পাখিটাতো পুরুষ পাখিও হতে পারে প্রিয়নাথ।
তুমি হলধর, অতিমাত্রায় একটি গর্দভ বিশেষ। পুরুষ পাখি ডিমে তা দেয় কখনও! স্ত্রী পাখি না হলে, পুলিশের কি দায় ছিল, নো এন্ট্রি ঝুলিয়ে দেবার! অজ্ঞাতে এটা পুরুষের প্রস্তুতি পর্ব-পুলিশ মানুষের সভ্যতার পাহারাদার। সেই প্রথম টের পেয়েছে। তার কোনও দোষ নেই। সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে নারীজাতির ইচ্ছাই সব মেনে নিতে হবে।
সহসা সবাই চুপ হয়ে গেল। প্রিয়নাথের কথাবার্তা শুনে না, তাদের আর কোনও প্রশ্ন ছিল না, নানা কারণেই এই চুপচাপ বসে থাকা সম্ভব। জ্যোৎস্নায় পার্ক পার হয়ে রাস্তায় আলো জ্বলতে দেখল সবাই। এই পার্কটায় জায়গায় জায়গায় কৃত্রিম ঝোপ সৃষ্টি কোনও নগরপালের নির্দেশে কি না তারা তাও জানে না। হাঁটতে হাঁটতে এই পার্কটায় আড্ডা দিতে আসা কোনও অদৃশ্য যৌনতার খোঁজে–এমনও হতে পারে। পাশের বেঞ্চ থেকে নিবারণবাবু উঠে যাবার সময় বললেন, আডড়ার বিষয় কী ছিল, আপনারা সবাই এত চুপচাপ।
আড্ডার কী বিষয় ছিল আজ নিবারণবাবু জানতে চায়। রোজই কোনও না কোনও বিষয় নিয়ে যে আড্ডা শুরু হয়, তবে শেষ পর্যন্ত বিষয় যে এক থাকে না, এও ঠিক তবে আজ বিষয়টা একটু মাত্রাতিরিক্ত ভাবেই নারী বিষয়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রিয়নাথই বলেছিলেন, আজকাল খবরের কাগজে কত সব মজার মজার খবর বের হয়—বিজ্ঞানীরা নাকি বলছে, এই সহস্রাব্দ স্মরণীয় হবে নারীত্বের জয়লাভে। পুরুষের পেশিশক্তি আর কাজে লাগবে না। মস্তিষ্কই সব।
হলধর বলল, আড্ডার বিষয় ওই একরকম গতানুগতিক। প্রিয়নাথের রাস্তায় নো এন্ট্রি ঝোলানো হয়েছে। সেই নিয়েই কথা বলছিলাম। আপনি যাচ্ছেন?
হ্যাঁ যাই। কাজের মেয়েটার যাবার সময় হয়ে গেছে। না গেলে প্যান প্যান করবে। নোটিশও দিয়ে দিতে পারে, অন্যালোক দেখুন বাবু। আমার পোষাবে না। একা মানুষ বুঝতেই পারেন।
আর কেউ কোনও কথা বলছে না বলে, হলধরও বলল, আমরাও উঠব।
নিবারণবাবু চলে গেলে, পতিতপাবন না বলে পারলেন না, রেখেছিস তো রক্ষিতা। একা কোথায়। মাঝবয়সি–মেয়েটা তো তোকেও সামলায়, বাড়িও সামলায়।
এটা আপনার ঈর্ষা পতিতপাবনবাবু। একা বেঁচে থাকা তো সত্যি কষ্ট।
কেন আমাদের প্রিয়নাথ আছে না! তার ছেলে মেয়ে, নাতি নাতনি ভরা সংসার।
প্রিয়নাথ বললেন, আছি। ওই আর কি! আমরাও এবারে উঠি। রাত হয়েছে। আজকাল একটু দেরি হলেই বাড়িতে চিন্তা শুরু হয়। অথচ আমার কেন যে বাড়ি যেতেই ইচ্ছে হয় না।
প্রিয়নাথকে বড়ো বেশি মিয়মাণ দেখাচ্ছে। সবাই উঠলেও প্রিয়নাথ উঠল না। মাথা গোঁজ করে বসে আছেন।
কী হল, যাবে না!
তোমরা এগোও।
আসলে প্রিয়নাথের কেন জানি একা থাকার স্পৃহা জন্মাল। পার্কের গেট পর্যন্ত এক সঙ্গে যেতে পারতেন, সেখানে রিকশায় উঠলেই খালের সাঁকো, তারপর কিছুটা হেঁটে গেলেই বাড়ি। এখন আর তার প্রতীক্ষায় কেউ বসে থাকে না। চিন্তা হয় ঠিকই, একটা আস্ত মানুষ হারিয়ে গেলে চিন্তা হবারও কথা। চিন্তা, আর প্রতীক্ষা যে এক না।
তা হলে যাচ্ছি?
তোমরা হাঁটো। আমি একটু পরে যাচ্ছি।
আসলে প্রিয়নাথ কী করবেন বুঝতে পারছেন না। তাঁর কিছু ভালোও লাগছে। এই সহস্রাব্দের শুরুতে নারীত্বের সাম্রাজ্যবিস্তারের পূর্বাভাস দিয়ে আড্ডা শুরু হয়েছিল ঠিকই, মেয়েদের পরমায়ু বেশি, জরা ব্যাধি কম কিন্তু নিজের জীবনে সুধা শুরুতেই থায়রয়েড, ব্লাডপ্রেসার, শেষে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে হঠাৎ ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। অথচ আশ্চর্য, সুধা সারাজীবন তাকে মুগ্ধ করে রেখেছিল শরীর দিয়ে। সুধা নেই, তিনিও নেই। সব কেমন ফাঁকা অর্থহীন।
তিনি ভাবলেন, ডিম ফুটে ছানা হয়। আসলে সেক্স। অথচ কী আশ্চর্য সেক্সের আবির্ভাব বিবর্তনের চাপে। কোথায় যেন পড়েছিলেন। কোটি কোটি বছর আগে কোনও এক সময় প্রাণীজগতে যৌনতা এসেছিল নেহাতই একটা দুর্ঘটনা হিসাবে। কোথায় যেন পড়েছিলেন। স্ত্রী প্রজাতিই তার আদি স্বাক্ষর।
তিনি হাঁটছিলেন।
লক্ষ কোটি বছর আগেকার কোনও এক ঘোরের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিলেন প্রিয়নাথ। প্রাণীজগতের সেই চরম মুহূর্তে নারীর পুরুষ তৈরির মুহূর্তে তিনি যেন নারীর শরীর থেকে বের হয়ে আসছেন। অজগর সাপ যেন উগলে দিচ্ছে তাঁকে। কী সব দেখলেন, চারপাশে শুধু ঢেউ, কিংবা পাহাড় কিংবা বালিয়াড়ি। অতিকায় অজগর যেন উগলে দিয়ে তাকে শুঁকে দেখছে। যেমন গাভী তার বাছুরকে জন্মের পরে লেহন করে-শরীর তাঁর লাল ঝোলে মাখামাখি। নারীর পুরুষ নির্মাণ এমনই কোনও হেতু থেকে। তিনি হাঁটছিলেন। রিকশা নেবার কথা, তা নিতে ভুলে গেছেন। বিশাল পাঁচিল, তার পাশে বিজ্ঞান ভবন, তার পাশে সরকারি কর্মচারীদের বিশাল বিশাল হাইরাইজ বিল্ডিং—তার ভিতর পোকা মাকড়ের মতো অজস্র সংসার, এবং অজস্র জৈবিক তাড়না। নারীর পরিতৃপ্ত থাকার আয়োজন। তিনি হাঁটছিলেন, সুধা কত কষ্ট করে সারাজীবন তাকে ভালোবাসতে চেয়েছে। অসুখবিসুখে সে তার কর্তব্য করে যেতে বিন্দুমাত্র অবহেলা দেখায়নি। বড় কষ্ট হয় একা ফাঁকা ঘরে ঢুকতে। বিশ্বাসই করতে পারেন না, সুধা নারী প্রজাতির আদিম অস্তিত্ব। প্রেম এবং সৌন্দর্য ছিল তার নদী তীরে বালুবেলার মতো। সুধার জন্য সহসা তার বড়ো কষ্ট হতে থাকল—সুধার মৃত্যুদৃশ্যে তিনি বড়ো কাতর হয়ে পড়লেন। তাঁর গলা বুজে আসছে। তিনি সাঁকো পার হয়ে গেলেন। বাড়ির রাস্তায় দেখতে পেলেন সেই পাখির বাসাটা। তার আর হাঁটতে ইচ্ছে হল না। এই গ্রহের আদি এবং অনন্ত ইচ্ছের কাছে মাথা নত করে পাখির বাসাটার নীচে বসে পড়লেন। তাঁর বাড়ি ঘরের কথা মনে থাকল না।
