কী বাঁশ চাই? পলতা বাঁশ, না মুলি বাঁশ, পলতা বাঁশের জঙ্গল শেখরপুরের দিকে মেলা, রাস্তার দুপাশে তাকালেই বোঝা, যার, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ঘরবাড়ি, পাকা ইমারত থেকে বাবুদের বাগানবাড়ি সবই আছে। আবার মাঠ কিংবা চাষের জমি পার হয়ে উরাট জমিতে আছে বাঁশের জঙ্গল। গভীর জঙ্গলে ঢুকে গেলে বিঘের পর বিঘে শুধু বাঁশঝাড়।
পাতলা বাঁশের দর কী যাচ্ছে? বাসুই মশাই পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে কপালের ঘাম মুচতে মুছতে প্রশ্ন না করে পারে না।
দর কী যাচ্ছে আপনি জানেন না হারমোহনদা? আসলে পাইকার মানুষ। ভি আই পি, রাস্তাখানাও ভি আই পি, দু-পাশের ধানের মাঠ শেষ, প্রলয়ঙ্করী সব কাণ্ড। আকাশ সমান উঁচু সব পেল্লাই হাউজিং–আপনার এতদিনের কারবার, সব জানেন, সব বোঝেন বাকড়োবা, মাছিডাঙা, পাথরকাটায় বাঁশঝাড় সাফ হয়ে গেছে বলে আতান্তরে পড়ে গেছেন—পঞ্চাশটা টাক হবে?
কেন, পঞ্চাশ কেন?
দিন, দেখি, বাজিয়ে দেখা যাবে না, তবে শুনে দেখলে বলতে পারি, কোনদিকে গেলে আপনার কারবারে ঘূণ ধরবে না। আমার পায়সাও হবে, আপনার কারবারও হবে। তবে বলতে পারি ঠকবেন না। টাকাটা আপনার বাঁশ বাগানখানা দেখলেই উসুল হয়ে যাবে।
পঞ্চাশ কী গাছে হয়?
আজ্ঞে না। গাছে হয় না জলেও হয় না, তবে হয়, না হলে আপনিই বা হন্যে হয়ে বাঁশের খোঁজে বের হয়ে পড়েছেন কেন, আর আমি ল্যানছুইরাই বা হাত পেতে চাইব কেন? হয় বলেই চেয়েছি। এটা আমার হকের টাকা।
নাও। বলে হরমোহন দশটা টাকা জ্যাব থেকে টিপে টিপে বের করে দিয়েছিল।
আগাম থাকল।
আমি কিছু জানি না, বাঁশের খবর কিছুই জানা নেই। বিপ্রদাস চোখ উল্টে দিল।
এই যে বললে,বাকড়োবা না কোথায়?
আজ্ঞে ওটা দশ টাকায় হয় না। পঞ্চাশ না হলে কোথায় বলা যাবে না।
লোকটা যে বড়ই ত্যাঁদর, কী করা! কুড়ি টাকা রাখ।
আজ্ঞে না। কুড়ি টাকায় দেড় কেজি চাল হয় না। তিনটে প্রাণীর কী করে চলে বলুন!
বাঁশ না হলে ভারা হয় না, দালান কোঠা হয় না, এক বাঁশ সাপ্লাই করে হাতিয়াড়ার মোড়ে দুখানা পেল্লাই বাড়ি। কুনজুস, ভটভটি চড়ে না, সাইকেলে মাঝেসাঝে বের হয়, যখন আকাল বাঁশের, কাজের লোক হারামি, ঠিক খবরাখবর পাওয়া যায় না, তখনই নিজে বের হয়ে পড়া। চিনতে বাকি নেই। বিপ্রদাস মনে মনে কথাগুলি আওড়াল।
ঠিক আছে,তোমার কথাও থাক,আমার কথাও থাক। ধরো আর দশ খুশি মনে নিয়ে যাও। এটা ত তোমার ফাউ টাকা। ঘোরাঘুরি করলে খবর পাব না হয়।
তা পাবেন। দেখছেন কেমন লু বইছে—গরম বাতাস। রোদে ঘুরে সর্দিগর্মি হলে সব রসাতলে। ফাউ টাকার ভাও তখন ভাসানে। বউঠানের কথাখান ভাবনে— একলা ফেলে চলে গেলে হুজ্জোতির শেষ থাকবে না।
হরমোহন কেমন কাতর হয়ে পড়ে। রোদে মাথার চাঁদিফাটছে। বড়ো জলতেষ্টা বোধহচ্ছিল। সর্দিগর্মি মারাত্মক ব্যামো। ঠাস করে পড়ল ত, মরল।
হরমোহন বলল, তা হলে পঞ্চাশই নাও। তবে সবটাই গচ্চা। কীযে দিনকাল শুরু হয়ে গেল। তারপর ঢোক গিলে বলল, অর্থই যত অনর্থের মূল, এই যে গেরাপি না কী হচ্ছে, সবটাই পচা টাকার খেলা—এটা বোঝ?
বিপ্রদাস জবাবে বলেছিল, সেই পচা টাকায় এক ধুন্দুমার কাণ্ড শুরু হয়ে যাবে। ঘরবাড়ি রাস্তা বেবাক লাল হয়ে যাবে। মানুষ-জন, ঘরবাড়ি জমি বাঁশবাগান গচ্চা দিয়ে হাওয়া খেয়ে বেড়াবে। বেশি কথা বললে বেস্মতালু জ্বলে,আপনে যান—কীসে কী কাণ্ড হবে বোঝা মুশকিল।
বিপ্রদাসের সেই থেকে বেহ্মতালু জ্বলছে। সে ঘরে বসে থাকতে পারে না। কারও সঙ্গে দেখা হলেই এক কথা—যাও, সময় থাকতে চলে যাও বিপ্রদাস। জমি ভেস্টেড হয়ে যাবে শেষে—বেলাবেলিতে রওনা না হলে নদী পার হতে পারবে না, জলে ডুবে মরবে।
ভাদু আর এক কাঠি উপরে। ব্যাটা সারাদিন মাদুরে পড়ে থাকে, বিধবা জননী তার বালিতে ডাল ভাজে, মাষকলাই ভাজে, লঙ্কা জিরে ভাজে, আর সারাদিন বসে বসে ডালমুট বানায়, ব্যাটা ভাদু বিকেলে সেই নিয়ে তার কারবারে বের হয়। পোশাকেরও কম বাহার থাকে না। ভূসোকালির রং জোবৰায়। আপাদমস্তক জোব্বায় শরীর ঢাকা, মাথায় লালরঙের ফেটি, কোকড়ানো চুলেদস্যি চেহারা, বাবুদের বাগানের কোনাখামচিতে ঝুপড়ি বানিয়ে থাকে। দায় নেই অদায়ও নেই, কেবল সে সুযোগ পেলে তার বাড়িতে এসে বসে থাকে। আর জপায়, বোঝলা কাকি, মারকাটারি বই চলছে। দেখায় বাসনা থাকলে বলবে, টিকিট কেটে আনব। অনু ত এক খ্যাপ মেরে এসেছে। আর এক খ্যাপ দেবারও বাসনা।
তারপরই যত ফস্টিনস্টি, এই অনু এক গেলাস জল দে।
এই অনু, চা বানা। পয়সা রাখ। বদলকে বলগে, ভাদু বসে আছে। যা লাগে নিয়ে আয়।
শুয়োরের বাচ্চা। তুই ভাবিস বিপ্রদাস কিছু বোঝে না। অনু কার সঙ্গে খ্যাপ মারে ব্যাটা। তুই উসকে দিয়ে নিয়ে যাস, হলের ঘূপচিতে ব্যাটা কামড়াকামড়ি তোর। শেষ হয়ে যাবি বলে দিলাম। আমার দশটা না পাঁচটা, একটা মেয়ে, তারে তুই গস্ত করতে চাস। তোর আছেটা কী! বাবুদের বাগান পাহারা দিস, লপ্তমত বাগানে থাকিস খাস, আজ এক ডালে বসে আছিস, উড়িয়ে দিলে কাল আর এক ডালে। তোর আছেটা কী। পায়ে ঘুংগরো পরে সং সেজে ডালমুটের নাম কাচ্চা বাচ্চার মতো পরমাসুন্দরীকে নিয়ে খাবলাখালি!
২.
পুষ্পবর্তীও জানে, তার মানুষটার দু-পাশে দুই পরমশত্রু গজিয়ে গেছে। এক রোপি, আর এক ঘুংগুর কথা জানতে চাইলেই মানুষটা খেকিয়ে ওঠে।
