ভাদুই ঠিক বলেছে, গেরাপি হলগে কাকি, বাবুদের গ্যারাকল। সব হেঁজিপোজি তাড়িয়ে দাও, প্রশস্ত রাস্তা বানাও, অট্টালিকা বানাও, আমরা বাবুরা গিয়ে নিশ্চিন্তে বসবাস করি। গাড়ি ঘোড়া চড়ি। হাওয়া খাই।
আমরা যাব কোথায়!
সে ত বাবুদের জানার কথা নয়। বাবুরা মেলা টাকা দেবে, তাই নিয়ে যাব। একসঙ্গে এত টাকা জীবনে দেখেছে! বলো কাকি, এত মাথা গরম হলে চলে। যাও, জায়গার ত অভাব নেই, বাবুদের যখন পছন্দ, টাকাও মেলা, যেতে এত আপত্তি কীসের বুঝি না কাকি।
কিন্তু কাকা তোমার কিছুতেই মাথা পাতছে না, কোথায় যে সকালে বের হয়ে গেল, বেলা পড়ে আসছে, ফেরার নাম নেই, তোমাকে কি কিছু বলে গেছে।
আমাকে? তুমি জানো না, বাক্যালাপ বন্ধ। আমাকে শাসিয়েছে, ভাদু সাবধান, কেউটের গর্তে হাত ঢোকাবি না।
অমা! সে কবে! তোমার কাকার মাথা ঠিক নেই। কিছু মনে কোরো না।
ওই ত সেদিন, কাকা আমাকে হলের সামনে তোড়পাল। অনু ফুচকা খাচ্ছিল, দমাদম সাঁচাচ্ছিল—পারমিশান থাকলে যা হয়, আর কাকি তুমি ত জানো, কেউ খেতে চাইলে আমি বারণ করি না। অনু যখন ফুচকা খায় কী যে সমুধুর দৃশ্য কাকি! নুয়ে যাচ্ছে, কনুই তুলে ওড়না সামলাচ্ছে, শালপাতার ঠোঙা ঠোঁটের কাছে, ফতুর হয়ে যেতেও রাজি, আমি কিছুতেই অনুকে বলতে পারি না, এই আর খাস। তোর বাপ রাস্তার দাঁড়িয়ে আমাকে তড়পাচ্ছে। আচ্ছা আমার কী দোষ বলো।
যখন পছন্দ করে না।
আমি পছন্দ করার কে? পছন্দ যার, তাকে তোমার জিগাও, সে একদণ্ড আমাকে না দেখলে পাগল হয়ে যায়—তারপরই থেমে জিভ কেটে বলল, ছিছি তোমাক এ-সব কথা বলা আমার উচিত হয়নি। এই অনু, অনু আছিস। যা বদনের দোকানে, এক ঠোঙা মুড়ি আন, কাকি তেলমুড়ি মেখে দাও, তোমরাও খাও, আমিও খাই। কাকার আজ মনে হয় ফিরতে রাত হবে।
আমার খেতে ইচ্ছে করছে না ভাদু। তোমার কাকা সেই কখন কিছু মুখে না দিয়ে বের হয়ে গেল? এখনও ফেরার নাম নেই।
তখনই অন ঘর থেকে বের হয়ে এল। ফ্রক গায়ে, গামছা জড়ানো শরীরে। কারণ উঁচ স্তন খুবই তার পরিপুষ্ট, বাডে দিনে দিনে। এ-বছরের ফ্রক ও বছরে। টাইট হয়ে যায়। একজন ছাঁচড়া মানুষের সে কন্যা, চাইলেই দেবে কোত্থেকে। ফলে গামছাখানা সম্বল। গামছাখানা গায়ে জড়ানো, শরীর ঢাকা থাকে, অথবা বলা যায় আব্রু–সে বের হলেই এক লাফে উঠোন তারপর বলল, টাকা দাও। আমি নিয়ে আসছি—মা না খেলে, আমরা খাব না হবে কেন। আমার খিদে পেয়েছে।
ভাদু বলল, খিদের আর দোষ কি? উঠতি বয়সে খিদে বেশিই থাকে। তোর বাবা মোটেই বোঝে না। বলে ভাদু একটা পাঁচটাকার নোট বের করে দিতেই খপ করে ধরে ফেলল অনু। কী সুঠাম শরীর। যেন অঙ্গ তার সোনার হরিণ। পায়ের গোড়ালি থেকে জানু পর্যন্ত মসৃণ এবং পাকা বেলের মতো রং। আর জানুর ঊর্ধ্বে কী থাকে–ভাদু ভালোই টের পায়। উঠতি বয়েস যে পরমান্ন। খেতে ভারি সুস্বাদু। মেয়েটার দৌড়ে লাফিয়ে চলে যাওয়ার মধ্যে থাকে এক যেন অনন্তের ইশারা সামনে জলাজমি তারপর সড়ক এবং সড়কের পাশের ঘরবাড়ি পার হয়ে বদনের দোকান, সেখান থেকে এক ঠোঙা মুড়ি।
ভাদু বলল, দ্যাখো কাকি, মেয়েটার দিকে তাকিয়েও তোমাদের ভাবা উচিত। দালাল ঘুরছে, বল ত, আমি কথা বলিয়ে দিতে পারি, বেশিই দাম পাবে। একশো কুড়ি ফুটের রাস্তা ভাবা যায়, তার পাশে জমি। গেরাপি শুরু হলে জমির দর হুহু করে বাড়বে। পাকা মাথার বাবুরা লপ্তে লপ্তে জমি কিনে রাখছে, সরকারকে দাও, ওদের দিতে আপত্তি কোথায়! দ্বিগুণ দাম দেবে—দশ কাঠায় কত টাকা হয় সহজেই বুঝে নিতে পার। না বুঝলে কন্যেতির কাছে বুঝে নিতে পার। অঙ্কে চৌকুস তোমার কন্যা, না হলে ভাদুকা বলতেই অজ্ঞান হয় কেন বোঝে না।
পুষ্পবতী সেই যে বাঁশে ঠায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মানুষটার ফেরার অপেক্ষায় রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে, তা থেকে তার একবিন্দু নড়চড় হচ্ছে না। কেমন উদাস গলায় তবু না বলে পারল না, জমি ত সরকারের, ওরা নিয়ে কী করবে! জমি বেহাত হলে সরকার ছাড়বে কেন?
আরে সেটা তোমার ভাবার কথা না। পাকা মাথার লোক তারা, সবরকমের অঙ্ক জানে, তারা ঠিক করলে সরকারের জমি কলমের এক খোঁচায় বেসরকারি হয়ে যাবে। বোঝলা না সরকার হল জনগণের। তোমরাও জনগণ। পাকা মাথার লোকেরাও জনগণ। জনগণ চাইলে সরকারের সাধ্য কী মাথা না পাতে?
পুষ্পবতীর মাথায় কিছুই ঢোকে না। ডবল দাম পাওয়া যাবে। সোজা কথা।
ভাদু বিকাল হলেই চষা মাঠ পার হয়ে যায়, তারপর গাঁয়ের উপর দিয়ে হাঁটে। রাস্তার হাঁটে, বাড়ি বাড়ি হাঁটে, হাঁটে আর হাঁটে। মুখে চোং–চাই হাড় মুড়মুড়ি ভাজা। আর ঘুংগরো ছ্যাঁচরায়—যে যেখানে থাকে, কোঠাবাড়ি, বাগানবাড়ি, কিংবা চাষবাসের মানুষজন, তাদের কাচ্চাবাচ্চা সব মিলে ভিড় করলে ভাদুর বিক্রি বাড়ে। পুষ্পবতীর মনে হয় ভাদু মানুষের রহস্য টের পায়। অন্ধকার রাস্তায় দু পাশের ঘরবাড়ি ফেলে সে হাঁটে–তার কাছে মোড়া কুপির আলো থেকে শিস উঠে। তার পায়ে ঘুংগরো বাজে। আর মাঝে মাঝে চোং মুখে হাঁক ডাক—চাই হাড়মুড়মুড়ি সাড়ে চোদ্দ ভাজা। খেলেও মজা, না খেলেও মজা।
সে তারুলিয়া আটঘরা নবাবপুরেও যায়। সে অন্ধকার রাতে মাঠ ভাঙে। দূর থেকে সচল একটা আলো দেখলেই অনু টের পায় ভাদু ফিরছে। উঠোনে দাঁড়িয়ে পুষ্পবতীও দেখেছে, অনেক দূরে, যখন রাত নিশুতি হয়ে যায়—ভাদু মাঠ ভেঙে বাড়ি ফেরে। এই ফেরার মধ্যে ভাদুর নানা মজা থাকতেই পারে। সে শহরেও যায়। মানুষজনের সঙ্গে তার আলাপ পরিচয়ের শেষ নেই—দামালেরা শকুনের মতো উড়ছে চারপাশে–ভাদু খবর পেতেই পারে। ডবল দামে বিক্রি করতে পারলে–যে করে হোক কোথাও গিয়ে তিনটে পেট চলে যাবে। আর তিনটা পেটই বা ভাবে কেন, মেয়ে সোমত্ত হয়ে গেছে, আজ আছে, কাল নেই, বলতে গেলে দুটো প্রাণীর জমি ঘরবাড়ি বেচা টাকায় হেসে খেলে চলে যাবে।
