আর যায় কোথায়।
ওয়াকার মুখে একগাল হাসি।
সে বোধহয় রাগে ক্ষোভে ঘামছিল। তার তখন সব ঠান্ডা। সে জামার আস্তিনে মুখ মুছে বলল, হাইতিতি।
হাইতিতি আবার নাম হয় নাকি! মা মুরগির রোস্ট কেটে সবার পাতে দেবার সময় কথাটা বলেছিল।
ব্যস, ওয়াকার আবার মন খারাপ। টিকল না। তার নাম পছন্দ না। সে ব্যাজার মুখে চায়ের পর্টে গরম জল ঢেলে দিল। খাওয়া হলে ওয়াকা সব যখন সাফ করে তুলে নিয়ে যাবে তখন সবাই এক পেয়ালা চা না হয় কফি খায়। সে হাতের কাছে সব জোগাড় রাখে। যে যার মতো পট থেকে চা নেয়। চিনি নেয়। দুধও নেয়। তবে বাবা চা-এর লিকারই বেশি পছন্দ করেন তিনি তাঁর চা-এ কখনো দুধ মেশান না।
ম্যান্ডেলার খারাপ লাগছিল। ওয়াকার ব্যাজার মুখ সে একদম পছন্দ করতে পারে না। তাছাড়া ওয়াকারই তো ভাব ছিল বেশি জাদুকরের সঙ্গে। সেই তো জাদুকরকে শহরটা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। সেই তো বাড়ি ফিরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিল–জান, জাদুকর বসন্তনিবাস এসেছে শহরে। সে যা চায় পেয়ে যায়। আলখাল্লার ভিতর থেকে যখন তখন সে একটা বেড়ালের বাচ্চা বের করে আনে। তারপর জাদুকরের কান যত ফরফর করে নড়াচড়া করে তত বেড়ালছানাটা বড়ো হয়ে যায়। শেষে বাঘ হয়ে যায়। বাচ্চারা বাঘ দেখে খুশি হলে, জাদুকরের আর কান ফরফর করে না। বাঘটা ছোটো হতে হতে শেষে আবার বেড়ালছানা হয়ে যায়। তারপর লাফিয়ে জাদুকরের আলখাল্লার পকেটে ঢুকে পড়ে। তবে ওয়াকা এ-সব ম্যান্ডেলাকেই বলে। কারণ বড়োরা তো বিশ্বাস করবে না। বাচ্চারা যা দেখতে পায় বড়োরা তা দেখতে পাবে কেন।
তার মনে আছে, বাবা সেদিনই সমুদ্রযাত্রায় বের হয়ে গেছিলেন। খুব ইচ্ছে। ছিল, জাদুকরের খবরটা বাবাকে দেয়। কিন্তু বাবা যদি বিশ্বাস না করে-ওয়াকা তো বলেছে, ছোটোরা যা দেখতে পায়, বড়োরা তা দেখতে পায় না। বড়োরা বিশ্বাস নাও করতে পারে। বিশ্বাস না করলে জাদুকরের অপমান না! সে রেগে গেলে, তাদের ক্ষতিও করতে পারে। বিশ্বাসীদের জন্য জাদুকর-অবিশ্বাসীদের প্রতি জাদুকর খাপ্পা। পর পরই ওয়াকা বলেছিল, আমাদের ধর্মে আছে, তুমি জান মেসাইয়া কি না করেছেন। তিনি ইচ্ছে করলে কুষ্ঠরুগীর আরোগ্য লাভ করাতে পারেন। মূক-বধির তাঁর কৃপায় কথা বলতে পারে, অন্ধ ব্যক্তি দৃষ্টি ফিরে পায়। মৃত ব্যক্তির জীবনলাভ হয়। অবিশ্বাসীরা এ-জন্যই তো বিধর্মী।
খুবই অকাট্য যুক্তি।
ম্যান্ডেলা বাবাকে জাদুকরের খবর দিতে সাহসই পায়নি। আর সে-বারই তো বাবা জাহাজডুবিতে নিখোঁজ হয়ে গেলেন। বাবা কি কারও কাছ থেকে শহরে জাদুকরের আবির্ভাবের খবর পেয়েছিলেন! খবর পেয়ে কি তিনি অবিশ্বাস করেছিলেন—যত্ত সব আজগুবি কথা! জাদুকর আজগুবি হলে যিশুর দয়াও আজগুবি। কই তার বেলায় তো তিনি অন্ধজনে দেহ আলো গোছের। তিনি কত সব অলৌকিক ক্রিয়া কাণ্ড করে গেছেন, গির্জায় গেলে কিংবা মা যখন অত্যন্ত নিরিবিলি পবিত্র গ্রন্থটি পাঠ করেন, তখন তো তিনি কখনো বলে না—আজগুবি। বরং যিশুর দয়ার কথা পড়তে পড়তে মা কেঁদে চোখ ভাসায়। তারও যিশুর কথা শুনতে শুনতে কেন যে কান্না পায় বোঝে না। মনে হয়, তিনি একজন মাস্টার ম্যাজেসিয়ান। তাঁর দয়ায় মানুষ সঠিক পথের খোঁজ পায়। শয়তান শত লোভে ফেলেও তাঁকে কজা করতে পারনি—মানুষের মঙ্গল ছাড়া মাস্টার ম্যাজেসিয়ান আর কিছু ভাবতেই পারতেন না। যিশু রাস্তায় আসছে জেনে দু’জন অন্ধলোক অপেক্ষা করছে। কাছে আসতেই তো তারা চিৎকার করে বলেছিল, প্রভু আপনি আমাদের স্পর্শ করুন। যীশু তাদের চোখে হাত রাখলেন। তারা আবার পৃথিবীর সব কিছু দেখতে পেল। কত বড়ো জাদুকর হলে এটা যে সম্ভব! বসন্তনিবাস তাকে পালকের টুপি দিয়ে গেছে—কাউকে বলা যায় না। অথচ তিনি যে একজন প্রবল জাদুকর কেউ বিশ্বাসই করবে না। যিশুর সেই গল্পটাও তো তার মনে গেঁথে আছে। সক্কাল বেলায় তিনি জেরুজালেমে ফিরছেন। বড়ো ক্ষুধার্ত। রাস্তায় একটা মরা যজ্ঞিডুমুরের গাছ দেখতে পেলেন। পাতা নেই, ফল নেই। তিনি শুধু বললেন, আমি ক্ষুধার্ত—তুমি কি আমাকে কিছু ডুমুর ফল দিতে পার না! সঙ্গে সঙ্গে গাছটি পাতা মেলে দিল। হাওয়ায় তার ডালপালা দুলতে থাকল। ডুমুর ফলে ভরে গেল ডালপালা। যিশুর শিষ্যরা তো দেখে অবাক। তাঁরা প্রশ্ন করলেন, প্রভুকে—কী করে সম্ভব? প্রভু বললেন, যদি তোমাদের অটুট বিশ্বাস থাকে, যদি কোনো সংশয় না থাকে, এর চেয়ে আরও অলৌকিক কাজ তোমরা ইচ্ছে করলে করতে পার। এই যে সামনে মাউন্ট অফ অলিভস রয়েছে, তাকে যদি বল, সমুদ্রে বিচরণ কর—তবে সে তাই করবে। যদি প্রার্থনায় বিশ্বাস জন্মায়, হেন কাজ নেই মানুষের মঙ্গলের জন্য তুমি তা করতে পার না।
ম্যান্ডেলা মা-র কাছে শুনেছে, আরও কত অলৌকিক ঘটনার কথা। বাবা জাহাজে চলে গেলে মা তো সারাদিন চুপচাপ কাজ করত, ঘর সাজাতে, বাবার লাগানো গাছগুলিতে জল দিত, তাকে নিয়ে বসাতো–হাতের লেখা, অঙ্ক ড্রইং সব খাতাগুলির মলাট দিত যত্নের সঙ্গে। ইস্কুলের নাম, তার নাম, কোন ক্লাস সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখে দিতে পারলে খুশি হত।
তারপর অবসর সময়ে যিশুর মহিমা পাঠ করে শোনাতো মা। বিশ্বাস করলে মাউন্ট অলিভসকেও যে নির্দেশ দেওয়া যায়, যাও সমুদ্রে গিয়ে বিচরণ কর—আর তক্ষনি পাহাড়টা হয়তো চলে যাবে সমদ্রে। আসলে বিশ্বাস। পালকের টুপি পরে সেটা আরও বেশি বুঝেছে। জাদুকরের প্রতি প্রবল বিশ্বাসই তাকে পালকের টুপিটা যেখানে খুশি নিয়ে যেতে পারে। যতই দুর্গম অঞ্চল হোক, যতই দূরের হোক সব দেশে সে ঘুরে বেড়াতে পারে। তার কি মজা কেউ বুঝবে না।
