বোঝো মাছ ধরার মজা!
বোঝো এবার কার পাল্লায় পড়ে গেছ!
দেখছ না, কী দ্রুত ছুটে আসছে। আরে ওয়াকা সুতো কেটে দাও। ছেড়ে দাও। তুমিও যাবে, মাছও যাবে।
তারপরই মনে হল, সে কাকে বলছে! কে তার কথা শুনবে! তার কথা আকাশে ভেসে থাকলে কেউ শুনতে পায় না। তবে হাইতিতির ঘণ্টার শব্দ শোনা যায়। বোধহয় ঘণ্টার শব্দেই চকিতে একবার ওপরের দিকে তাকিয়েছিল, তার খেয়ালও নেই যেন দ্রুত ছুটে আসছে একটা অতিকায় হাঙর। থামের মতো কালো শিরদাঁড়া ভেসে আছে। লাফিয়ে ঢেউ-এর মাথাও উঠে গেল। সাদা পাথরের মতো পেটের মাংস থলথল করছে। ধারালো অজস্র দাঁতগুলি রৌদ্রকিরণে চকচক করছে —যেন খুঁজছে কোথায় আছে সেই আততায়ী এবং লাফিয়ে ঢেউ-এর মাথায় ভেসে উঠেই তলিয়ে যাচ্ছে। আবার ভেসে উঠছে।
ওয়াকা মরবে।
মরণের ওষুধ কানে ঝুলিয়ে বেড়াচ্ছে।
কি সাহস!
বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়।
ওয়াকা, ওয়াকা?
সে শুনতে পাবে কেন, মাথার ওপর ম্যান্ডেলাদিদি উড়ে ওকে ডাকছে। সতর্ক করে দিচ্ছে।
ঘণ্টার শব্দে কি তবে টের পেয়ে গেছে, যাক কাছে কোথাও ম্যান্ডেলাদিদি আর হাইতিতি আছে। তার আর ভয় নেই, সে বুঝছে না কেন, রাক্ষুসে মাছটা ল্যাজের এক ঝাপটায় তার নৌকা তলিয়ে দিতে পারে। নৌকা তো নয়, যেন একটা ডোঙা। বাবা যদি ফিরে আসেন, ওয়াকার এই দুর্জয় সাহসও তিনি পছন্দ করতে পারেন। ধমক দিতে পারেন, প্রাণ হাতে করে মাছটার সঙ্গে লড়লে! তোমার এত সাহস, একা একা গভীর সমুদ্রে ঢুকে গেছে! মাছটা তোমার কোনো অনিষ্ট করেছে!
অবশ্য পলকের ভাবনা, কিন্তু মাছটা যে ওয়াকার নৌকা দেখতে পাচ্ছে না বোঝাই গেল। কারণ একেবারে পাশ কাটিয়ে দূরে গিয়ে ভেসে উঠল।
জলের ঝাপটায় ওয়াকার জামা প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে। ঢেউ এসে তাকে এবং নৌকাটাকে ডুবিয়ে দেবার চেষ্টা করছে। সে টাল খেয়ে একবার পড়েও গেল। আবার উঠে দাঁড়াল। হুইল থেকে সুতো ছেড়ে দিচ্ছে। আবার গুটিয়ে আনার চেষ্টা করছে। ওস্তাদ মাছ শিকারির মতো তার ভাবভঙ্গি ওয়াকা নুয়ে কী খুঁজল! আবার মাছটা ঢেউ-এর মাথায় লাফ দিয়ে উঠে গেল। কিনার দেখা যাচ্ছে না। শহরবাসীরা কেউ জানেই না, ওয়াকা আজ মরণ খেলায় মেতেছে—হয় মাছ শিকার করে বেলাভূমিতে ফিরবে নয় সে নিজেকে নিঃশেষ করে দেবে।
ম্যান্ডেলা ইচ্ছে করলে নৌকায় নেমে যেতে পারে। কিন্তু এত পলকা নৌকায় সে নামলে, তার ভরে যে নৌকাটা ডুবে যাবে না কে বলতে পারে। সে পাটাতনে নেমেও যেতে পারছে না। সে ভাবল, যদি মাছটাকে মুক্তি দেওয়া যায়। কি যে। করে! এত শক্ত সুতো যে হাঙরের দুর্ধর্ষ ধারালো দাঁত পর্যন্ত অকেজো। অথবা মাছটার হৃৎপিণ্ডে যদি বঁড়শি গেঁথে যায় তবে মাছটা নিজের ছটফটানিতেই অস্থির হয়ে উঠেছে। দাঁতে বঁড়শি কেটে দেবার কথা বেমালুম ভুলে যেতে পারে—এই সব সাত-পাঁচ ভেবেই সে আলগাভাবে ওয়াকার মাছ কাটার ধারালো ছোট্ট ছুরিটা তুলে ঘ্যাঁচ করে সুতো কেটে দিল। মাছটা ফিরে যাক নিজের দেশে, যে যার মতো সুখে থাক ভেবেই কাজটা করেছে। এ ছাড়া যেন ওয়াকার প্রাণ রক্ষা করার উপায় তার জানা ছিল না।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। মাছটা ঠিকই ওয়াকাকে দেখেছে, তার নৌকাটাও। এতক্ষণ ওয়াকাই ছিল সবল প্রতিপক্ষ। সুতোয় টান দিলেই মাছের অন্তরাত্মা থরথর করে কাঁপে! সে অবশ হয়ে যায়। প্রতিপক্ষ সবল বুঝতে কষ্ট হয় না। এবার যেন মাছটা ছাড়া পেয়ে আরও হিংস্র হয়ে উঠল। ঢেউ-এর ওপর লাফিয়ে ডিগবাজি খেল দু-বার। জলে বিশাল ঘূর্ণি তুলে ভেসে বেড়াতে থাকল— ওয়াকা হতাশ। সে জানে তার বুঝি রক্ষা নেই—এতক্ষণ সে ছিল সবল প্রতিপক্ষ, এক মুহূর্তে সুতো ছিঁড়ে যাওয়ায় সে কত দুর্বল হয়ে গেছে, হতাশ মুখ দেখে টের পেল ম্যান্ডেলা।
সমুদ্রের নীল জলে মাছটা চক্কর দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে এবার মরণ খেলায় বুঝি মাতবে। নৌকাটার চারপাশে বেশ দূরে সে মুখ তুলে বিশাল হাঁ করল তারপর ডুব দিল। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ ঝাপটা মারছে। ওয়াকা সত্বর তার সব গুটিয়ে নিয়ে ভেগে পড়ার তালে আছে। সে হয়তো জানে, অতিকায় মীনটি সমুদ্রের নীচে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার খোঁজে। এবং নীল জলরাশি ভেদ করে যে কোনো মুহূর্তে তার নাকের ডগায় লাফিয়ে পড়তে পারে। তারপর ওয়াকাকে গিলে খেতে পারে।
ম্যান্ডেলা ভেবে পাচ্ছে না—কী করবে! সে কেমন অস্থির হয়ে পড়ছে। ওয়াকার কিছু হলে কি যে হবে! সে খুবই বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। সে নৌকার ঠিক মাথার ওপরই ওড়াউড়ি করছে। হাইতিতি একবার নৌকায় নেমে যেতে চেয়েছিল, তার ল্যাজ ওয়াকার পিঠেও মাঝে মাঝে লেগে যাচ্ছে। পিঠে সুড়সুড়ি লাগছে–ওয়াকা জানে হাইতিতির ঘণ্টা এভাবেই বাজে। রাতে অদৃশ্য হবার মুখে শহরবাসীদের মতো সেও শুনতে পায় আকাশে ঘণ্টাধবনি করে কারা চলে যাচ্ছে। শহরবাসীদের তখন এক কথা, লুসির ভূতুড়ে মেয়েটার কাজ। শিশুরা বলবে, জাদুকরের কৃপায় এটা হয়। মানুষ ইচ্ছে করলে উড়তে পারে না, এমন অবিশ্বাসী তারা নয়। মানুষই সব পারে। জাদুকর ইচ্ছে করলেই পারে। লুসির ভূতুড়ে মেয়েটা বললে তারা ক্ষেপে যায়। ওয়াকাও ক্ষেপে যায়। সেই একই ঘণ্টাধবনি তার মাথার উপর অনবরত বাজতে থাকলে, সে চিৎকার করে উঠল— ‘ম্যান্ডেলাদিদি, শিগগির খবর দাও, সমুদ্রের দৈত্যটা আমাকে ঘিরে ফেলেছে। ওই দেখ দূরে ভেসে উঠছে-ওই দ্যাখ দূরে পিঠের শিরদাঁড়া ভাসিয়ে চলে যাচ্ছে। ওই দ্যাখ আবার ফিরে আসছে।
