ম্যান্ডেলা এবার দেখল, সেই অতিকায় মীন ফের সমুদ্রের ঢেউ ঝাপটা মেরে সরিয়ে দিল—অনেকটা উপরে উঠে দেখার চেষ্টা করল কত দুরে তার সেই প্রবল প্রতিপক্ষ–তারপর ছুটে আসতে লাগল এবং ঝাঁপিয়ে পড়ল নৌকার ওপর। নৌকা উলটে গেল।
ওয়াকা লাফিয়ে পড়ল জলে-চিৎকার করে উঠল, ম্যান্ডেলাদিদি। আর কোনো আওয়াজ উঠল না। ঢেউ-এর ঝাপটায় সে অনেক দূরে সরে গেছে। ওয়াকা সাঁতারে পটু—সে ঢেউ-এর ওপর একবার হাত তুলে দিল, তারপর ঢেউএর ভিতর ডুব দিয়ে সে আরও কিছুটা দূরে সরে গেল—অতিকায় মীনের আর পাত্তা নেই। ম্যান্ডেলার বুকে ত্রাস—সে উড়তে থাকল—এবং যেখানে সেই মীন ফের ভেসে উঠল তার নাকে ল্যাজ দিয়ে হাইতিতি সুড়সুড়ি দিল। মাছটা মুখ ঝামটাল। হাঁ করা মুখ বন্ধ। মীন ভেসে উঠলেই হাইতিতি ছুটে যাচ্ছে, আর ল্যাজের ডগা দিয়ে নাকে মুখে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। যেন কোনো রকমে আটকে রাখা—এবং সেই ফাঁকে যদি ওয়াকা তার নৌকা ভাসিয়ে পালাতে পারে। কিন্তু নৌকাটা যে উলটে আছে। তার পাটাতনের কাঠ ছড়িয়ে পড়ছে সমুদ্রে। ওটাকে টেনে নেওয়া সহজ কাজ নয়। নৌকা ভেসে থাকলে, ম্যান্ডেলাই দড়ি ধরে টেনে নিয়ে যেতে পারত। সে জলেও নামতে পারছে না। যদি পালকের টুপি সমুদ্রে ভেসে যায়। যেতেই পারে। আসলে ম্যান্ডেলা ভুলেই গেছে তার পালকের টুপি ঝড় কিংবা ঢেউ কেউই উড়িয়ে নিতে পারে না। তার কেবল এখন লক্ষ্য কোনদিকে অতিকায় মীন ছুটে যাচ্ছে। অনেক দূরে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ওয়াকাকে। ঢেউ-এর প্রবল ঝাপটায় সে একান্ত স্থির থাকতে পারছে না। আর তখনই দেখল, আবার সেই অতিকায় মীন জলে ঘূর্ণি তুলে তালগাছের মতো সমুদ্রের পিঠে ভেসে উঠেছে। এবং তীরের ফলার মতো ছুটে যাচ্ছে ওয়াকার দিকে।
এ সময় হা-হুতাশ করে লাভ নেই ম্যান্ডেলা জানে–সে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে উঠেছে। সে দেখতে পাচ্ছে পাটাতনের একটা লম্বা কাঠ ঢেউ-এর মাথায়। দ্রুত উড়ে গিয়ে সে কাঠটা তুলে নিল। প্রথমে ভেবেছিল, ভাসলেই কাঠটা দিয়ে মারবে মাথায়। সে মারলও। আশ্চর্য মাছটার যেন তাতে কিছুই আসে যায় না। পাথরের মতো শক্ত মাথা। অতিকায় মীন তার লক্ষ্যে স্থির। সে ওয়াকাকে গিলে খাবেই। ওয়াকাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। ডুবে যাচ্ছে, ভেসে উঠছে। সে খুঁজছে তার নৌকাটাকে। কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। চারপাশে ক্ষেপা সমুদ্র তাকে ঘিরে ধরেছে। ঘণ্টাধবনি দূরে শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু কেউ তাকে উদ্ধার করতে আসছে না। প্রাণপণে সে ঢেউ কাটিয়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করছে। এই গভীর সমুদ্রে ঢুকে গিয়ে সে বুঝতেও পারছে না, কোথায় তার প্রিয় বেলাভূমি, পাইনের বন, আর টিলার ওপর মিকি মাউসের মতো লাল-নীল রঙের কাঠের বাড়ি। কোনদিকে সাঁতার কাটলে, সে সেখানে পৌঁছাতে পারবে তাও জানে না। কেবল মাঝে মাঝে হাঁকছে, ম্যান্ডেলাদিদি তুমি সব পার। আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাও। হাইতিতিকে বল, ঘণ্টাধবনি করুক, তা অনুসরণ করি।
কিন্তু প্রবল ঢেউ-এর গর্জনে ম্যান্ডেলা ওয়াকার কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছে না। সে এখন পাহাড়ের মতো বিচরণ করে বেড়াচ্ছে সমুদ্রে-অতিকায় মীনের খোঁজে। কোথায় গেল। যেন প্রকৃতির রুদ্ররোষে তারা পড়ে গেছে। ঝড় উঠলে বড়রকমের সর্বনাশ। সমুদ্রের জলকণা বাতাসে ভেসে বেড়ালে সে কিছুই চোখে দেখতে পাবে না। না ওয়াকাকে, না সেই অতিকায় মীনকে।
আবার দেখল, দিগন্ত থেকে মাছটা ভেসে আসছে। সমুদ্রের জল উথাল-পাতাল করে ভেসে আসছে। সে খুঁজছে ওয়াকাকে। মাছের ঘ্রাণশক্তি প্রবল। সে ঠিক ওয়াকাকে খুঁজে পাবেই—যত দূরেই থাক ওয়াকা, ঘ্রাণশক্তি প্রবল বলে ঘোরাফেরা করতে করতে অতিকায় মীন ঠিক পেয়ে যাবে ওয়াকাকে।
ম্যান্ডেলা উড়ছে।
হাইতিতি উড়ছে।
হাইতিতি হাঁ করা মুখের কাছে ল্যাজ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু মাছটা কিছুই দেখতে পাচ্ছে না—অথচ কিছু যেন নাকের ডগায় স্পর্শ করছে। সেটা কি মাছটা বুঝতে পারছে না। হ্যাঁচ্চো দিচ্ছে কিনা তাও ম্যান্ডেলা জানে না। কারণ মাছের হাঁচি কাশি থাকে কিনা সে জানে না।
ম্যান্ডেলা যে উড়ে গিয়ে বুচারমামার বন্দুকটা নিয়ে আসবে তার উপায় নেই।
সদা ব্যস্ত রাখতে হচ্ছে মাছটাকে।
ভেসে উঠলেই সে পাটাতনের লম্বা কাঠটা দিয়ে পিঠে মাথায় যেখানে সুযোগ পাচ্ছে, মারছে।
মাছটা তখন জলের নীচে লুকিয়ে পড়ছে। কিন্তু অতিকায় মীন, ভবি ভুলবার নয়।
আবার হাঁ করে সমুদ্রের তলায় ঘূর্ণি তুলছে—বেঁকে যাচ্ছে, চিৎ হয়ে খেলা করছে। যেন যে আছে সমুদ্রে, সে তার কজার মধ্যে। খুশিমতো গিলে ফেলা শুধু কাজ। ভেসে উঠে ডুবে গিয়ে সে যে মজা করছে না অদৃশ্য কোনো অশুভ আত্মার সঙ্গে কে বলবে! যেন বলছে, দেখ আমরা জলের জীব। তাবৎ শক্তি আমাদের জলে। অন্তরীক্ষে তুমি আর যাই কর, জলের নীচের সাম্রাজ্যে তোমার হাতিয়ার ভোঁতা।
ম্যান্ডেলা এটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। আর দেখছে, ওই তো ওয়াকা, ভাসছে— জলে ডুবছে। আর দূরে নৌকা উলটে গিয়ে যেমন লম্বা একটা কুমিরের মতো রোদ পোহাচ্ছে।
আর তখনই ম্যান্ডেলা দেখল, আবার সেই মীন ভেসে উঠেছে। চোখ হিংস্র। দাঁতালো মাছটা ওয়াকাকে মুখ হাঁ করে গিলতে যাচ্ছে। ম্যান্ডেলা উপায়ান্তর না দেখে হ্যাঁ করা মুখে পাটাতনের লম্বা কাঠটা ঢুকিয়ে দিল। ক্রিকেট মাঠে স্টাম্প পুঁতে দেবার মতো হাঁ করা মুখে ঢুকিয়ে দিল। খাপে খাপে বসে গেল কাঠটা। নাও বোঝ মজা!
