সুতরাং ম্যান্ডেলার কেন যে মনে হয়েছিল, বাবা, ওয়াকা কোথাও কোনো নির্জনে বসে পাতার বাঁশি বাজাতে পারে। কে জানে, বাবা হয়তো চুপি চুপি বলছে-’এই ওয়াকা, আমাকে দিবি একটা পাতার বাঁশি। আমি বড়ো হয়ে গেছি বলে কি বাঁশি বাজাতে পারি না। ছোটোরা যা পারে, বোরাও তাই পারে। ছোটোদের মতো বড়োদেরও ইচ্ছে হয় পাতার বাঁশি বাজিয়ে যদি দুঃখকষ্ট ভুলে থাকা যায়। তা জাহাজে উঠলে তো ফেরার দিনক্ষণ ঠিক থাকে না। কবে জাহাজ ফিরবে কেউ জানেও না। পাঁচ-সাত মাস এমনকী কখনও বছর কাবার হয়ে যায়। তখন তো বাবার মন বাড়িঘরের জন্য খারাপ লাগতেই পারে। পাতার বাঁশি বাজাতে জানলে, মানুষের যে দুঃখকষ্ট অনেক লাঘব হয় বাবাও বোধ হয় টের পেয়েছিলেন।
বেশ বেলা হয়ে গেছিল বাবার ফিরতে।
মা কেবল ঘরবার করছিল।
গেল কোথায়? দ্যাখ না ম্যান্ডেলা সে গেল কোথায়। আরে ওয়াকার না হয় কাণ্ডজ্ঞান থাকতে না পারে, তাই বলে সে না বলে কয়ে সকালে বের হয়ে গেল!
ম্যান্ডেলার কি যে তখন রাগ হচ্ছিল। তাকে ফেলে চুপচাপ বাবা চলে গেল। একবার বলতেও পারল না, আমরা যাচ্ছি, তুই যাবি! ওয়াকা বাবার এত প্রিয় হয়ে গেল! সে তার বাবার কেউ না!
ম্যান্ডেলার তখন এক জবাব, জানি না, কোথায় গেছে তারা। আমি জানব কী করে। মাছ ধরতে গেলে ছিপ হুইল ঘরে পড়ে থাকত না। মাছের খবর ওয়াকা ভালো জানে। সমুদ্রে সারভিনের ঝাঁক কখন উঠে আসে সেই ঠিক খবর দিতে পারে। মাছ ধরার নেশা ওয়াকারও কম নেই। তার দাদুর ছোট্ট সরু সাদা নৌকাটির সে মালিক। দাদু ছিলেন মাছ মারার ওস্তাদ লোক। মৃত্যুর আগে নৌকাটি নাকি ওয়াকাকে দান করে গেছেন। আর নৌকাটিরও আছে নানা বাহারি শখ। সে যেদিকে যেতে চায়, যেতে দিতে হয়। যেমন চিংড়িমাছ বড়ো বড়ো—প্রায় হাতখানেক এক একটা লম্বা—নৌকাটিই তার খবর জানে, কোথায় আছে কী মাছ! —সমুদ্রে কবে যে নৌকাটি ভাসানো হয়েছিল কেউ জানে না। সরু ছিপনৌকা। খুবই ছোটো। একজনের বেশি আরোহী উঠতে পারে না। আর এর আশ্চর্য ক্ষমতা বিশাল বিশাল ঢেউ অবলীলায় পার হয়ে যাওয়া। যতই ঝড় থাকুক সমুদ্রে, হাল ঠিক রাখতে পারলে সাধ্য কি ঢেউ নৌকাটিকে গ্রাস করতে পারে! চেষ্টার ত্রুটি নেই। নৌকাটি ভাসলেই সমুদ্রের তর্জন গর্জন শুরু হয়। আবার তুমি! দেখাচ্ছি মজা। দু-হাত তুলে, হা রে রে করে ঢেউগুলি নৌকাটিকে তেড়ে আসে। ওয়াকা নিপুণভাবে সমুদ্রের ওপর তার নৌকা ভাসিয়ে দূরে দূরে চলে যায়। এটাও তার এক ভারি মজার খেলা। ফেরার সময় নৌকায় থাকে নানা রঙের ঝিনুক, শঙ্খ, চিংড়িমাছ বড়ো বড়ো। আর সারডিন মাছ। সে নৌকার খোল থেকে মাছগুলি যখন সমুদ্রের কিনারে নামিয়ে আনে, ম্যান্ডেলার কি আনন্দ। বেছে বেছে তাজা আর সুস্বাদু মাছগুলি ম্যান্ডেলা দিদির জন্য রেখে দেয়। বাকি সব দিয়ে দেয় তার জাতভাইদের। সে মাছ কখনো বিক্রি করে না।
ওয়াকা সমুদ্রে গেছে খবর পেলেই তার জ্ঞাতিভাইরা সব ছুটে আসবে বেলাভূমিতে। ওয়াকা যখন মাছ ধরতে গেছে, তখন সে খোল ভরতি করে মাছ শিকার করে ফিরবেই। সবাই ঝুড়ি নিয়ে বসে থাকে। ওয়াকা নৌকা টেনে বালিয়াড়িতে তুলে আনলে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু ওয়াকা তখন খুব গম্ভীর। সে বেশ বড়োদের মতো তখন কথা বলে।
লাইন দিয়ে দাঁড়াও।
সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে যায়।
এস এক এক করে।
সবাই এক এক করে এলে ভালোমন্দ মিশিয়ে মাছ তুলে দেয়।
কাজেই বাবা ওয়াকার পাল্লায় পড়ে মাছ শিকারেও যেতে পারে। ওয়াকার তো মাথার ঠিক নেই—এক ভেবে বাবুর সঙ্গে বেড়াতে বের হয়েছে, আর এক ভেবে নৌকায় উঠে গেছে! বাবা যে তার কত ছেলেমানুষ তখনই টের পায় ম্যান্ডেলা। তা না হলে বাড়ির কাজের ছেলেটি কখনো মনিবের মতো কথা বলতে পারে-’চলুন কর্তা বাঁশি বাজাইগে। চলুন কর্তা ডাং খেলিগে। চলুন কর্তা মাছ শিকারে। আরে কারও বাবা কি এমন হলে হয়! নিজের মর্জির কথা বুঝতে হয় না। ওয়াকার মর্জিতে যেখানে সেখানে চলে যাওয়া কি ঠিক?
কাজেই ম্যান্ডেলার গোঁসা হবে না তো কার হবে! তার দায় পড়েছে, কোথায় গেল তারা রোদে বের হয়ে খুঁজতে হবে। ডাকাডাকি করতে হবে।
বাবা কেন যে জাহাজ থেকে ফিরলে এত ছেলেমানুষ হয়ে যেত সে বুঝত না। এটাই ছিল তার ক্ষোভের কারণ। যেন ওয়াকা বাড়ির কাজের ছেলে নয়, বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
সেই বাবা আর ওয়াকা ফিরে এল। পাইনের জঙ্গল ভেঙে উপরে উঠে এল। হাইতিতিও ফিরছে। তিনজন একেবারে যেন বিশ্বজয় করে ফিরেছে। তিনজনের কাছেই পাইন পাতার বাঁশি। বাবারটা হাতে, ওয়াকারটা পকেটে গোঁজা আর হাইতিতির বাঁশিটা বগলে।
এখন কেন যে মনে হয়, জাদুকর শহরের শিশুদের খুশি করার জন্য, যে যা চেয়েছে দিয়ে গেছে। যেমন ওয়াকাকে দিয়ে গেছে পাতার বাঁশি। পাইন পাতা দিয়ে কি সুন্দর বাঁশি বানানো যায় সে-ই শুধু জানে। আর সবাই যে চেষ্টা না করেছে তা নয়, কিন্তু পাতা মুড়ে বাঁশি হয় তবে কোনো সুর থাকে না। ফুঁ দিলে সুমিষ্ট সুর ভেসে বেড়ায় না। ওয়াকাকে এই জাদুবিদ্যা দেওয়ায় সে কি খুশি। ওয়াকা তো জানে না, তাকেও দিয়ে গেছে পালকের টুপি, হাইতিতিকেও দিয়ে গেছে রুপোর ঘণ্টা। ওয়াকা মনে করে জাদুকর কেবল তাকেই ভালোবাসত। ম্যান্ডেলাদিদিকে সেই তো জাদুকরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সেই ম্যান্ডেলাদিদি যে আরও আশ্চর্য টুপির মালিক ওয়াকা জানেই না। ওয়াকার এত অনুগত ছিল বসন্তনিবাস যে সে ছাড়া কাউকে কোনো জাদুবিদ্যার অধিকারী করবে বিশ্বাস করতে পারত না। অন্তত যেদিন বসন্তনিবাস জাহাজে চলে গেল সেইদিন তো মনে হয়েছিল, ওয়াকাই জাদুকরের প্রিয়জন। সে শহরের সব শিশুদের এনে জড় করেছিল জাহাজঘাটায়। বড়ো বড়ো ক্রেনের নীচে দাঁড়িয়ে তারা সাদা রঙের পোশাকে বিদায় জানিয়েছিল জাদুকর বসন্তনিবাকে। তারা সবাই একটি আশ্চর্য মেলডি পাতার বাঁশিতে সৃষ্টি করেছিল। সেই সুরে কান্না পায়নি, এমন একটি শিশুও ছিল না জেটিতে। ম্যান্ডেলা আর ওয়াকা মাঝখানে। তাদের দুজনের মাঝখানে হাইতিতি। হাইতিতি পর্যন্ত অপলক দেখছিল, জাহাজে সেই ক্ষেপাটে নাবিক দাঁড়িয়ে আছে। অন্তত জাহাজের ছোটোবাবু ওয়াকাকে কানে কানে ফিসফিস করে বলেছিল, নজর রেখ। জাহাজ থেকে পালিয়ে কোথায় যে গিয়ে বসে থাকে—আমরা খুঁজতে বের হই। দেখছ তো কেমন কিম্ভুতকিমাকার পোশাক পরে জাহাজ থেকে নেমে আসে! লক্ষ্মী ছেলে, খবর দিতে পারলে জাহাজের কাপ্তান খুশি হবে। ওয়াকা জাদুকরকে ক্ষেপাটে লোক বলায় খুবই ক্ষুব্ধ হত। তবে প্রকাশ করত না। সে বলত, ছোটোবাবু, জাদুকর কখনো ক্ষেপাটে হয়! আমরা যা চাই তিনি তাই দেন। চাইতে জানতে হয়। তবে আপনি স্যার, যখন বলেছেন, জাহাজে পৌঁছে দিতে, যতই রাত হোক বসন্তনিবাসকে আমরা জাহাজে ঠিক পৌঁছে দেব। যত রাতই হোক ওয়াকা বসন্তনিবাসকে জাহাজঘাটায় পৌঁছে দিত। জাহাজের ছোটোবাবু এবং আরও দু-চারজন নাবিক টর্চ হাতে সি ম্যান মিশানের সামনে অপেক্ষা করত। ওয়াকা বসন্তনিবাসকে যত রাতই হোক জাহাজঘাটায় পৌঁছে দেবে এমন বিশ্বাস তাদের যথেষ্টই ছিল। ‘ সেই ওয়াকা পাতার বাঁশি পেয়েই খুশি। জাদুকরের জন্য মন খারাপ হলে, সে চুপচাপ জাদুকরের মূর্তির পায়ের কাছে গিয়ে বসে থাকে। শহরের মানুষেরা অবাক হবে না! জাদুকর জাহাজে চলে গেল, ওয়াকা তার ব্যান্ড বাজিয়ে বিদায় জানাল–হাজার হাজার বেলুন উড়িয়ে দেওয়া হল বাতাসে–আর সাদা জাহাজ যত দূরে যায়, তারা দেখতে পায়, জাদুকর একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে ডেকে। শিশুদের উদ্দেশে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে—যেন বলতে চায় সব শিশুদের মনেই আছেন। একজন জাদুকর—যে তাকে যে-ভাবে চিনতে পারে। সাদা জাহাজ নীল জলে ক্রমে অদৃশ্য হয়ে গেলে ওয়াকা ফিরে এসেছিল—আর কি কান্না! বোধহয় জাদুকর ওয়াকার কষ্ট টের পেয়েই মাস কাবার না হতেই বেলাভূমিতে এসে তিনি পড়ে থাকলেন। সেই এক পোশাক। একই রকমের নাগরাই জুতো, মাথায় ময়ূরের পালক—একেবারে রাজবেশ। জাদুকর ছিলেন রক্তমাংসের, হয়ে গেলেন শেষে সাদা পাথরের মূর্তি।
