আর তাই না দেখে শহরবাসীদের চোখ কপালে উঠে গেল। একজন জাদুকর যদি পাথরের মূর্তি হয়ে শহরের শিশুদের কাছে ফের ফিরে আসেন, তবে তাঁকে অবহেলা করা যায় না। বাচ্চাদের শুভ-অশুভ বলে কথা। সব বাবা-মারাই তো চায় তাদের শিশুরা বড়ো হয়ে উঠুক—পৃথিবীর তাবৎ স্বপ্ন নিয়ে। নগরপাল সভা করলেন তখন, এই মূর্তি নিয়ে কি করা। শিশুরা দাবি করল, বেলাভূমিতেই মূর্তিটি বসিয়ে দেওয়া হোক। গড়ে তোলা হোক সুন্দর একটি বাগান। বাগানে নানা ফুলের গাছ লাগিয়ে দেওয়া হোক। আর যেসব পাখিরা ফুল ভালোবাসে মধু খেতে ভালোবাসে তাদের বলা হোক, এখানেই এসে তোমরা থাকবে। কেউ তোমাদের ক্ষতি করবে না।
৪.
দূর থেকে যত শহরের কাছে উড়ে যাচ্ছে তত ম্যান্ডেলা উত্তেজিত হয়ে পড়ছে। প্রথমেই দেখতে পাবে সেই বিশাল পর্বতশ্রেণি। এগমণ্ড হিলের শৃঙ্গগুলি বরফে ঢেকে থাকে। রোদের বর্ণছটায় ঝিকমিক করে পাহাড় চূড়ো। কখনো মনে হয় সোনালি পাহাড়। কখনো রূপালি পাহাড়। তার সেই বর্ণছটায় রাতেও কেমন শহরটা বিভোর হয়ে থাকে। আকাশের দিকে তাকালে চোখে পড়বে অনন্ত হয়ে আছে সেই পাহাড়ের দেশটা। সে এত জায়গায় উড়ে গেছে নিজের এই পাহাড়টির ওপরে কখনও উড়ে যায়নি। দু-চোখ মেলে তার প্রিয় এই পাহাড় দেখার ইচ্ছে কেন যে হয়নি বোঝে না। দূর থেকে পাহাড় যত রহস্যময় ঠেকে, কাছে গেলে তা হারিয়ে যেতে পারে। এই আতঙ্কেই হয়তো সে কখনো পাহাড়ের ওপর দিয়ে উড়ে যায়নি। যেন পাহাড়টা আছে থাক। সে তার রহস্য নিয়ে সারাজীবন ম্যান্ডেলার মনে বেঁচে থাক। উড়ে গেলেই দেখতে পাবে, সেই একই বনভূমি, নদীর খাদ কিংবা যেমন আর দশটা পাহাড় থেকে ঝরনা নেমে আসে তেমনি কোনো নিরাভরণ ঝরনা নিয়ে জেগে আছে পাহাড়টা। দিন রাত জল পড়ার ঝরোঝরো শব্দ যদি কখনো একঘেয়ে মনে হয়, তবে যেন পাহাড়ের মহিমা খাটো হয়ে যাবে।
তারপর আরও কাছে গেলে সে দেখতে পাবে পাহাড়ের কোলে সব আপেল কমলালেবুর বাগান, পাকা সড়ক—লাল-নীল কাঠের বাড়ি। গাছগুলিতে আপেল আর আপেল। গোলাপি কিংবা টকটকে সিঁদুরের রং আপেলের গায়। উপত্যকায় এই আপেলের বাগানগুলি কি যে টাটকা আর তাজা! মাঝে মাঝে এখানে সেখানে কৌরিপাইনের জঙ্গল, নীচে আবাদের ভূমি কিংবা মেষপালকরা অস্থায়ী কুটীর বানিয়ে চলে আসে এখানে। সারাদিন তারা ভেড়ার পাল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ঘাস খাওয়ায়। রাতে মাঠের মধ্যেই ঘুমিয়ে থাকে ভেড়ার পাল। অঁতোগুতিও করে— তখন মেষপালকের কাজ ছুটে যাওয়া। ঝগড়া থামিয়ে দিতে না পারলে শিং-ফিং ভেঙে রক্তপাত। বড় বিশ্রী ব্যাপার। মেষপালক কুটীরে শুয়ে থাকে খড়ের বিছানায়। কখনো সে নির্জন প্রান্তরে সেই বাঁশি বাজায়। যা দিয়ে গেছে বসন্তনিবাস সবার হাতে হাতে।
নীচে সেই সমুদ্র কিংবা দ্বীপটিকে শুধু সে দেখতে পাচ্ছে। দুটো একটা জেলেডিঙিও দেখতে পেল। সকাল হচ্ছে। এবারে দূরে এক ঝলক আলোর মতো পাহাড়টা চোখে ভেসে উঠল। তার চোখ বাঁধিয়ে গেছে। তুষারশৃঙ্গে সূর্যোদয়ের সময় তাকালে যা হয়! সে কেমন মুহ্যমান হয়ে পড়ে। হাইতিতি উড়ে যাচ্ছে আরও বেগে। সে বোধহয় ভেবেছে ম্যান্ডেলার আগে পাইনের বনভূমিতে টুপ করে নেমে পড়বে। হাইতিতির এই এক দোষ। কিছু বুঝতে চায় না। মাঝে মাঝে গোয়ার্তুমিও করে ফেলে—সে যা বলে হাইতিতি তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না। বোঝে না— সমুদ্রপাখিরা পথ ভুল করে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারে। সমুদ্রের উপর উড়ে যাওয়া এমনিতেই কঠিন—কেবল ম্যান্ডেলা জানে, সে বাড়ি ফিরছে, বাড়ির জন্য তার মন খারাপ, মাকে দেখার জন্য সে উত্তেজিত হয়ে আছে—পালকের টুপি জানে, সে কি চায়। জানে বলেই সে বাড়ি ফিরে যেতে পারছে
হাইতিতির তা না। হাইতিতির মা-বাবার কথাও বোধহয় মনে নেই। সমুদ্রে ঝাঁক ঝাঁক পাখি দেখলেই সে তাদের সঙ্গে খেলা করে বেড়ায়। উড়ে বেড়ায়, ওরা যদি কোনো দ্বীপের দিকে ধাওয়া করে, সেও পিছু নেয়। পিছু নিলে তাদের যে নিজের দেশে ফেরা হবে না হাইতিতি বোঝে না। এত বোকা। ডাকলেও শোনে না। তখন আর কি করা। অগত্যা ছুটে যেতে হয়, ডাকতে হয়, হাইতিতি ভালো হচ্ছে না। পাখিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা ভালো। কিন্তু পাখিরা জলে ভেসে থাকতে পারে, ঘুমাতে পারে, তুমি পারবে ডালে বসে থাকতে, ঘুমাতে পারবে। খাবে কি? পাখিরা ছোঁ মেরে সমুদ্র থেকে মাছ তুলে নিতে পারে দরকারে! তুমি পারবে। তোমার কি আর কখনো কাণ্ডজ্ঞান হবে না!
কে শোনে কার কথা।
অগত্যা ছুটে গিয়ে কান টেনে ধরতে হয়—
বলতে হয়, ওদিকে নয়, এদিকে। ওদের সঙ্গে কোথায় রওনা হলে ফিরছি বাড়ি, মন ভালো নেই, মা কত চিন্তা করছে আর তুমি পাখিদের দেশে উড়ে যেতে চাও। সে না হয় যাওয়া যাবে। ওড়া তো তোমার ফুরিয়ে যায়নি। ম্যান্ডেলাদিদি তোমাকে একবার পাখিদের দেশও ঘুরিয়ে আনবে। এখন চল। লক্ষ্মী ভাইটি।
হাইতিতি রেগে যায়।
তুমি আমার কান ধরলে কেন?
একশোবার ধরব।
আমি যাব না।
হাইতিতি ভালো হচ্ছে না। নিজের ভালোমন্দ বুঝতে শেখ। আমি চিরদিন থাকছি না যে তোমাকে পাহারা দিয়ে বেড়ায়।
হাইতিতির রাগ জল। সত্যি তো ম্যান্ডেলাদিদি না থাকলে সে খুবই বিপদে পড়ে যাবে। সে একেবারে তখন খুবই অনুগত হয়ে যায়। আমি চিরদিন থাকছি না’ ম্যান্ডেলাদিদি শুধু বলে না, বুচার মামাও বলে। লুসি মাসিও বলে। ম্যান্ডেলাদিদি উৎপাত শুরু করলেই লুসি মাসি বলবে, ম্যান্ডেলা নিজের ভালোমন্দ বুঝতে শেখ। আমি চিরদিন থাকছি না, যে তোমাকে পাহারা দিয়ে বেড়ায়।
