ভাদু খবর রাখে। সব খবর।
মানুষটা ফিরলে ভাদুর পরামর্শ যে খুব একটা খারাপ না বুঝিয়ে বললে শুনবে। কী দরকার জমি নিয়ে হুজ্জোতি করার। বিনা পয়সায় ত আর নিচ্ছে না। ভাদু ঠিকই বলে, কাকি, বাগুইহাটি, জ্যাংরা, কেষ্টপুর হয়ে গেলে কী ভালো হয়ে। সেদিনও সেখানে সব ধানের জমি, যেদিকে তাকাও, ধানের জমি, আশেপাশে গরিব মানুষের ঘরবাড়ি জোতদার জমিদারও ছিল—এখন যাও, দেখো গে কী একটা মস্ত কারবার গলিঘুজি ভর্তি। কাঁচা নর্দমার গ্যাস। আসলে মুখে বিস্ফোরণের কথা উচ্চারিত হয় না। সে বলে, জনবিচ্ছুরণে প্রাণবায়ু ওষ্ঠাগত যেখানে সেখানে কাঁচা রাস্তা, পিল পিল করে মানুষজন বাসে উঠছে নামছে। মারুতি গাড়ি ঝাঁকে ঝাঁকে, শুধু একটা অকল্পিত শহর—আসলে ভাদু বলতে চায় অপরিকল্পিত শহর। যার মাথা মুণ্ড কিছু নেই। ধানের মাঠও নেই, টালির ঘরও নেই। সব লোপাট। যতদূর চোখ যায় হাউজিং আর হাউজিং। চোখে দেখলে পিলে চমকে যাবে জানো!
তোমার কাকা কি সেটা বোঝে?
বোঝাতে হবে। এতে চরণবাবাজি বলল, ভাদু, কাল বড়ো মহাকাল। সে শুধু গিলে খায়। বলে বিশুবিয়স।
সেটা আবার কী!
এই অনু, বিশ্ববিয়স কীরে।
আমি জানি না।
কী কচু পড়িস বুঝি না! ধুম উদগীরণ করে। তপ্তলাভা উদগীরণ করে। বুঝতে পারলি।
না।
ইস্কুলে যাস কেন? ঘাস কাটতে যাস। চরণবাবাজির কথা কখনও মিছে হয়! উত্তপ্ত লাভা নেমে আসছে। গ্রাম মাঠ ভেসে যাবে। কেউ রুখতে পারবে না। জনবিচ্ছুরণে এই হাস। আমার কথাখান বুঝতে পারলি!
আমার বুঝে দরকার নেই। মাকে বোঝাও, বাবাকে বোঝাও।
শুনলে ত কাকি, তোমার মেয়ের কথা। আসলে কাকি, ওই সে হাউসিং-এর পাল্লায় পড়ে আমরা যে তাড়া খাচ্ছি, কেউ কি আটকাতে পেরেছে। সরকারের সাধ্য আছে-তুমি জমি বেচলেও আটকাবে না, না বেচলেও আটকাবে না। গাছের শেকড়বাকড়ের মতো ছড়িয়ে পড়বে। আজ অথবা কাল। ধানের মাঠও থাকবে না, জমিও থাকবে না। যাও না আটঘরা তেঘরিয়ার দিকে, ওটা ত তোমার বাপের বাড়ি ছিল, যাও না, চিনতে পার কি না দেখে এসো সরকার ত আর কাউকে ঠেলে দেয়নি, তবে তোমার বাপ-কাকারা জমি বেচে দেশান্তরী হল কেন? এক দেড় হাজার টাকায় বিক্রি—আর এখন জমির দাম কত জানো, এক দেড় লাখ। টাকা যতই দাও, জমি ত আর বাড়ে না। সব বাড়ে, শুধু জমি বাড়ে না।
ভাদুর কথাবার্তা পুস্পবতীর খুবই মনে ধরে। ভাদু বলেই চলে, আজ না হয় কাল তোমাকে জমি ছাড়তেই হবে। চলে যেতে হবে, দূরে আরও দূরে। তবু সরকার ন্যায্য দাম দেবে, বড়ো বড়ো প্রাসাদ, রাস্তা প্রশস্ত, পার্ক ময়দান, এক ময়দানবের যজ্ঞও শুরু হয়ে যাবে—চরণবাবাজিরও যজ্ঞ হয়, চরণবাবাজির যজ্ঞ হলে কেষ্টপুর হয়, একবাড়ির পেচ্ছাব আর এক বাড়িতে পড়ে, আর ময়দানবের যজ্ঞে যার যার পেচ্ছাব তার তার বাড়িতে। তারপর পাতালে ঢুকে যায়। বোঝো তার কাণ্ডকারখানা? শহরের মানুষজন ঘরবাড়ি ঠেলেঠুলে এই এলাকায় ঢুকে যাবেই—কেউ আটকাতে পারবে না। কাকাকে সেটাই বোঝাতে পারে না, দিতে হয় জমিটা ময়দানবের হাতেই তুলে দাও। চরণবাবাজিকে দিয়ে তেঘরিয়া কেষ্টপুর জ্যাংরা বাগুইহাটি করে দিও না।
পুষ্পবতীর মনে হয় খুবই ন্যায্য কথা, ভাদু কিছুটা খ্যাপা গোছের মানুষ, তবু তার কথায় যেন কোথায় একটা সূত্র খুঁজে পায়। বাপ-কাকারা কেন, সেও তেঘরিয়ার গেলে ধরতেই পারবে না, বসতবাড়ি, দুটো জামরুলের গাছ, কিছু কলাগাছ, লাউয়ের মাচান কোথায় হারিয়ে গেছে। বাপ-কাকারা বসিরহাটের দিকে মদনপুরে উঠে গেছে। সস্তায় জমি ঘরবাড়ি সব হয়েছে, দাদারা ট্রাক চালায়, তারাও দূরে আরও দূরে হয়তো একদিন চলে যাবে। পুষ্পবতীর চোখে জল চলে আসে।
ভাদু কখন উঠে চলে গেছে তাও টের পায়নি।
চৈত্রমাস, গরমে গা জ্বলে যাচ্ছে। তপ্তখোলার মতো এই টালির ঘরে পুষ্পবতী তবু কী যে আরাম পায়–সে দেখল সদরের ওপারে বাঁশবাগানে সূর্য অস্ত যাচ্ছে, ছায়া নেমে এসেছে ঘরবাড়িতে। মানুষটার তবু ফেরার নাম নেই।
সে ডাকল, অনু, অনু রে।
অনু ভেজা একখানা গামছা জড়িয়ে গা ধুয়ে এসেছে-এই অবেলায় যখন তখন কলপাড়ে গিয়ে বসে থাকে—পাইপে জল ওঠে না, জল সেই পাতালে এখনও মনে হয় মাঝে মাঝে। সেটুকু ওঠে, তাই দিয়ে তপ্তশরীর ঠান্ডা করতে হয়—জং ধরা পাইপ, কার কখানা বাতিল পাইপ নিয়ে এসে সেই করে টিউকলটি করেছে, তারপর থেকে বলা চলে নিজের টিউকল, তা ঘোলা জল উঠলেও নিজের টিউকল, খাবার জল দু-বালতি বদন মুদির বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে হয়—এখন মেলা কাজ, বাসন সব কলপাড়েই পরে আছে। কাক শালিখের উপদ্রবও নেই, এঁটো কাটা কিছু আর না থাকলে কাক শালিখ উড়বে কেন, ঘর ঝাঁট দিতে হয়। অনুটা যে আবার কোথায় গেল।
এই অনু, অনু বাসন কটা, ধুয়ে রাখ।
পারব না।
সব কথায় এক রা। না, পারব না। কী করছিস! তারে জামাকাপড় মেলা, তুলে রাখ।
সাড়া নেই।
পুষ্পবতী ঘরের ভিতর উঁকি দিয়ে দেখল মেয়ে তার ভাঙা আর্শিতে প্রসাধনে ব্যস্ত। সব যেতে বসেছে, কোনও যদি হয় আপশোস থাকে। মেয়ে এখন নিজের মর্জিমতো চলে। বাবাকেও ডরায় না।
এই অনু তোর কি মায়াদয়া নাই! মানুষটা কোন সকালে কিছু মুখে না দিয়ে বের হয়ে গেল, একবার খোঁজখবর নিবি না! হেমাঙ্গর সঙ্গে যদি দেখা হয়, কলের কাজ করতে যদি চলে যায়, হেমাঙ্গ জানতেই পারে। হেমাঙ্গ ওস্তাদ মিস্ত্রি, কলের কাজ থাকলে হেমাঙ্গর পরামর্শ ছাড়া করে না–তুই যা, যদি হেমাঙ্গ ফিরে আসে।
