কী বুঝেছে পুলিশ, সেই জানে। সে রোয়াক থেকে নেমে হঠাৎ চেঁচিয়ে বলল, চুউপ! পাখি ডিমে তা দিতে আসবে। কোনও শোরগোল বরদাস্ত করা হবে না।
তা পাখি ডিমে তা দিতে আসতেই পারে প্রিয়নাথবাবু। পাখি কি গোলমাল পছন্দ করে না! তা তো বলতে পারব না। পুলিশ বলতে পারবে। রাস্তাটা পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব তার। কাকে ঢুকতে দেবে কিংবা দেবে না, সেই ঠিক করবে। সে চায় না কোনও গণ্ডগোলে পাখি উড়ে না আসুক, পাখিরও তো প্রাণের ভয় আছে। বেচারা ভুল করে সিগনাল পোস্টে না হয় বাসা বানিয়ে ফেলেছেই—তাই বলে তার ডিমের তো অনিষ্ট সাধন করা যায় না। এর একটা মানবিক দিকও আছে। পাখি গণ্ডগোল সহ্য করতে নাও পারে।
বৈদ্যনাথ ফোড়ন কাটল, ভারী দায়িত্ববোধ দেখছি পুলিশের।
হলধর বলল, আপনি কি দেখেছেন পাখি দুটোকে?
আজ্ঞে না। তবে গুজব নানা প্রকার। পাড়াসুদু গুজব গুজবের তো মাথামুণ্ডু থাকে না, বিশেষ করে স্ত্রী জাতির ক্ষেত্রে পাখি ঠিক পাখি নয়, পাখি ঠিক ওড়েও না। বাতাসে কুয়াশার মতো ভেসে থাকে। তারপর ঝুপ করে বাসাটার উপর বসে পড়ে। ঠোঁট আছে তবে খুবই ভোঁতা, চোখ দুটো চিংড়ি মাছের মতো। লেজের দিক বিস্তৃত, তবে মনে হয় স্বর্ণ পুচ্ছ—
আপনি দেখেছেন কি না বলুন।
না দেখিনি। বাড়ির মেয়েরা বলাবলি করছিল। রাস্তায় নো এন্ট্রি লাগিয়ে দিয়েছে। মানুষজন যেতে পারে, হাঁটতে পারে, তবে জোরে কথা বলতে পারে না। পুলিশের সতর্ক চোখ কানকে ফাঁকি দিয়ে রাস্তায় ঢোকাও মুশকিল-পাশের জানালায় একটা বাচ্চা মেয়ে বেলুনে ফুঁ দিচ্ছিল–ফটাস। পুলিশ ছুটে গেছে জানালায়। লাঠি তুলে হাঁকছে পিনড্রপ সায়লেন্ট। ডিমে তা দিচ্ছে—রতি সুখের অন্তিম নির্যাস, ডিম, তারপর ছানা, ছানা হাওয়ায় উড়ে গেলেই পুলিশ স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছে টুপিটা নিয়ে গিয়ে সেরেস্তায় জমা দেবে।
পতিতপাবনবাবু চুপচাপ শুনছিলেন, আসলে বয়েস হলে যা হয়— অবসর জীবন, সময় কাটে না। বিকেলবেলাটায় বেড়াতে বের হলেই মনে হয় সবার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। বাজার দর, রাজনীতি, খুন, ধর্ষণ, এই তো সেদিন, হাসপাতালে এক মহিলা, তার মেয়ে জাতকটিকে জানালা দিয়ে ঝোপের মধ্যে ফেলে দিল, অপরাধ তার পেটে মেয়ে কেন জন্মাল, শতকটি শুরু হতে না হতেই যত সব বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড, আর প্রিয়নাথবাবুও আছেন— রাজ্যের আজগুবি খবর নিয়ে বুড়োদের আসর মাতিয়ে রাখার স্বভাব-খারাপ লাগে না শুনতে। সময়ই কাটে না, তবু মাঝে মাঝে এই পার্কটায় খোলামেলা নারী পুরুষের আবির্ভাব ঘটে—দূর থেকে আড়ালে এ-সব দেখার মধ্যেও মজা আছে। এই তো সেদিন এক যুবতী তার প্রেমিক পুরুষের পেছনে ধাওয়া করছিল। যুবক ছুটে পালাচ্ছে—রাতের জ্যোৎস্না, তারা তো ভাবলেন, কী না কী হয়েছে! ছুটে গেলে তাজ্জব। নারী অথবা পুরুষের শরীরে কোনওই আব্রু ছিল না।
প্রিয়নাথ বলেছিলেন, এই হল গে নারী জাতি–প্রিয়নাথের এমনই স্বভাব, সে কত যে খবর রাখে। বইয়ের পোকা হলে যা হয়। সারাদিন অবসর জীবনে পত্রপত্রিকায় ডুবে থাকলে, প্রিয়নাথেরই বা দোষ কোথায়!
তখন তার প্রশ্ন করার হক থাকতেই পারে, মানুষ, জৈবপ্রযুক্তি, অর্থনীতি আর বিজ্ঞান–এ-সবের উপাদানে গঠিত সমাজ কেমন হবে? আগামী হাজার বছরে কোন ধারা স্পষ্ট হবে? মেসিন কি মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হবে! মেসিনই কি মানুষ তৈরি করবে, এমনকী বুদ্ধিমান অথবা চেতনা সম্পন্ন। এতটাই যে তার শরীর বদলানো যাবে নাট বল্টর মতো? কিংবা নরনারীর সম্পর্ক—প্রিয়নাথ আসলে এই আড্ডার প্রাণ। সে এ-সব নিয়েই বেশি কথা বলতে ভালোবাসে।
আজ যে কী হল প্রিয়নাথের।
তার বাড়ির রাস্তায় নো এন্ট্রি। সেখানে নৈঃশব্দ বিরাজ করছে। মানুষজন পা টিপে টিপে রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে। সামান্য গণ্ডগোল হলেই পুলিশের তাড়া খাচ্ছে। তাড়া খেয়ে দৌড়াচ্ছে, আর মাঝে মাঝে পুলিশ বেচারা মাথায় হাত দিয়ে তার হেলমেট খুঁজছে। মাথায় নেই এবং সঙ্গে সঙ্গে পাখির বাসাটার দিকে চোখ। পাখিটা ডিমে তা দিচ্ছে—কী যে মধুর!
পতিতপাবন না বলে পারলেন না, আরে একটা হতকুৎসিত পাখির জন্য পুলিশের এত তাড়া কেন বুঝি না। পাখি ডিমে তা দেবে, তার কোনও উপদ্রব না থাকে, সেজন্য কেউ রাস্তায় নো এন্ট্রি ঝুলিয়ে দিতে পারে! পুলিশ যানবাহন মানুষজন তাড়া করতে পারে! রহস্যটা কি প্রিয়নাথ!
রহস্য! পুরুষ ডুবছে। প্রিয়নাথ হাই তুলে বললেন।
ডুবছে মানে।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা আর থাকছে না। পুলিশ স্ত্রী পাখিটাকে এত তোল্লা দিচ্ছে কেন বোঝ না!
নারীতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা হবে বলছ প্রিয়নাথ। সেই আদিসভ্যতার মতো। জননী ঘিরে রাখছে সব কিছু।
ওরকমই কিছু। নারীত্বের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে আগামী হাজার বছরে নারী তার হারানো ক্ষমতা উদ্ধার করবে। আরে পুরুষ! বাদ দাও। আমাদের সময় একরকম ভাই চলে গেল কিন্তু আগামী দিনে ভয়ংকর এক জীবন পুরুষের। বোঝাই যায় তার নারীর চেয়ে বুদ্ধি কম, নারীর চেয়ে তার অসুখ বিসুখ বেশি। তার পরমায়ু পর্যন্ত গড়ে নারীর চেয়ে কম। কোন দিক থেকে তোমরা লড়বে ভাবছ, নারী খুবই দুর্বল প্রজাতি! দেখলে সেদিন জ্যোৎস্নায় বীরপুঙ্গব নারীর তাড়া খেয়ে কেমন ছুটছিল।
