ছোটোরা যে বড়োদের কথাই অনুকরণ করে—ম্যান্ডেলাদিদির শাসনে এটা সে ভালোই টের পায়। ছোটোরা বড়োদের কাছেই সব শেখে। বজ্জাতিও। তবে ম্যান্ডেলাদিদি খুবই সরল। আর মনটাও খুব ভালো। তার যে ভালো চায় হাইতিতি তাও বোঝে। সে আর পাখিদের ঝাঁকের পেছনে ধাওয়া করে না। কিংবা পাখিদের মতো ডিগবাজিও খায় না। সত্বর বাড়ি ফেরা দরকার। মা-র জন্য মন খারাপ পাখিদের সঙ্গে ওড়াউড়ির খেলা পছন্দ নাই করতে পারে। সে দুষ্টুমি করলে রেগে তো যাবেই। পাখিরা কেন তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে। আর পাখিরা তাকে দেখতে পায় কিনা তাও সে বোঝে না। তার গলায় ঘণ্টা বাজলে শব্দ হয় ঢং ঢং। তাকে দেখতে না পাক ঘণ্টার শব্দ ঠিকই টের পায়। তখন পাখিদের মধ্যে কলরব পড়ে যায়। উড়তে উড়তে যদি পাখির ঠ্যাং ধরে ফেলে—তবে খুব জব্দ। কিন্তু ম্যান্ডেলাদিদি তেড়ে আসবে।
এই হাইতিতি, হচ্ছেটা কি! ছেড়ে দাও। কাউকে জব্দ করাও মোটা বুদ্ধির লক্ষণ। তোমার খেলা আর একজনের প্রাণসংশয়। ঠ্যাং ভেঙে গেলে, পাথা মচকালে, পাখিটা আর উড়তে পারে! দেব তোমার ঠ্যাং ভেঙে। বুঝবে মজা। কারও অনিষ্ট করলে তোমার অনিষ্ট হতে পারে বোঝো না। বয়স তো কম হল না–ধেড়ে বাঁদর কোথাকার।
তুমি আমাকে বাঁদর বললে।
বাঁদরামি করলে বাঁদর বলব না তো কি বলব।
পাখিদের সঙ্গে তো খেলা করছিলাম। বাঁদর বললেই হল।
এটা খেলা! খেলা বোঝ না। একজনের খেলা, আর একজনের প্রাণসংশয় এটা তোমার কাছে খেলা হতে পারে—কিন্তু পাখির জীবনসংশয় বোঝো! তুমি তাকে আদর করতে চাইছ বুঝবে কী করে। সে তো ছটফট করবেই। এস।
আবার হাওয়ায় ভেসে চলে তারা।
এগমন্ট হিল চোখের ওপর ক্রমশ বড় হচ্ছে। এবারে শতরঞ্জের মতো পাহাড়তলি ভেসে উঠেবে চোখে। একবারে দাবার ছকের মতো মনে হয়। গাছপালা স্পষ্ট নয়, ধীরে ধীরে সব এবারে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তার শরীর আর ততটা হালকা নেই যেন। গতি কমে আসছে।
আর তার যে কি হয়। দেশে ফেরার সময় মনে হয়, সে হয়তো বাড়িতে গিয়েই দেখবে, বাবা তার ফিরে এসেছেন। ম্যান্ডেলাকে বাড়িতে দেখতে না পেলে ছটফট করবেন সে জানে। বাবা যদি জানে, ম্যান্ডেলা তাকে খুঁজতে বের হয়েছে খুশিই হবে। তবে বাবা রাগও করতে পারে। বলতেই পারে, তুমি একটা বাচ্চা মেয়ে ম্যান্ডেলা, তুমি আমাকে কোথায় খুঁজতে বের হয়েছিলো তোমার এই দুর্জয় সাহস হল কী করে? তখন তো সে বলতে পারবে না, জান বাবা জাদুকর না আমাকে একটা পালকের টুপি দিয়ে গেছে। হাইতিতিকে রুপোর ঘণ্টা। আমার মুখ ব্যাজার দেখে জাদুকরের মনে দয়া হয়েছিল।
এটাও ঠিক, বাবা ফিরে এলে সে আর ওড়াউড়ি করতে পারবে না। জাদুকর বলেই দিয়েছে, টুপিটা পরলে তুমি যেখানে খুশি ইচ্ছে করলে উড়ে যেতে পারবে, বাবাকে খুঁজে বেড়াতে পারবে। বাবা তোমার ফিরে এলেই পালকের টুপি হারিয়ে ফেলবে। বাবা ফিরে না আসা তক তুমি ছোটো থাকবে। বয়স বাড়বে না। বড়ো হয়ে গেলে তুমিও একজন তখন অবিশ্বাসী হয়ে যাবে। অবিশ্বাসীদের জন্য কখনো কোনো পালকের টুপি থাকে না। জীবনে কিছু পেতে হলে, কিছু হারাতে হয়, এও জাদুকর তাকে বলে গেছেন। সে তার বাবাকে ফিরে পেলে, পালকের টুপি হারিয়ে ফেলবে।
ম্যান্ডেলা যদি গিয়ে দেখে বাবা সত্যি ফিরে এসেছেন—ইস—সে আর একদণ্ড স্থির থাকতে পারছে না! সে সব হারাতে রাজি, তার পালকের টুপিও-বাবা ফিরে এলে, তার আর কিছুর দরকার হবে না। যেন গিয়েই দেখতে পারে, দেয়ালের হুকে বাবার জাহাজি টুপি ঝুলে আছে। বাবা ফিরে এলে কত কিছু নিয়ে আসতে পারে। তাহিতি দ্বীপের রঙিন পাথর বাবা তাকে এনে দেবে বলেছেন। দামি পাথরের মালা পরে সে ঘুরে বেড়াতে পারবে। তার জন্য হনলুলু দ্বীপের টিয়া পাখির মুখোসও নিয়ে আসতে পারেন। মুখোস পরে সে, ওয়াকা আর হাইতিতি চলে যাবে জাদুকরের মূর্তিটির নীচে। তারপর তারা গান গাইবে। পাতার বাঁশি বাজাবে ঘুরে ঘুরে। জাদুকরের দয়াতেই বাবা যে একদিন ফিরে আসবেন, এই বিশ্বাস তার আছে। সে জানে না, জাদুকরের মনে কি আছে? তিনি যদি চান, তার বাবা ফিরে আসুক, তবে যত সাত সমুদ্র তের নদীর পারেই বাবা তার থাকুক না, ঠিক ফিরে আসবে।
আর তখনই এটা কি দেখতে পাচ্ছে!
সমুদ্রের জল তোলপাড় করে বিশাল একটা হাঙর তেড়ে যাচ্ছে কাকে। আরে করছে কী, জল যেন পাহাড় কেটে দু-ভাগ হয়ে গেছে। সমুদ্রের জলে তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে—আরে মাছটা কি ক্ষেপে গেছে! ক্ষেপে যাবার কি কারণ। তার বাবার কথা মনে থাকল না, বাড়ির কথা মনে থাকল না—এমন একটা রাক্ষুসে দৈত্য তাদের সমুদ্রে এসে হাজির—আর হাঁ করে কাকে তাড়া করছে। তারপরই ম্যান্ডেলার চক্ষুস্থির। ওয়াকা আর তার ছিপ-নৌকাটি গভীর সমুদ্রে মোচার খোলের মতো নামছে উঠছে, কাত হচ্ছে। সে কি ধরে আছে ঠিকমতো? আর নীচে নামতেই টের পেল ওয়াকা তার ঠাকুরদার ছিপ নিয়ে গভীর সমুদ্রে চলে এসেছে। ছিপটার সুতো ছেড়ে দিয়েছে—এবং নীল হাঙরের গলায় আটকে গেছে বিশাল একটা বঁড়শি। মাছটা তো ক্ষেপে যাবেই। ছলচাতুরী করে মাছটাকে লোভে ফেলে দিয়ে ওয়াকা এতক্ষণ মজা দেখছিল বোধহয়। বঁড়শি গেঁথে গেলে মাছটা এত হিংস্র হয়ে উঠতে পারে সে হয়তো অনুমানই করতে পারেনি।
