এতে এখন জব্দ হবে মাছটা ম্যান্ডেলা অনুমানই করতে পারেনি। মাছটা আর তার চোয়াল বন্ধ করতে পারছে না। ছুটছে, ল্যাজ তুলে ছুটে বেড়াচ্ছে, ডুবে যাচ্ছে, জলে অজস্র বুদবুদ উঠছে। আবার ভেসে উঠছে। চোয়াল বন্ধ করতে পারছে না। কাঠটা দু-চোয়ালে ঠেকার কাজ করছে। কাঠটা দু-চোয়ালে বসে গেছে। ভাসলেও মুখ হাঁ করা, ডুবলেও মুখ হাঁ করা।
ম্যান্ডেলা যত দেখে তত হাততালি দেয়। একটা অতিকায় মীনকে এভাবে সে জব্দ করতে পারবে আশাই করতে পারেনি।
সে এবার হাত ঝেড়ে নৌকাটার কাছে গেল। ওয়াকা সাঁতার কাটছে।
নৌকাটা ম্যান্ডেলা আর হাইতিতি টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। আর মাছটা করুণ চোখে সমুদ্রে ভেসে থেকে অন্তরীক্ষের কাণ্ডকারখানা দেখছে। যেন বলছে, আমার দু-চোয়ালে কেন কাঠ আটকে দিলে। না পারছি ওগলাতে, না পারছি গিলতে।
ম্যান্ডেলা বলল, মজা বোঝ। ওয়াকাকে তুমি চেন না। সুতো কেটে দিলাম, তাই রক্ষে। পারতে সুতো ছিঁড়ে পালাতে। যতদিন তুমি জব্দ না হতে ওয়াকা নৌকায় ভেসে বেড়াত! ওয়াকাকে তুমি চেন না। বেইমানি আর কাকে বলে! প্রতিশোধ নেবে! আরে মানুষই তো ভুল করে। তাই বলে তাকে শোধরাবার সুযোগ দিতে হবে না। সে না হয় বঁড়শিতে আটকে ফেলেছিল, তোমার কি বুদ্ধি বুঝি না বাপু, দাঁত এত তোমার ধারালো-সুতো কেটে দিতে পারলে না। এথচ বড়াই ষোলো আনা!
নৌকাটা হাতের নাগালে পেয়ে ওয়াকা অদ্ভুত কৌশলে উলটে দিল, জল সেচে ফেলে দিল—আর দেখল, সেই অতিকায় মীন তার নৌকার পাশে ঘোরাফেরা করছে। আর হাই তোলার মতো মুখ ভাসিয়ে দেখাচ্ছে, কে যে তাকে এভাবে জব্দ করে গেল!
ওয়াকাও অবাক। সত্যি তো মাছটার চোয়ালে একটা পাটাতনের কাঠ আটকে রয়েছে। না পারছে ওগলাতে, না পারছে গিলতে। কে যে কাজটা করল! তবে সে ঘণ্টাধবনি শুনতে পেয়েছে। ম্যান্ডেলাদিদিরই কাজ। সে অবাক হয়ে শুনল, মাথার ওপর তখনও ঘণ্টা বেজে চলেছে।
ওয়াকা ঘণ্টাধনি অনুসরণ করল। তীরের কাছাকাছি এসে দেখল মাছটা তার দিকে তখনও করুণ চোখে তাকিয়ে আছে।
সে মাছটার কাছে গেল। হাঁ করা মুখের কাঠটা সে বৈঠায় চাড়ি মেরে ভেঙে দিল। আর তখন মাছটা ছুটল—যেন উড়ে যাচ্ছে—ছোট্ট একটা বিমানের মতো। সমুদ্রের ধারে যারা ওয়াকার অপেক্ষায় ছিল তারা তো দৃশ্যটা দেখে অবাক। তারা এসেছিল মাছ নিতে, কিন্তু দেখল, নৌকার খোলে একটাও মাছ নেই। পাটাতন সাফ। সে টলতে টলতে পাইন বনের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। সারা গায়ে তার অজস্র ক্ষত।
পাখির বাসা
কদিন ভ্যাপসা গরমের পর সকালের দিকে বেশ বৃষ্টি হয়ে গেল। চরাচর মনে হল মুক্ত হয়ে গেল ভ্যাপসা গরম থেকে। বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। কালবৈশাখীর তাণ্ডব এবারে একদিনও দেখা গেল না। জলবায়ুর কোনও পরিবর্তন কি না কে জানে। প্রিয়নাথ রোজই বের হন, বিকালে যতদূর পারেন হেঁটে যান। পার্কে বসেন। একটা সাঁকো পার হতে হয়। নড়বড়ে সাঁকোটা পার হওয়ার সময় সতর্ক থাকেন। ছ’টা বাজে, অথচ কণ্ঠদিন কি যে সূর্যের তাঁত—কেমন গরম লু বইত। আজ আরাম, আকাশ মেঘলা, গাছগুলির ফাঁকে চোখ খুলে আকাশ দেখলেন। পাতলা মেঘের ছড়াছড়ি। তার আজ হেঁটে যেতে ভালোই লাগছিল।
বয়েস হয়ে গেছে বলেই বাড়ি থেকেও সতর্ক করে দেওয়া হয়—বেশি রাত কোরো না, সাঁকো সাবধানে পার হবে। তিনি হাসেন। তার বয়সিরা অনেকে হাতে লাঠি সম্বল করেছে, তিনি এখনও ঋজু। তার অসুখ বিসুখ নেই বললেই চলে। তিনি তাঁর বংশগতির জন্য গর্ব বোধ করেন। বংশানুক্রমিক জিন নামক বস্তুটি তাকে যে এতটা শক্ত সমর্থ রেখেছে, এটাও তিনি বোঝেন।
ছিমছাম তার বাড়ি, প্রশস্ত রাস্তা, কেয়ারি করা ফুলের বাগান এবং বাসস্টপ পার হয়ে গলি মতো রাস্তায় ঢুকে গেলেন—সারাদিন বারান্দায় কিংবা নিজের ঘরে কাজে কর্মে লিপ্ত থাকতে ভালো লাগে না। বাইরে বের হলেই মনের মধ্যে সুবাতাস বয়ে যায়। তিনি প্রফুল্ল বোধ করেন। আর তখনই দেখলেন, পার্কের এক কোণায় ঝোপের মতো আড়ালে দুজন নারী পুরুষ অশালীন অবস্থায় বড়োই কাতর হয়ে আছে। তার যে এত কৌতূহল এ-বয়সে আসা উচিত নয়, ওদের দিকে নজর দিতেই এটা টের পেলেন। এমন কি সেই নরনারী তাকে দেখে বিন্দুমাত্র বিচলিতও বোধ করল না। অবশ্য প্রিয়নাথ এই সব পার্কে এলে এবং ঘুরতে ফিরতে এমন দৃশ্য মাঝে মাঝেই দেখে ফেলেন। মাঝে মাঝে আফশোসও করতেন–একটু যে নিরিবিলি হাঁটবেন, কিংবা কোনও বেঞ্চে গিয়ে বসবেন তারও উপায় নেই। তার মতো বয়সি মানুষেরা দেখতে পেলেই হাঁকবে—আরে কী দেখছ। মিলেনিয়ামের শুরুতে এ-সব যে বিন্দুমাত্র বিস্ময়ের নয় প্রিয়নাথ। সোজা নাক বরাবর তাকিয়ে এদিকটায় চলে এসো। বেঞ্চি এখনও খালি আছে। দেরি হলে দখল হয়ে যাবে।
প্রিয়নাথ ভাবলেন, এসবের উপাদানে গঠিত সমাজ কেমন হবে। কোন ধারা স্পষ্ট হবে আগামী হাজার বছরে—।
বয়েস যত বাড়ছে, চারপাশের বিজ্ঞান প্রযুক্তি এবং যৌনতা কিংবা যৌনতাই প্রাণের নির্যাস এবং প্রাণের নির্যাস মৃত্যু—এ-সব চিন্তা ঘুরপাক খেলেই মনে হয় যন্ত্রপাতি এবং খাপে খাপ লেগে যাবার মতো মানুষ বোধ হয় এই সহস্রাব্দেই নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খুশিমতো তৈরি করে নিতে পারবে।
বৈদ্যনাথ তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছেন। কিছুটা কিচর প্রকৃতির মানুষ বৈদ্যনাথ। তার রসিকতা কখনও মাত্রাতিরিক্ত মনে হয়। সান্ধ্য ভ্রমণের দোসর। কিছু বলাও যায় না। সে বোধ হয় কাতর প্রকৃতির নরনারীর দৃশ্য আরও স্পষ্ট দেখার জন্য অছিলা করে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। প্রিয়নাথ বাধ্য হয়ে বললেন, বোসো, আমি যাচ্ছি। বলে তিনি কী যেন খুঁজলেন।
