অনু অর্থাৎ অনুপমা আর্শিতে দাঁত দেখছে। দরজায় ঝুঁকে আছে যে মহিলাটি, সে যে তার মা, তাও যেন মনে হয় না। কী সংসারের ছিরি, সে শালোয়ার কামিজ পরে এখন যে রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে। তার কী সময় আছে বাপকে খোঁজার। বাপের খোঁজে কোথায়ই বা যাবে! বাপের মাথায় আগুন জ্বলছে, যা কিছু একটা করে বসতে পারে, খেপে গেলে এখনও ত্রাসে ফেলে দেয়! সেই বাপকে খোঁজা তার কম্ম নয়। মুখ খিচিয়ে কথা বললে কাঁহাতক সহ্য হয়!
তার এক কথা, আমি পারব না। কতদিনই ত যায়, ফিরেও আসে। তোমার আবার বেশি বেশি! এত উতলা হলে চলে! মেয়েটাও চোখের সামনে ওড়না উড়িয়ে বের হয়ে গেল। কোথায় যাবে কিছুই বলে গেল না। এই আসছি বলে সেও চলে গেল। হতচ্ছাড়া জীবন হয়ে যাচ্ছে, জমি বাড়িঘর কিছুই থাকবে না টের পেয়ে মেয়েটাও কেমন দজ্জাল হয়ে গেল।
পুষ্পবতী কী যে করে! তবু কিছুটা জলা পার হয়ে গেলে মানুষজনের দেখা পাওয়া যায়। চেনাজানা কাউকে দেখলেও বলতে পারে, আপনার দাদাকে দেখলেন! সেই কোন সকালে বের হয়ে গেল, কিছু বলেও গেল না, এই আসছি বলে বের হয়ে গেল, এখন কী যে করি?
আর তখনই দেখল তার মানুষটা বাস থেকে নামছে। দু-হাতে দুটো ব্যাগ। ব্যাগ ভর্তি বাজার, এই যেমন চাল ডাল তেল নুন, তরি তরকারি, ব্যাগ দেখেই পুষ্পবতী দৌড়ে গেল রাস্তায়, সারাদিন একটা মানুষ নিখোঁজ হয়ে থাকলে, যা হাহাকার শুরু হয়! কাছে গিয়ে বলল, দাও, আমি নিচ্ছি।
পারবে না।
কোথায় গেছিলে! একটা খবর নেই! তুমি ত না বলে না কয়ে কোথাও যাও না। আমার কী চিন্তা!
বিপ্রদাস কোনও কথা বলল না। হাতের ব্যাগও পুষ্পবতীকে দিল না। নিজেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে। রাস্তা থেকে জলার পাড়ে পাড়ে বাড়িতে উঠে ডাকল, অনু, অনু, ধর মা।
অনুর কোনও সাড়া নেই।
দরজা হাট করে খোলা।
বিপ্রদাস তাকাল পুষ্পবতীর দিকে। আপশোসের গলায় বলল, আমার সব যাবে। তারপর বারান্দায় ব্যাগ রেখে ডাকল, এই অনু, তুই কোথায়?
মেয়ে তোমার কোথায় উড়তে গেল। আমার মানা শুনল না। এইসব বলতে গিয়ে পুষ্পবতীর মুখ গোমড়া।
টিভি, বুঝলে টিভি। সব খাবে। বাবুরাও খাবে, টিভিও খাবে। ধিঙ্গি নাচ। কোমর বাঁকিয়ে নাচ, লাইরে লাপ্পা গান—সিরিয়েল, কত মজা। বাপ ফিরেছে কী মরেছে, কিছুই যায় আসে না। ঠিক চাঁদুদের টিভির সামনে বসে পড়েছে।
তখন দুটো একটা নক্ষত্র আকাশে ভাসমান—এদিকটায় আলো আসেনি। পুষ্পবতী হারিকেন জ্বেলে দাওয়ায় রেখে দিল। হাতমুখ ধোওয়ার জন্য এক বালতি জল তুলে রাখল। দড়িতে গামছা রেখে দিল। বিপ্রদাস মেজাজ ঠিক রাখতে পারছে না, সে ঠায় খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে আছে। কিছু বলছে না। গুম মেরে আছে।
তারপরই চিৎকার করে বলল, তোর মেয়ে, টিভি বের করছি! বলেই পাগলের মতো ছুটে গেল উঠোন পার হয়ে। পুষ্পবতী তাকিয়ে আছে। বড়ো চণ্ড রাগ মানুষটার। সারাদিন পর বাড়ি ফিরে মেয়েকে না দেখে মাথা গরম—এবং দুটো ব্যাগে কী এনেছে বোঝার চেষ্টায় সব টেনে নামাল—এক প্যাকেট চাউমিন পর্যন্ত এনেছে। মেয়েটা চাউমিন খেতে ভালোবাসে, দিতে পারে না, আজ তাও এনেছে, কোথায় ব্যাগের সব গোছাতে গিয়ে মেয়েটা তার উল্লাসে ফেটে পড়বে, কোথায় পুষ্পবতীর সঙ্গে সবকিছু গোছগাছ করতে বসবে—তা না, কোথায় টিভির সামনে গিয়ে বসে আছে। আসলে মানুষটা যে তার সর্বস্ব দেবে বলে কথা দিয়ে কিছু টাকা ধার করেছে পঞ্চবাবুর কাছ থেকে পুষ্পবতী জানে না। যখন চারপাশে ঠাঠা রোদ্দুর, ঝিম মেরে আছে প্রকৃতি, তেষ্টায় বুক ফাটছে, তখনই মোটর সাইকেলে পঞ্চবাবু দেবতার মতো হাজির—বিপ্রদাস কী ঠিক করলে, হন্যে হয়ে ঘুরছ, মেজাজ ঠিক নেই মনে হয়। ধরো দুশো টাকা, পরে কথা হবে। বিনা মেঘে এই জল যে তার সবকিছু গস্ত করার অছিলা বিপ্রদাস ভালোই বোঝে। তবু তার নিরুপায় জীবন তাকে হাত বিস্তার করে দিতে সাহায্য করল।
বদনদের বাড়ি ঢুকে বিপ্রদাস ডাকল, বদন আছ, বদন!
ও তো দোকানে আছে। বদনের দিদি বের হয়ে বলল, দোকানে যাও না, পাবে।
অনু এসেছে।
না ত।
টিভি দেখতে আসেনি!
না ত!
দেখো না কাউকে জিজ্ঞেস করে। যদি আসে।
বদনের দিদি হেসে ফেলল, বিপ্রদাস আমি ত টিভির সামনেই বসে আছি।
অঞ্জলি কোথায়?
টিভির সামনে।
বদনের বউ?
টিভির সামনে।
সবাই টিভির সামনে, কেবল তার মেয়েটা টিভির সামনে বসে নেই। কোথায় গেল। কার বাড়ি গেল! নিতাইদার বাড়ি ঢুকে বলল, অনু এসেছিল?
না ত।
সবারই এক কথা। সুখদা বলল, দ্যাখ বাসে উঠে চলে গেল কি না! সিনেমার নেশা। যে নিয়ে যায় তার সঙ্গেই চলে যায়।
কথাটার মধ্যে ভারি অশ্লীল কটাক্ষ, তবে বিপ্রদাসের সময় খারাপ, তার সব যেতে বসেছে, পুষ্পবর্তী আর মেয়েটা ছাড়া আর কেউ নেই। কোথাও দূরে চলে যাবে, আর এমুখো হবে না, ময়দানবের ইন্দ্রপুরী তার হাড়গোড় চুষে ছিবড়ে করে ছেড়েছে।
সে বাড়ি বাড়ি খুঁজল। রাস্তায় খুঁজল। ভাদুর সঙ্গে যদি যায়, ভাদু ফুচকা খাওয়াবার লোভ দেখিয়ে যদি আরতি সিনেমা হলে নিয়ে যায়, কিংবা যদি দুষ্ঠজনেই উড়ে যায়—গোপনে কী ঠিক করা আছে সে কিছুই জানে না, ভাদু ইচ্ছে করলেই এক ডাল থেকে আর এক ডালে উড়ে যেতে পারে-যত ভাবছে, তত মনে হচ্ছে পায়রার বকম বকম শব্দ তাকে গোলমালে ফেলে দিচ্ছে। সে বাসস্ট্যাণ্ডে গেল—নেই। চায়ের দোকান এবং মনিহারি দোকানে গেল—যদি দাঁড়িয়ে থাকে। ওই তো মনে হয়, কাছে গিয়ে দ্যাখে সুরধুনী, নবীন চ্যাটুজ্যের মেয়ে, হেলে দুলে হাসি মসকরা করছে তার নাগরের সঙ্গে।
