সে কখনও কখনও এ-ভাবে বিকেলটা কাটিয়ে দেয়। সামনে অ্যাসফালটের কালো রাস্তা কোথায় চলে গেছে সে যেন সঠিক জানে না। রাস্তার দু-পাশে কোথাও কলের চিমনি, কখনো সাইরেনের শব্দ, আর কখনো সব গাড়ি হুসহাস বের হয়ে যাচ্ছে। তখন নিবারণ আসে, হাতে এক কাপ চা। দাদাবাবু চা আপনার।
সে চোখ তুলে তাকায়। নামটা মনে করতে পারে নিবারণ। নিবারণ অনেকদিন ওর সঙ্গে থেকে গেল। অনেকদিন কোনো মানুষ একসঙ্গে থেকে গেলে আপনি মায়া গড়ে ওঠে। অপু তার সঙ্গে অনেকদিন ছিল। ছুটির দিনগুলো তখন এত একঘেয়ে মনে হত না। বড় সহজে ছুটির দিনগুলো তার শেষ হয়ে যেত। তারপর কেমন রাখতে হয়—এই এতটা অ্যান্টি লিখব, নইলে পাবলিক নেবে না, কিন্তু লাইনটা খুব মোটা করে টানা আছে, দাস ফার অ্যান্ড নো ফাদার।
রাত্রি আর একটু গভীর হয়ে এসেছে, কলধবনি এখন শান্ত, আর সেই শান্ত পরিবেশে নক্ষত্রখচিত আকাশের নীচে উঠেছে সেতারের মদ ঝঙ্কার। কার্পেটের ঠিক মাঝখানে বসেছেন আলি সাহেব, তার চোখ বোজা আর শীর্ণ আঙুলগুলো ওঠানামা করছে সেতারের গা বেয়ে—কোমল মৃদু সেই স্পর্শ, যেন অভিমানী প্রিয়ার কপট ঘুম ভাঙানোর জন্যে প্রেমিকের ভীরু সঞ্চার।
আশে পাশে ছড়িয়ে আছে অনেক সুশ্রী তনু। অনেক কোমল মুখশ্রী নরম আলোয় আরও স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। অন্ধকারে হঠাৎ ঝিলিক দিয়ে উঠেছে কোনো নাকছাবি বা কর্ণভূষণ। তালে বা বেতালে মাথা নাড়ছেন লম্বাচুলের কোনো কোনো পুরুষ, আর্টক্রিটিক তারা বা কোনো সংস্থার কর্ণধার, কবি বা চিত্রাভিনেতা-তারা সকলেই বিশিষ্ট এবং বুদ্ধিজীবী।
একটু দূর থেকে লক্ষ্য করছিল জয়তী কার্পেটে না বসে সে বসেছে কোণের একটা হেলানো চেয়ারে। পরনে তার রূপোলি পাড়ের গোলাপি বেনারসি, হাতে কানে গলায় হিরের ঝিলিমিলি। মুখে তার তৃপ্তি মাখানো—সবাই এসেছে, সবাই এমনকী জয়ন্ত ভৌমিক অবধি। কি মায়াবী এই রাত্রি, কি মধুর এই সেতার, কী মোহন এই পরিবেশ… কিন্তু কিছু কি এতো ভালো লাগত যদি না এরা সকলে উপস্থিত থাকত? উষ্ণ ঘন মদের মতো এই উৎসবের প্রতিটি মুহূর্ত নিঃশেষে পান করছিল সে। এই পরিমণ্ডল রচনা করতে পারার ক্ষমতা তাকে নেশা ধরিয়ে দিচ্ছিল। স্বপ্নালু চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকালো জয়তী।
সেতারের ঝঙ্কার দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। প্রিয়ার ঘুম ভেঙেছে বুঝি, প্রেমিকের আবেশ নিবিড় হয়েছে, অভিলাষ তীব্র থেকে তীব্রতর। তারারা আলো আরও উজ্জ্বল, সুরের মূৰ্ছনা ঢেউয়ের মতো উঠছে আকাশপানে। নূপুর পরা কচি পদপল্লব ছন্দে ছন্দে মূদু স্পন্দিত হচ্ছে। নিঃশব্দচারী বেয়ারারা স্ন্যাকস আর ড্রিংকস বদলে বদলে দিয়ে যাচ্ছে।
আপনার গ্লাস যে খালি, সোমনাথ আস্তে বলল। আরে না-না, আপনি ব্যস্ত হবেন। সে কী কথা, সোমনাথ গ্লাস নিয়ে উঠল, আর তক্ষুনি তার মাথা ঘুরে গেল। দু-এক সেকেন্ড সব অন্ধকার, তারপর কোণের বার-এর দিকে এগিয়ে গেল। আজকাল প্রায়ই এরকম হচ্ছে। ডাক্তার দেখিয়ে চেক-আপ করব তারই বা সময় কই? ব্যাঙ্গালোর যাবার আগে একবার—ভিড় গোলমাল আর সহ্য হয় না। জয়তী জানে সব, তবু কিছুমাত্র বিবেচনা নেই। সেতারটা কিন্তু সত্যি সুন্দর বাজাচ্ছে, সোমনাথের কপাল মুহূর্তের জন্যে মসৃণ হল, সহসা তাকে তরুণ দেখাল।
…তীব্র গভীর উন্মাদনা… তারপর মধুর মধুর ক্লান্তি। ধীরে ধীরে লীয়মান হল সুরের রেশ সেই প্রশান্তির বক্ষে। নিঃশ্বাস পড়ল টেবিলে টেবিলে আলো উজ্জ্বল হল, আর সুগন্ধী সুসজ্জিত এই সমাবেশ উজ্জীবিত, চঞ্চল, মুখর হয়ে উঠল।
মফতলালের শেয়ার সম্বন্ধে কী বলছিলেন তখন? ওহে, বুলু সেনকে জিজ্ঞেস করো তো রাজাধ্যক্ষ সত্যি কাজ ছাড়ছে নাকি? ওই তো জয়ন্ত ভৌমিক, বাঃ হ্যান্ডসাম সত্যি। মিসেস সিং, এতো দামি প্রেজেন্ট কেন? কিছু না কিছু না, মেনি হ্যাপি রিটার্নস—
চিকেনটা একটু দেখি, জয়তী আজ তুমি দেখছোই না আমাকে, আমি কিন্তু সেই তখন থেকে–আঃ ছাড় না, কি যে করো সন্দীপ, ডাকছি তোমার গিন্নীকে, ইটস হার্ড অন আস, উই পুওর ইন্টেলেকচুয়লস–
আচ্ছা—খুব এনজয় করলুম, আবার নেকসট ইয়ার, সত্যি চমৎকার কপল। যাই বলো জয়তী যেন একটু—মানে সবই ভালো—তবু যেন একটু, ডোন্ট বি ক্যাটি ডার্লিং–
রাত্রি আরো গভীর, লনের আলো নিভে গেছে। বিশাল হলে ছড়িয়ে আছে সিগারেটের টুকরো, ফুলের পাপড়ি আর রঙিন কাগজ। তাপ-নিয়ন্ত্রিত শোবার ঘরে রাত্রির পোশাক পরে ঢুকল সোমনাথ, বিছানা থেকে জয়তী হাত বাড়িয়ে স্বামীকে কাছে ডাকল।
তোমার জন্যে কী এনেছি বলো তো? জয়তী কৌতুকভারে—ব্রীড়াভরে হাসল, তারপর সিল্কের চাদরের তলা থেকে একটা প্যাকেট বের করে আনল।
সোমনাথ খুলল মোড়কটা, ঝকমকে পিতলের একটা পাত্র বের করল।
কি এটা?
আইস টাম্বলার।-সুন্দর না?
আইস রাখবে কী করে এতে? মুখ তত খোলা, বরফ গলে যাবে না?
গলে যাবে?-আচ্ছা যদি মুখটা ঢেকে দেওয়া যায়?
তবুও গলে যাবে, দেখছ না চারিদিকে পার্ফোরেটেড?
ও–।
আর কোনো কথা হল না। নিঃশব্দ ঘরে এরার কন্ডিশনারটার একঘেয়ে গুজন স্পষ্ট হয়ে উঠল।
দুটো একটা শব্দ, হাসি, রিনরিন করে বাজনার মতো যেন কার গলা ভেসে আসে। এই ওঠো। আর না। প্লিজ ওঠ না।
-এত তাড়াতাড়ি উঠবে।
–মাকে বলেছি পুনুর সঙ্গে সিনেমায় যাব। এখন না ফিরলে ভীষণ ভাববে। তারপরই কানে কানে ফিসফিস করে কথা বলার মতো শব্দ ভেসে আসে তিনটের শো কটা অবধি থাকে মশাই।
