পুষ্পবতী
সে চুপচাপ বসে থাকে। তার কিছু ভালো লাগে না।
চৈত্র মাস। জল নেই। সেই কবে শীতে বৃষ্টিপাত, তারপর আর মেঘের দেখা নেই। আকাশ তামার বাসনের মতো চকচকে হয়ে আছে। দিন যায়, মাস যায়, আকাশ আর ঘোলা হয়ে উঠে না। মাঠ খা খা করছে, কিছু শকুন উড়ছিল। দূরে সব বাঁশের জঙ্গল, নিশীথে কোথাও থেকে বিশ্রী শব্দ ওঠে। কে যেন হেঁকে যায়, তোমার সব যাবে হে বিপ্রদাস, তুমি অবেলাতেই রওনা হয়ে যাও, আশায় আশায় আর বসে থেকো না।
আসলে তার কী মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে!
দু-দিকের সব মাঠ ফেলে পাকা রাস্তাটা চলে গেছে কতদূর। বাস যায়, সাইকেল যায়, আর বাঁশ বোঝাই হয়ে যায় গোরুর গাড়ি। মানুষজন মানে ওঠে। রাস্তায় পাশে কোথাও টালির কারখানা আবার দূরে গেলে মাছের ভেড়ি আরও দুরে গেলে ইটের ভাটা। ভাটাগুলির পাশ দিয়ে পাকা রাস্তায় মেলা ডালপালা বের হয়ে গেছে। কোনওটা হাসনাবাদ যায়, কোনওটা বারাসতের দিকে—আবার বসিরহাটের রাস্তাও তার চেনা। কিংবা সাইকেলে কিছুটা গেলেই হাসনাবাদ যাবার রেলে উঠে পড়া যায়।
এইসব রাস্তায় বিপ্রদাসকে যাওয়া-আসা করতেই হয়। বাধা মাইনের কাজ নেই। রাস্তার মোড়ে দোকান নেই। চা কিংবা মুদিখানার যে কোনও দোকান থাকলেও সে বসে বসে তার রুজি রোজগারের ধান্দা বের করতে পারত। আসলে একটা ছ্যাঁচড়া জীবন তার। সে ঠেক খেটে খায়। কখনও মাছের ভেড়িতে কখনও বাঁশের জঙ্গলে, অথবা ইটের গাড়িতে উঠে তেঘরিয়া, বাগুইহাটি, জ্যাংড়া। এমনকি মহিষবাথানের দিকেও সে যায়। চুন সুরকি বালি সুযোগ পেলেই ফেলে দিয়ে আসে। আর আছে তার কাঠা দুইয়ের মতো জমি সম্বল। সেচ পেলে ধান হয়, সবজি হয়, ফুল হয়, না পেলে উরাট থাকে।
পুষ্পবতী বারান্দার খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই মানুষটা কোন সকালে বের হয়েছে, ফেরার নাম নেই।
ঘুরে আসছি বলে বের হল।
কিন্তু ফিরছে না।
সকাল গেল। দুপুর গেল ফিরে এল না! কোথায় গেল মানুষটা! বলেও গেল না, তবে এমন যে হয় না, কতবারই দেখেছে, অনেক রাত হয়ে গেছে ফিরতে। তবে কেউ না কেউ খবর দিয়ে গেছে, কাকা হাসনাবাদের রেলে উঠে গেল, খবরটা দিতে বলল। চিন্তা করবে না কাকি। রাত হবে ফিরতে। কেউ না কেউ দেরি হলে খবর দিয়ে যায়।
বিকেল হয়ে গেল, ফিরছে না। কেউ কোনও খবরও দিয়ে যায়নি।
কত কাজ, অনুর স্কুল থেকে ফেরারও সময় হয়ে গেছে। বাসে যায়, বাসে ফেরে। সারাদিন একা একা, দুপুরে খেতে বসে কিছুটা খেয়ে জল ঢেলে দিয়েছে পাতে। কলতলায় বাসন পড়ে আছে—সামনে যতটুকু চোখ যায় উরাট মাঠ। মাঠে ফুলের চাষ হয়। সেচের জল পাওয়া যায়নি, গাছগুলো বড়ো হয়েছে, তবে ফুল ফোটেনি—চাষি মানুষদের সম্বল এই জমি, জমির চাষ থাকলে চাষি মানুষ কখনও একা হয়ে যায় না।
সেই চাষই নেই।
জমিও থাকবে না, কারণ সরকার সেই কবে নোটিস দিয়েছে।
সেই লোকটা কী যেন নাম, তাকে দেখলেই মানুষটা তার খেপে যায়। লোকটাকে দেখলে মানুষটা তার কেবল থুতু ফেলে।
থু থু। লোকটা নেমকহারাম, পঞ্চায়েতের বাবু, প্রভাবশালী মানুষ, কখনও একা হাঁটে না। দু-চারজন সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে হাঁটে। পাজামা-পাঞ্জাবি গায়ে, ভোটের বাবুও হয়ে যায় মাঝে মাঝে। এবং এলাকার ঘরবাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই যেমন কিছু ঝোপজঙ্গল— একটা টালির বাড়ি। এই যেমন কিছু বাঁশ ঝাড় পার হয়ে দুটো কাছারি ঘর। মুরগির ওড়াউড়িও আছে— দাওয়ায় বসে থাকে কোনও অথর্ব মানুষ। লাঠি ভর দিয়ে, হাঁটে কখনও। হালের বলদ গোয়ালে বাঁধা, জোয়াল তোলা যায়নি। চাব না থাকলে হালের বলদেরও কাম থাকে না–অথবা মানুষটি পাকা রাস্তায় লাঠি ভর করে চলে যায়। তারপর জমিতে নেমে যায়, থাবড়া মেরে ধুলো ওড়ায় জমির। এটা যে খেপামি পুষ্পবতী ভালোই জানে। কারণ, এভাবে জঙ্গলে কিংবা ফলের বাগান পার হয়ে যত ঘরবাড়ি সবারই ত্রাস জমি যাবে, জমি থাকবে না। সরকার নোটিস ঝুলিয়ে যাচ্ছে। পুষ্পবতী অবশ্য চুপচাপ থাকে, কারণ সে দেখেছে, মানুষটা কোনও কথা বললেই বিরক্ত হয়।
কিন্তু কথা ত বাতাসে ভাসে।
এই যেমন ভাদু বলে গেল, তুমি কি গ কাকি তুমি জান না-রেজিস্ট্রি বন্ধ, জমি হাত ফেরতা করতে দেবে না। সরকার যে এখানে একটা পেল্লাই শহর বানাবে। তুমি কিছু জান না।
বিপ্রদাস একদিন বাড়ি থেকেই বের হল না। অবেলায় ঘাটে শুয়েছিল। ভাদু। উঠোনে দাঁড়িয়ে যেন সতর্ক করে দিয়ে গেল কাকিকে—সময় ভালো না, গবরমেন্টের শহর— সব মানুষ উৎখাত হবে। গেরাপি হবে এখানটায়। একশো কুড়ি ফুট রাস্তা যাবে। ঘরবাড়ি ইমারত দেখবে বাহার ধানের জমি ফুলের জমি বেহাত হয়ে যাবে। চাষি মানুষেরা হায় হায় করবে কপাল থাবড়াবে, তবু গরিবের সরকার গেঁরাপি করবেই। রক্ষা নাই।
সরকার বড়োই ধুরন্ধর। ভাদু তার গামছাখানা মাথার উপর ঘোরাচ্ছে। যেন মশামাছি তাড়াচ্ছে, কিংবা রাতে যখন সব নিশুতি হয়ে থাকে, তখনও সে মাঠের উপর দিয়ে নানা কথা বলতে বলতে, কখনও ঘুমেঙ্গি, নাচেঙ্গি, গায়েজি— যেন এই সব শব্দমালার মধ্যে সে বড়োরকমের সুখ পেয়ে যায়। তার মাথায় থাকে হাড় মুড়মুড়ির টিন, পিঠে ঝুলে থাকে একটা কুপির শিসওঠা আলো। পায়ে তার ঘুংগরো। সে পা হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে হাঁটে ঘুংগরোতে শব্দ হয় ঘুমেঙ্গি ফিরেঙ্গি, গায়েঙ্গি।
