কী নির্লজ্জ চেহারা—রাস্তার লোকজনের তোয়াক্কা করছে না। বিপ্রদাসের কেমন আঙুলগুলো শক্ত হয়ে উঠছে। পায়রার বক বকম, দু আঙুলে গলা ছিঁড়ে ফেলবে। সে শক্ত হয়ে যাচ্ছে আর ছুটছে। ভাদু ছাড়া কারও কাজ নয়, মেয়েটাকে ফুসলে ফাসলে গায়েব হয়ে গেছে।
পুষ্পবর্তী বারান্দা থেকে সব তুলে নিয়ে যাচ্ছে ঘরে, তখনই বিপ্রদাস ছুটে এসে বলল, মেয়ে তোর ভেগেছে হারামজাদি, নচ্ছার মেয়েছেলে, কিছুই দেখিস না, মাথায় রক্ত উঠে গেলে তুই তুকারি করার স্বভাব—আর রক্ত ফুটতে থাকলে, তেড়েও যায়, কিন্তু পুষ্পবর্তী খুবই কোমল স্বভাবের, কী করবে, এত যে গালাগাল, তাও মনের ভালো, রাগ পড়লে ঠান্ডা হয়ে যাবে, পুষ্পবতী ঠান্ডা মাথাতেই বলল, কোথাও গেছে। চলে আসবে।
আর আসছে। তারপরই দেখল মুড়ির ঠোঙা ওড়াউড়ি করছে উঠোনে।
ঠোঙা উড়ছে কেন?
ভাদু এসেছিল।
তা হলে সেই ঠোঙা উড়িয়ে দিয়ে গেল।
যা হয় মাথা খারাপ হয়ে গেলে যা হয়, সে একদণ্ড দেরি করল না। ভাদুর ডেরায় গেল—ভাদুর জননী বলল, ভাদু হাড়মুড়মুড়ি বারো ভাজা নিয়ে গাওয়াল করতে বের হয়ে গেছে। কোথায় কতদূরে গেছে, কারণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে সামনে মাঠ, কোথাও ভেরি, রাস্তার দু-পাশে কত গ্রাম কত জনপদ, ভাদু বাড়ি বাড়ি চোং মুখে যদি সত্যি ঘুরে বেড়ায়, আবার নাও বেড়াতে পারে। ভাদু এক মাঠ ভেঙে আর এক মাঠে হেঁটে যায়, তার কাছে ঢাকা কুপিখানার কারিকুরিও মেলা। তার পিঠে টিনের মাথায় সাপের মতো ফোঁস করে থাকে কুপিখানা। ঝড়ে বাতাসে নেভে না—সে মাঠের যত দূরেই থাক, নিশীথে তার চলন্ত কুপির আলো দূর থেকেও দেখা যায়। কাছে এলে পায়ে তার ঘুংগরো বাজে, বেটা যদি গাওয়ালে যায় তবে পালাবার পথ নেই। কোথাও যদি অনুকে তুলে দিয়ে আসে—অনুরে তোর এক ফুচকা খাবার লোভ, বাপের কথা ভাবলি না, তর মার কথা ভাবলি না, তুই উফড়ে গেলি কোথায়-কাকে বলি! বলতে যে তোর কলঙ্ক, তোর মা-বাপের কলঙ্ক। কাকে বলে।
অন্ধকারে মাঠ ভাঙছে বিপ্রদাস। কাশবন পার হয়ে যাচ্ছে। ধুবির বিল এসে পড়তেই মনে হল, আকাশ ক্রমে আরও নেমে আসছে। সে ডাকছিল, অনু রে অনু। আসলে সে অন্ধকারে ভাদুর আশায় দাঁড়িয়ে আছে। এই মাঠ ভেঙে সে ফেরে। আরও ফিরবে। এবং ভাসমান নক্ষত্রমালার ভিতর কোনও নক্ষত্র সচল হয়ে উঠলেই বোঝে, ভাদু ফিরছে। এই ফেরার মধ্যে ভাদু এক আশ্চর্য রহস্যময়তায় যেন মগ্ন হয়ে যায়—তার কুপির আলো বাতাসে কাঁপে, এবং ক্রমে
এগিয়ে আসতে থাকলে কখনও আলেয়ার মতো মনে হয়। চারপাশে কীটপতঙ্গের। আওয়াজ-মযদানবের ইন্দ্রপূরীর নির্বাসিত মানুষজন সেকেউ জানেই না, সে একটা খুন করবে বলে প্রতীক্ষায় আছে। যেন জীবনের সব জ্বালা, এবং জীবনের সব হাড়গোড় বের করা এক ভয়ংকর দাহ্য পদার্থ হাতে নিয়ে সে ঘুরছে। তখনই ভাদু তার মাথার কুপি নিয়ে সামনে উদ্ভাসিত-পায়ের ঘুংগরো ঝন ঝন করে বেজে উঠতেই বিপ্রদাস লাফিয়ে পড়ল, গলা টিপে ধরল, বল শুয়োরের বাচ্চা, অনু কোথায়।
আমি কী করেছি, আমি জানি না কাকা—আমাকে মেরে ফেলো না। অনু কোথার আমি জানি না।
বিপ্রদাস থমকে গেল। কুপিতে আলোতে দেখল, সত্যি বড় নিরীহ গোবেচারা মুখ ভাদুর। তার এই সংশয়ের পীড়ন যে তাকে উন্মাদ করে দিচ্ছে। তার দু হাঁটু ভেঙে আসছে, অবশ হয়ে যাচ্ছে শরীর-কেমন কাতর গলায় বলল, ভাদু অনু কোথায় চলে গেল?
ভাদু কেমন নির্বাকল্প গলায় বলল, কেউ কোথাও যায় না কাকা, যে যার মতো জায়গা বদল করে নে। ওঠো। বসে থাকলে হবে। চল একসঙ্গে না হয় খুঁজে বেড়ায়।
অন্থকাল আরও বাড়ে। দক্ষিণের হাওয়া বয়—ময়দানবের ইন্দ্রপুরী থেকে দুজন নির্বাসিত মানুষ এক নারীর অন্বেষণে অন্ধকালে হাঁটে। অন্থকালে মাঠ ভাঙে। আর পুষ্পবর্তী লণ্ঠন হাতে উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে, মানুষটা কখন ফেরে সেই আশায়।
পৃথিবী তারপর শব্দগন্ধহীন
ছুটির দিনে সুবিনয় অন্যরকমের। অন্য দিনগুলোর মতো সে সেদিন কিছুতেই তাড়াহুড়ো করে না। ঘুম থেকে উঠতে তার দেরি হয়ে যায়। বিছানায় এপাশ ও পাশ করার স্বভাব। সে সকালে সেদিন বাজারে পর্যন্ত যায় না। নিবারণ বাজার করে আনে। ওর তখন সারাটা সকাল কেবল চিৎকার চেঁচামেচি। সিগারেটের প্যাকেটটা কোথায় গেল। বুক পর্যন্ত চাদর টেনে শুসে থাকার স্বভাব। ছ-দিনের খাটাখাটনি একদিনে সে পুষিয়ে নিতে চায়। সে সেদিন কুটোগাছটি পর্যন্ত নাড়তে চায় না।
আর যখন মা থাকে না, পলু থাকে না তখনও সে এ-ভাবে জীবন কাটাতে ভালবাসে। ছুটির দিনে সে বাড়িতে খায় না। নিবারণকে খাবারের পয়সা দিয়ে দেয়। সে কোনো হোটেলে খেয়ে নেয়। সন্ধ্যা সকাল বিকেল এখন শুয়ে থাকা। কোনো গল্পের বই পেলে কথা থাকে না। গল্পের বই পড়তে পড়তে কখনও মনে হয় আজকাল কেউ তাকে ডাকছে।—বিনুদা, দরজা খোল। আমি অপু। আর তখনই এক আশ্চর্য বিষণ্ণতা। মাথার ভেতর মনে হয় গির্জার ঘণ্টা বাজছে। অথবা মনে হয় রেলগাড়ি চলে যাচ্ছে দূরে। অথবা কোনো প্রপাতের শব্দ। সে তখন চুপচাপ শুয়ে থাকতে ভালোবাসে। আসলে কেউ তাকে ডাকে না—সে এটা বুঝতে পারে।
তারপর যা হয়, বিকেল গড়িয়ে গেলেই বিনু আর শুয়ে থাকতে পারে না। জানালা খুলে দিলে বুঝতে পারে বিকেলের সূর্য রেল-ইয়াডের ও-পাশে নেমে গেছে, গাছের ছায়া লম্বা হয়ে যাচ্ছে। ছোটো ছোটো সব ফুলের সমরোহ চারপাশে। ফুলগুলো সব সে ঠিক চেনে না। শহরে এদিকটাতে কোথাও কোনো সবুজ মাঠে সব সুন্দর সুন্দর বাড়ি। লনে কোথাও মেয়েরা টেনিস খেলছে। সে জানালা খুললে এসব দেখতে পায়। মেয়েরা টেনিস খেললে ওর দেখতে ভীষণ ভালো লাগে।
