সেই খবর দেয় সব। কাগজের খবরও দেয়। বিপ্রদাস সব জেনেও চুপচাপ থাকে। পুষ্পবতী কিছু বললে পাত্তাই দেয় না।
তবু যখন পারে না, অনু পড়ছে দুলে দুলে, বারান্দায় মাদুর পেতে দুলে দুলে পড়ছে। ওর চুল ওড়ে, বাতাসে ফ্রক ওড়ে–ভাদুদা এক প্যাকেট হাড়মুড়মুড়ি বারোভাজা দিয়ে গেছে বড়ো তাজা এবং সুস্বাদু খেতে, খড় খড় করে খাচ্ছে তার মাধ্যমিকের অঙ্কের বইটা কোলে, সে খাতা পেনসিল নিয়ে বসে থাকলে পুষ্পবতী স্বপ্ন দেখতেই পারে।
হ্যাঁগা, ভাদু কী সব বলে গেল শুনছ।
বিপ্রদাস খাট থেকে লাফিয়ে উঠল, কী ভ্যাজর ভ্যাজর করছ।
আরে শুনলে না, কথাটা কী ঠিক?
রাখো ত, গরমেন্টের বাপের জমি, ও কত উড়ো কথা ভাসে।
উড়ো কথা বলছ। কাগজে বড়ো বড়ো খবর বের হয়েছে।
ও বের হয়। আবার উবেও যায়। ধাদধারা গোবিন্দপুর— এখানটায় হবে গেঁরাপিঁ।
সরকারের খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই।
গেঁরাপিঁ কী বস্তু জান তুমি?
বিপ্রদাস লুঙ্গি কোমরে খিচে বারান্দায় বের হয়ে এসেছিল— তারপর জলচোকিতে বসে বলেছিল, চা হবে একটু।
চিনি আনতে হবে।
এই অনু, দ্যাখ না বদনের দোকানে, দুধ চিনি খাতায় লিখে নিয়ে আয়। মুখ। করতে পারে, বলবি শেখরপুরের
তার আগেই ঝামটা।
আমি পারব না।
তোরা কিছুই পারিস না। দুশো গ্রাম চিনিও ধারে আনতে পারিস না। তারপর পুষ্পবতীর দিকে তাকিয়েছিল—সরু কোমর, পিঠের ভাঁজ থেকে নিতম্বের কাছাকাছি চলে গেছে শরীরের কানামাছি। আরও নীচে হাত দিলে ভয়ংকর করাল গ্রাস–এই গ্রাসই তাকে এতকাল যে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, সে তাও বোঝে। জমি, মেয়েমানুষ ছাড়া হয় না। সংসারে তার কথার দাম নেই।
তারপরই ভাবল, অনু তুই বড়ো হয়েছিস, সংসারের অভাব অনটন বুঝবি না! ভাদু আসে যায়, ব্যাটা ইজারা নিয়েছে, বাস্তুজমি, চাষের জমি সব যাবে। চারপাশে কোপের রাজত্ব। সরকারের কোপ আরও প্রখর। গায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়, তার উপর পুস্পবতীর গেরাপি। গেরাপি কী বস্তু তার ব্যাখ্যা না পেলে সে যেন অনশনে বসে যাবে।
আসলে শেখরপুরের কাজটার কথা সে বলতে চেয়েছিল— ধান্দায় ঘুরে বেড়ায়, যখন সে কাজ, দু-হাজার ইট ফেলে দাও বিপ্রদাস, বিপ্রদাস ইটের ভাটায় গিয়ে বলবে–দু-হাজার ইট ফেলে দাও, সে শুধু অর্ডার দিয়েই খালাস ভাটার কারবারি কমিশনে পঞ্চাশ একশো ধরিয়ে দেয়, এটাই তার পারিশ্রমিক। এই যেমন সে প্লাম্বারের ঠিকে মিস্ত্রিরও কাজ করে। শেখরপুরের মোহনবাবুর কাজটা সে পেতে পারে সে ঘুরেও এসেছে। জল উঠছে না।
হাতুড়িতে সে পাইপে ঘা মারে, এটা খোলে, ওটা খোলে, তারপর নিদান দেয় পাম্প খারাপ, নতুন পাম্প লাগাতে হয়। আসলে সব কাজেই সে হাফ মিস্ত্রি।
আসলে পাম্প গস্ত করার মতলবে। মোহনবাবু নতুন পাম্প কিনলে পুরোনো পাম্প বাতিল, তা বিপ্রদাস, ফেলে রেখে কী হবে, তুমি নিয়ে যাও। দামদর করে বিক্রি করে দাও। আমি আবার লোক কোথায় খুঁজব। কাজটা করতে পারলে চার-পাঁচশো টাকাও হয়ে যেতে পারে। টাকা ত আর ওড়ে না, খুটে খুটে তুলতে হয়। পাম্পের টাকা গস্ত করতে পারলে বদনের দেনা একদিনে শোধ। এরা কী সে বোঝে। সোজা কথার গেরাপি হল গে ঘুঘু চরবে উঠোনে।
বাস্তু জমি শালি জমি কিছুই বাদ যাবে না। দৌড়ালে রাস্তার কুকুরে কামড়াবে, গাছের ছায়ায় বসে থাকলে মাথায় হাগবে।
পুস্পবতীকে এমন কঠিন কথা বলে কী করে। সোহাগি মেয়েছেলে বুঝে ফেললে বিলাপ শুরু করে দিতে পারে। তবে কথাখানা যে উড়ে বেড়ায়, দশকান হয়ে এই টালির ঘরটাতেও চাউর হয়ে যায়। অনু বাসে যায় আসে। সেও শোনে সব। সেও পুস্পবতীকে এসে সব যে বলে তাও নয়। তবে বিপ্রদাস নিজে মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে। তার মাথায় কাগে বসে হেগে যাবে, সে কিছুতেই রাজি না।
তার এক কথা, আমার জমি আমি বুঝব। জমি দখল করতে আসুক না, ঠ্যাং ভেঙে দেব।
সে শুনতে পায়, বিপ্রদাস, সবাই যাচ্ছে, তুমিও চলে যাও। সরকার দোকান খুলে বসে গেছে, দলিল দস্তাবেজ, অর্থাৎ যা আছে তোমার গুপ্তখাতা, যার নজির দেখিয়ে তোমার এই রোয়াবি, না গেলে শেষে পস্তাবে।
সে একবার তেড়েও গিয়েছিল, কী বললে, আবার কথাখান বল, বলে দ্যাখ, মুণ্ড ছিঁড়ে ফেলব। গাছপালা সব আমার ভগমান হয়ে আছে জানো। বাপ-ঠাকুরদা লাগিয়ে গেছে, দিনমান একটা ল্যাংড়া কুকুরের মতো এখানে সেখানে ছুটি, গন্ধ শুঁকে বেড়াই, বাঁশের পাইকার, ইটের ভাটা, ভেড়ির মাছ, সব খবরাবর রাখার কাজ।
বাঁশের জঙ্গলের খোঁজ দিতে পারো বিপ্রদাস?
তা খবর আছে।
কথা বলিয়ে দাও।
কত করে।
দশ হাজার টাকা।
হবে। আমার কী থাকবে?
তোমার কী থাকবে মানে?
তহরি আছে না, খবর দেব, আর বাঁশ বোঝাই গাড়ি যাবে, আমি কী কলা চুষব!
কার বাঁশ, কোন জঙ্গলের বাঁশ, কাঁচা না পাকা ঘুনি, যাত্রাগাছির সব বাঁশ সাফ। আটঘরায় শরিকের এত বড়ো বাঁশের জঙ্গল, সেও শেষ। রাতকানা হয়ে ঘুরছি বিপ্রদাস। পাকা বাঁশের খোঁজ পাচ্ছি না।
পাকা বাঁশের অভাব, কী যে বলেন!
এক পা সাইকেলে, আর এক পা রাস্তায়—
যা হোক করে বাঁশের পাইকার একখানা পাকড়ানো গেছে। পাকা বাঁশের খোঁজে আছে। জমি জলের দরে বিক্রি, যে যা দর পাচ্ছে তাতেই খালি করে দিচ্ছে– বেহাত হয়ে গেলে ছালাও যাবে, আমও যাবে।
সারাদিন তার টো টো করে ঘুরে বেড়ানো। কোথায় না যায়—যাত্রাগাছি, কদমপুকুরেও যায়, আরও দুরে আছে শুলংগুড়ি। বর্ডার পার হয়ে শুধু চলে আসছে মানুষজন। যাত্রাগাছি শুলংগুড়িতে ঠাঁই নিচ্ছে। প্রথমে বাঁশ পাতা কাঠ যা পাওয়া যায়, তাই দিয়ে ঝুপড়ি বানিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজে। কেউ কলের মিস্ত্রি, কেউ জোগাড়ের কাজ করে পয়সা কামাবার ধান্দা। অবশ্য তারুলিয়া, আটঘরা, বেকজোয়ানিতে অনুপ্রবেশ নেই বললেই হয়। গাঁয়ের মানুষজন তার খুবই চেনাজানা, সে যে বিপ্রদাস, সে যে এলাকার খোঁজখবর কেটু বেশি মাত্রাতেই রাখে তারা ভালোই জানে। শুলংগুড়ি, যাত্রাগাছির ঝুপড়ির পাশ দিয়ে হাঁটলে কেউ তাকে যে চেনে না, সেও কাউকে চেনে না—দেশকালের যখন এই অবস্থা, তখন সে বাঁশের পাইকার হরমোহন সুইকে কিছুতেই হাতছাড়া করতে রাজি নয়।
