আকাশে দুটো একটা নক্ষত্র ভাসমান। দূরে, চারপাশের সুসজ্জিত অট্টালিকা সমূহ ভেদ করে পাখির ঝাঁক উড়ে আসছে। শহরের উপর দিয়ে একটা কালো বর্ডার তৈরি করতে করতে তারা চলে যাচ্ছে। আর তখনই কেন যে মনে পড়ল, তাঁর বাড়ি যাবার রাস্তায় আজ সকাল থেকেই নো এন্ট্রি বসানো হয়েছে। মোড়ের রাস্তাটায় পুলিশও আজ ব্যস্ত।
তিনি বেঞ্চিতে বসার সময় পতিতপাবনবাবু সরে বসে জায়গা করে দিলেন। এ দিকের বেঞ্চিগুলিতে চার পাঁচজন অনায়াসে বসা যায়। নীচে ঘাসেও বসা যায়। তবে সকালে বৃষ্টি হওয়ায় মাটি বেশ স্যাঁতস্যাঁতে। তিনি বসার সময়ই বললেন, আজ সকালে ভারী একটা মজা হয়েছে হে।
আগে ঠিক হয়ে বোসসা। তারপর মজার কথা শোনা যাবে। চারপাশে এত মজা থাকতে, তোমার গলির মধ্যে শেষে মজা ঢুকে গেল সে কি হে। হলধর সান্যাল একটু ঝুঁকেই কথাটা বললেন।
আসলে এখন জ্যোৎস্না ওটার সময়। এত বড়ো মাঠে শুক্লপক্ষের রাতগুলি খুবই সুন্দর। যেমন আবছা মতো জ্যোৎস্নার এক কুয়াশা সৃষ্টি হয়। অস্পষ্ট রহস্যময়তা, নারীর প্রথম দিবসে পুরুষের রতিক্রিয়ার মতো।
বৈদ্যনাথ মাথার টুপি খুলে খানিকটা চুলকে নিলেন। টাকমাথা ঢেকে রাখার এই প্রয়াস বেঞ্চিতে বসে থাকলে রক্ষা করা যায় না। হলধর বললেন, টুপিটা আমার হাতে দাও। তারপর আরও আরামে চুলকাও। আরাম, বুঝলে আরামই এ-বয়সে একমাত্র কাম্য। কিন্তু প্রিয়নাথবাবু, আপনার মজার কথাটা শোনা হল না। সিগনালিং পোস্টের মাথায় কখন কোকিল একটা বাসা বানিয়ে ফেলেছে।
প্রিয়নাথবাবু, কোকিল তো বাসা বানায় না। ওই হল কাক। স্ত্রী কাকেরই বোধহয় কাজ। এটা ঠিক বাসাটি কোনও স্ত্রী কাকের কম্ম না কোনও অন্য পাখির করা সেটা বলা অবশ্য মুশকিল। বারান্দা থেকে স্পষ্ট দেখাও যায় না। আমাদের রঘু হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, কর্তা! মন্দিরের রাস্তায় নো এন্ট্রি পড়ে গেছে। গাড়ি বাস কিছুই ঢুকতে দিচ্ছে না পুলিশ। রাস্তার মাথায় একটা পাখি বাসা বানিয়ে ডিমে তা দিচ্ছে।
বৈদ্যনাথ টুপি মাথায় দিয়ে সমস্যার জট খোলার চেষ্টা করলেন, ভি আই পি-র আগমন ঘটছে কি না দ্যাখ।
ধুস! প্রিয়নাথ ধুস শব্দটি বলে তার বাড়ির রাস্তাটি যে প্রশস্ত নয়, কোনও ভি আই পি যাবার রাস্তাও নয়, বড়ো রাস্তায় জ্যাম হলে গলিঘুজি ধরে বের হয়ে যেতে গেলে রাস্তাটির খুব দরকার হয়। দরকারে বাসটাসও যায়। আর ট্যাক্সি কিংবা হাতে টানা রিকশাও ঢোকে। কেন যে নো এন্ট্রি, খুবই অর্থহীন।
তা হলে মজাটা কী হল! পতিতপাবনবাবু মজা খুঁজছেন।
সেই। তবে মজা আছে। আচ্ছা পুলিশের টুপি লোহার না পেতলের হয়? টুপি মানে হেলমেট। আপনারা জানেন? প্রিয়নাথ লোহা না পেতল জানতে চাইছেন। খুবই সমস্যা। লোহা না পেতল, বলা খুবই মুশকিল। সবাই চুপ। ওই হবে একটা। মজা তো আর লোহা কিংবা পেতলে আটকে নেই।
তা অবশ্য নেই। সেই আপনার মতো বৈদ্যনাথবাবু সারাদিন পুলিশই বা এই উত্তপ্ত গরমে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে কী করে। মাথা চুলকাতেই পারে। সিগনালের থামে মাঝে মাঝে টুপিটা রেখে দেবারও স্বভাব। হাওয়া না খেলে মাথা ঠান্ডা রাখা যায় না। ডিউটি শেষে পুলিশের কেন যে মনে ছিল না টুপিটা সঙ্গে নিয়ে যাওয়া। তবে মানুষ মাত্রেই ভুল হয়। হয় কি না—প্রিয়নাথ সবার সমর্থন চাইলেন।
আপনি বলে যান।
প্রিয়নাথ বললেন, বুঝলেন পুলিশটির ফের হপ্তা দুই পর আবার সেই পোস্টের নীচে ডিউটি। ডিউটি দিতে এসেই মনে পড়ে গেল, আছে, টুপিটা তো এখানেই সে ফেলে গেছে।
হলধর চেঁচিয়ে উঠল, অফিস কি ভ্যারাণ্ডা ভাজছিল। পুলিশের টুপি গায়েব, পুলিশের কখনও চাকরি থাকে।
বৈদ্যনাথ না বলে পারল না, হলধর কোন যুগে বাস করছ। রাতে প্রায়ই তো মার্কিন মুল্লুক থেকে ফোন আসে। পুত্ররা ফোনে তোমার কুশল নেয়। মনে হয় পাশের বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলছ। কী, ঠিক কি না। যুগের হাওয়া কত বদলেছে বোঝ না। খুনেরই কিনারা হয় না, আর একটা সামান্য টুপি…প্রিয়নাথ আপনি বলুন।
প্রিয়নাথ বলল, সেই। আমি অবশ্য বলতে পারব না—টুপি হারালে পুলিশের কী শাস্তি হয়। শাস্তি হয়েছিল কি না তাও জানি না। তবে পুলিশটির কর্তব্যবোধ খুব যে প্রখর বুঝতে অসুবিধা হয় না। পুলিশের এটুকু পরিবর্তন কি খুব বেশি মনে হয়। টুপি খুঁজতে গিয়ে দেখে তার মধ্যে একটা পাখির বাসা। আর গণ্ডাখানেক ছোটো ছোটো ডিম। মানে এগ। রতিসুখের স্মারক। পুলিশ রোয়াকে উঠে উঁকি দিয়ে দেখার পরই গোলমাল হয়ে গেল। টুপিটা একটা পাখির বাসা হয়ে গেছে। ডিম ফুটে বাচ্চা না হলে, বাচ্চা উড়ে না গেলে টুপিটা তুলে নিলে তাকে সবিশেষ পাপের ভাগি হতে হবে। বাসাটা ভেঙে দেওয়া উচিত না-পুলিশও ভাবছে বুঝুন।
পাপ কেন?
পাপ হবে না! জীবন নিয়ে খেলা। টুপি সাফ করতে গেলে বাসাটাও সাফ করতে হয়। পাখি বসবে কোথায়, ডিমে তা দেবে কোথায়। শুধু কি ডিম, ডিমের মধ্যে যে জীবনের কথা আছে। টুপি হারিয়ে তো খারাপ ছিল না, টুপি পেয়েও মজা। টুপি আর বলাও যায় না, একটা বড়ো পাখির বাসাই মনে হয়, এটুকু পরিবর্তনে পুলিশ বেচারা ধন্ধে পড়ে গেল। টুপি না ডিম সে কাকে রক্ষা করে।
হলধর বিরক্ত হয়ে বলল, শেষে কী হল! মজা কোথায়?
