স্যাম্পু করা চুলে ওর মুখ ঢেকে থাকত। বিনুর বার বার ইচ্ছে হত চুল সরিয়ে ওর সুন্দর মুখ দেখবে। ওর ইচ্ছে হলেও সে সেটা কিছুতেই পারেনি।
বিনু তখন ভয়ে ভয়ে বলত, তুমি কিছু মনে করলে?
অপু তেমনি মুখ না তুলে বলত, না।
-তবে বল ছুঁতে ইচ্ছে করে কি না?
আপু বলেছিল করে।
আর বিনুর কি যে হত তখন। মাথার ভেতর আবার সেই রিনরিন বাজনা। যেন সে দু-হাতে তখন চারপাশের যা কিছু আছে সব লুটেপুটে নেবে। সে যেন লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটবে। সে আর অপু। অপুর শাড়ি তখন বাতাসে উড়বে। আর সুন্দর সব গাড়ি ঘোড়া চারপাশে। তখনও সে আর অপু। কেবল কোথাও কেউ ক্ল্যারিওনেট বাজাবে—তখনও সে আর অপু। পৃথিবীতে শুধু সে আর অপু। আর কিছু সে ভাবতে পারত না। আর কিছু তার মনে থাকত না।
অপু বলত, আমরা তারপর কি করব বিনুদা?
বিনু বলত, আমরা কিছু করব না, শুধু ফুল ছিঁড়ে খাব।
অপু বলত, তুমি ভারি খারাপ কথা বলতে পার বিনুদা।
এ-ভাবে ওরা চুপচাপ কথা বলত। ছুটির দিনগুলো সে অপুকে নিয়ে এভাবে ঘুরত। সে জানত না, অপুরা কখনও প্রবাসী হয়ে যেতে পারে। সে বুঝতে পারত না অপুর বাবা এটা পছন্দ করবেন না। আর অপুর স্বভাবতে ভীষণ নরম। অপু কষ্ট পাবে, কিন্তু কেউ তার জন্য কষ্ট পাক অপু তা চায় না। বিনুর মনে হয় দিনগুলো একইভাবে কেটে যাবে। তার তখন অফিসে সামান্য কাজ, সামান্য বেতন, সে বড়ো বলে দায়দায়িত্ব বেশি। ছোটো ফ্ল্যাট ছোটো সংসার মা আর পুনু। পুনুর সঙ্গে অপুর ভীষণ ভাব অপু পুনুর কলেজের বন্ধু। পুনুই প্রায় এক সন্ধ্যায় অপুকে টানতে টানতে নিয়ে এসেছিল তার কাছে। বলেছিল দাদা এই হচ্ছে আমাদের অপর্ণা রায়। আমরা কলেজের বন্ধুরা ওঁকে অপু ডাকি। ভারি মিষ্টি দেখতে না দাদা।
অপুর দু চোখ ভারি। অপু সেদিন কিছুতেই মুখ তুলে তাকাতে পারেনি। ওকে খুব সুন্দর বলে পুনু কি যে বিপদে ফেলে দিয়েছে। শিরশির করে রক্তচাপ সারা শরীরে তার। সে তো আগেই দেখেছে বিনুদাকে। বিনুদার লম্বা গড়ন, ঘন চুল আর সহজ কথাবার্তা এত বেশি আকর্ষণ করেছিল যে সে একটা কথা বলতে পারেনি।
অপু একদিন বলেছিল, বিনুদা তোমাকে একটা কথা বলা দরকার।
বিনু মুখ তুলে তাকিয়েছিল। ওর মুখে মটন-ওমলেট। সে কথা বলতে পারছিল না।
অপু আবার বলেছিল, বাড়িতে সবাই টের পেয়েছে।
–কী বলছ। প্রায় বিষম খাবার মতো। আর তো তোমাদের বাড়ি আমার যাওয়া হযে না। ভাববে ভীষণ ধূর্ত আমি। বড়লোকের মেয়েকে ফুসলে নিয়ে যাচ্ছি।
অপু খুব গম্ভীর। খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। কথা বলছে না। বিনুও কেমন ভয় পেয়ে গেল। বলল, এই।
—বিনুদা সব কিছু নিয়ে তুমি ঠাট্টা করতে পার। আমি পারি না। ভেবেছি মাসিমাকে বলে তোমার কাছে চলে আসব।
অপুকে ভীষণ সাহসী দেখাচ্ছিল। অপু সেদিন পরেছিল, লালপেড়ে মুর্শিদাবাদ সিল্ক গায়ে নীল রং-এর ব্লাউজ—সাদা রং-এর জমিন ছিল ওর শাড়ির, আর কী যে স্নিগ্ধ লাগছিল ওকে দেখতে। কপালে বড়ো করে আলতার টিপ। সারা মুখ ছিল পবিত্রতায় ভরা। বেশ স্থির গলায় বলেছিল, তুমি তো বিনুদা ভীতুগোছের মানুষ। তোমার সব কিছু জোর করে না নিলে আমি কিছু পাব না।
বিনুর মনে হয়েছিল, অপু ঠিকই বলেছে। অপু এবং সে আলাদা স্বভাবের। অপুর বাবা এটা সহজে মেনে নেবেন না। অপু যত কথা বলতে বলতে গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিল তত তার ভয়। ভেতরে যেন খচখচ করে সংশয়ের কাঁটা ফুটছে। প্রাণের ভেতর থেকে কেমন সে আর সাড়া পাচ্ছিল না।
বিনু বলেছিল অপু একটু অপেক্ষা করতে হবে। পুনুর বিয়ে হয়ে যাক। মা শুনলে খারাপ ভাববেন। সংসারে আমি ভীষণ তা হলে স্বার্থপর হয়ে যাব।
অপু বলেছিল, বাবা দিল্লিতে বদলি হয়ে যাচ্ছেন।
–হঠাৎ।
তোমার হাত থেকে বোধ হয় আমাকে বাঁচাবার জন্য। অপু এমন বলতে পারত। সে কিছু বলল না। এ-সব বলে তার বাবাকে বিনুদার কাছে ছোটো করে দিতে পারে না। সংসারে যে অপুকে নিয়ে চাপা অশান্তি চলছে, কিছুতেই কেন জানি মুখ ফুটে কোনোদিন অপু বলতে পারল না। কোথায় যেন এতে ওর পারিবারিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছিল।
