সে তো একদিন মাকে অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বলেছিল, আচ্ছা মা, পাহাড় কখনও সমুদ্রে বিচরণ করতে পারে। তার কি হাত পা আছে, যে হেঁটে বেড়াবে, নয় সাঁতার কাটবে। পাহাড় কখনো সমুদ্রে হেঁটে যেতে পারে!
মা চোখ কপালে তুলে বলেছিল, বলছিস কি! অমন কথা মুখে কখনো বলবি না। তিনি ঈশ্বরের পুত্র। তাঁর মহিমা অপার। তিনি বললে সব হয়। তিনি ইচ্ছা করলে সব পারেন। পাহাড় কেন, সব এক মুহূর্তে লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে। পাহাড় গুড়িয়ে যেতে পারে। সমুদ্রের জল তিনি অঙ্গুলি হেলনে শুয়ে নিতে পারেন। কখনো আর এমন কথা বলবে না। বলে মা হাঁটু গেড়ে বলেছিল—বিড়বিড় করে প্রার্থনা করেছিল-’মেয়েটা অবুঝ প্রভু। তার দোষ ধরো না।
দূর থেকে দেখতে পাচ্ছে সেই প্রিয় এগমন্ট হিল। এই পাহাড়টার কোলেই তার প্রিয় শহর নিউ প্লাইমাউথ। সমুদ্রের ধারে পাহাড়ের কোলে শহরটা। ধাপে ধাপে উপরে উঠে গেছে। বন্দর এলাকা পার হয়ে সি-ম্যান মিশান-ট্রাম গাড়ি এক বগির। গাড়িটা দুলকি চালে পাহাড়ের চড়াই-উত্রাই পার হয়ে যখন যায় তখন দূর থেকে মনে হয় খেলনার গাড়ি। তার কেবল ইচ্ছে হচ্ছে, কতক্ষণে সেই গাড়িটা তার দৃষ্টিগোচর হবে।
এ সব ভাবার সময়ই মনে হলো, বাবা ওয়াকার কথাই শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছিলেন। হাইতিতি নামটা ভারি সুন্দর। জব্বর নাম ছিক করেছে ওয়াকা। তবু বাবার বোধহয় কোনো সংশয় ছিল নাম নিয়ে। তিনি ওয়াকাকে প্রশ্ন করেছিলেন, নামটি তোর সুন্দর। কিন্তু হাইতিতি বললে তো কিছু বোঝায় না। এই যেমন সব নামেরই একটা ব্যাখ্যা থাকে—তোর নাম ওয়াকা। মাউরি উপজাতিদের ভাষায় ওয়াকা মানে সুন্দর। হাইতিতির মানেটা কি বুঝতে পারছি না।
৩.
ওয়াকা সত্যি বিপদে পড়ে গেল। সে ভেবেও কিছু বলেনি—তবু কেন যে বাচ্চাটার নাম সে হাইতিতি রাখতে চাইছে। তারপরই এক গাল হেসে বলেছিল, আমরা ডাং খেলি না?
তা খেলিস। তোর তো কাজকাম না থাকলেই ডাং খেলার নেশা। তখন তোর পাত্তা পর্যন্ত পাওয়া যায় না। কোথায় যে লুকিয়ে পড়িস!
বেচারা পড়ে গেল মহা ফাঁপরে। ঠিক নালিশ গেছে তার নামে। সে তবু কিঞ্চিৎ চুপচাপ থেকে কী ভাবল-তারপর বলল, ডাং ছুঁড়ে দেবার সময় আমরা চিৎকার করি-হাই।
হাই! সে আবার কী?
জিজ্ঞেস কর না ম্যান্ডেলাদিদিকে। কী তুমি চুপ করে আছ কেন? তুমি খেল। আহা, কী ভালো মেয়ে সেজে বসে আছে!
শহরটায় মাউরি উপজাতির লোকেদেরও বাড়িঘর আছে। তবে ম্যান্ডেলা বোঝে না, তারা কেন গরিব হয়। গরিব বলেই তো ওয়াকা সেই বাচ্চা বয়স থেকে তাদের বাড়িতে আছে। তার সঙ্গে বড়ো হচ্ছে। ওয়াকা ফাঁক পেলেই ডাং খেলতে না চলে যায়। পাহাড়ের উপত্যকায় উঠে গেলে সে দেখতে পায় ওয়াকার বন্ধুরা তার অপেক্ষায় বসে আছে। এদের প্রায় সবার বাবা-মাই দিনের বেলা কাজে বের হয়ে যায়। কেউ রাস্তা পরিষ্কার করে। কেউ আঙুরের জমি চাষ করে মালিকের হয়ে। মেয়েরা দোকানে কাজ করে। বাজারে নানা কিসিমের মাছও বিক্রি করে। সমুদ্রে মাছ ধরার জন্যও দলে দলে তারা বের হয়ে যায়। তখন বাড়ির কাচ্চাবাচ্চারা স্বাধীন। যে যার মতো হুটোপুটি করে বেড়ায় অথবা সমুদ্রের ধারে ঘোরে। কেউ গিয়ে জেটিতেও বসে থাকে। নাবিকদের পিকাকোরা পার্কে চিনিয়ে নিয়ে যায়।
ম্যান্ডেলা বলছিল, জানো বাবা, একটা ছোট্ট লাঠি, সাইপ্রাস গাছের ডাল কেটে তৈরি। জানো বাবা লাঠিটা না খুব ভারি। দল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে সবাই। এক লাইনে কেউ আগু-পিছু থাকতে পারবে না। তারপর না, দলের রাজা ঠিক হবে। তারপরে না, রাজা ডাং ছুঁড়ে দেবার সময় চিৎকার করে উঠবে—হাই। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে সবাই এক পায়ে লাফাতে থাকবে। তিতি তি—সবাই এক পায়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আর মুখে তি তি বলছে। যে আগে যেতে পারবে, আগে কজা করতে পারবে ডাং সেই হবে ফের দলের রাজা।
বাবা বলেছিল, বা, সুন্দর খেলা তো। তা এই হাইতিতি খেলার সঙ্গী হতে পারি না আমি?
বাবা জাহাজ থেকে ফিরে এলে মাঝে মাঝে বড় ছেলেমানুষ হয়ে যেত। একবার তো সত্যি ওয়াকার সঙ্গে ডাং খেলতে চলে গেল।
মার এক কথা, তোর বাবা গেল কোথায়! ম্যান্ডেলাও জানে না, গেল কোথায়। বাবা বাড়ি নেই, ওয়াকাও নেই, এমনকী হাইতিতি নেই—তা ওয়াকা বাচ্চা হাইতিতিকে নিয়ে মাঝে মাঝে শহরে ঘুরতে বের হয়। কখনো ম্যান্ডেলা সঙ্গে থাকে। শহরটা না চিনলে হবে কি করে! তারা হাইতিতিকে নিয়ে পিকাকোরা পার্কেও বেড়াতে গেছে। মুশকিল, হাইতিতিকে দেখলে সব বাচ্চাদের কেন যে ল্যাজ গজিয়ে যায়। ভিড়ে হাঁটা যায় না কখনো। আর নানা প্রকারের দুষ্টুমি—কেউ কান টেনে দেয়—লম্বা কান বলে টানতে খুবই সুবিধা। কেউ ল্যাজ টেনে দেয়। কেউ আবার চিমটি পর্যন্ত কাটে। তখনই রেগে যায় ওয়াকা।—কি হচ্ছে, এটা কি বাঁদর,—এটা কি কুকুর! হ্যাঁ, তোরা বাচ্চাটার পেছনে লেগেছিস! জানিস ফুঁ মন্তরে বাঘ বানিয়ে দিতে পারি—জানিস ইচ্ছে করলে হাতি হয়ে যেতে পারে। বাঁদরামি করছিস, জাদুকরের কথা মনে নেই’ আর তখনই সবাই খুব ভালো ছেলে। একেবারে ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না। তারা তো দেখেছে জাদুকরের সঙ্গী ওয়াকাকে। ওয়াকা বললেই তো জাদুকর যে যা চাইত দিত। দুষ্টুমি করলে জাদুকরকে বলত, না, দেবে না। তোমার পেছনে লুকাই প্যাক দিচ্ছিল। তুমি টের পাওনি! ওকে পাতার বাঁশিও দেবে না। জাদুকর পাইন পাতা দিয়ে সব সুন্দর সুন্দর বাঁশি বানিয়ে দিয়ে গেছে তাদের। এখনও তারা পাইন ফেস্টিভ্যালের দিন, পাতার বাঁশি বের করে সমস্বরে আশ্চর্য মিউজিক তৈরি করে। তখন শহরের লোকজন না বলে পারে না, ভাগ্যিস জাদুকর বসন্তনিবাস জাহাজে করে এসেছিল, পাতার বাঁশি বানিয়ে দিয়েছিল বাচ্চাদের, না দিলে এমন একটা সুন্দর বন্দর শহরে এই আশ্চর্য মিউজিকের খবরই কেউ পেত না। এখন তো নানা সাজপোশাকে পাইন পাতার পোশাক পরে সবাই যখন শহরের বড় গির্জার দিকে হাঁটে তখন এই মিউজিক শোনার জন্য রাস্তার পাশে, ঘরের ছাদে, জানালায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়। জাদুকর বলেই সম্ভব, যেন এই শহরে সবই ছিল— ছিল না কোনো অকল্পনীয় মিউজিক। যার স্রষ্টাও জাদুকর নিজে। সে সেবারে মিছিলটি নিজেই পরিচালনা করছিল। তার লম্বা আলখাল্লার উপর পাইন পাতার নানা বাহার। ওয়াকাই বুঝিয়েছিল, তুমি জান না বসন্তনিবাস, এটা আমাদের সবচেয়ে বড়ো উৎসব। সারাদিন সারারাত উৎসব চলবে। যে যার মতো বাহারি মিছিল বের করবে। আমরা বের করব বাঁশির মিছিল। সবার হাতে থাকবে পাইন পাতার বাঁশি, তুমি তো সুন্দর সুন্দর বাঁশি বানিয়ে দিয়েছ আমাদের। মন ভালো না থাকলে আমরা সমুদ্রের ধারে ধারে ঘুরি আর বাঁশি বাজাই। বাঁশির সুর কতদূর থেকে শোনা যায়! আর কি সুমিষ্ট। তখন মানুষের তো দুঃখকষ্টও থাকে না। তোমার হাতেও থাকবে লম্বা পাইন পাতার বাঁশি। ক্লারিওনেটের মতো লম্বা। তুমি যে সুর দেবে, সেই সুরে আমরা বাঁশি বাজাব। শহরের লোকজন বুঝতে পারবে, কত বড়ো ওস্তাদ লোক তুমি।
