সেই ভগ্নীপতি যেবারে ক্যাঙারুর বাচ্চাটি নিয়ে জাহাজ থেকে নামল, কী ভিড় বাচ্চাটাকে দেখার জন্য। বাড়িতেও ভিড়। ম্যান্ডেলাকে খুশি করার জন্য সেবারে আর কাঠ নয়, পাথরের নয় একেবারে রক্তমাংসের জীব এনে হাজির করলেন। তবে ক্যাঙারুর বাচ্চা তো—পোষ মানবে কেন! খায় না, শুয়ে থাকে। ম্যান্ডেলা বোঝে ক্যাঙারুরও মা-বাবা থাকে। মা-বাবার জন্য মন তো খারাপ করবেই।
এই দুধ খাও?
খাবো না!
না খেলে, আমিও খাচ্ছি না। ম্যান্ডেলা গুম মেরে বসে থাকত বাচ্চাটার সামনে। লুসি রাগারাগি করছে–তুমি কি, মেয়ে বলল, আর জ্যান্ত একটা ক্যাঙারুর বাচ্চা ধরে আনলে!
বাঁচবে।
ন্ডেলার মনে আছে, বাবা শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, বাড়িতে ম্যান্ডেলা আছে। বাঁচবে। ভালোবাসা পেলে কে না বাঁচে! বাঁচতে চায়!
তখন তো বাচ্চাটা ভালো করে লাফাতেও পারত না। ম্যান্ডেলার আদরে মাথাটিও গেছে। ম্যান্ডেলা খেতে বসলে নিজেই লাফিয়ে এসে বসে পড়বে। টেবিলের চারপাশে চারটে চেয়ার। ডাইনিং টেবিলে কারুকাজ করা চিনামাটির প্লেট, বাচি, চা-এর পট, ননদানি জলের মগ। চারপাশে চারজন। বাবা-মা একদিকে—সে আর হাইতিতি একদিকে। ওয়াকাই নামটা দিয়েছিল। বাড়িতে কেউ অতিথি এলে তার যে একটা নাম থাকে ওয়াকাই মনে করিয়ে দিয়েছিল।
কত নাম ঠিক করা হল।
ম্যান্ডেলার একটাও পছন্দ না।
সি-গাল।
সি-গাল কেন? ও কি পাখি! সি-গাল নাম রাখছ! ও কি উড়তে পারে? ওর কি ডানা আছে?
বাবা বললেন, শ্যাময় নামটা বেশ।
ম্যান্ডেলা জানে না শ্যাময় কোনো নাম হতে পারে। সেটা আবার কি বস্তু?
বাবা বলেছিলেন, শ্যাময় একপ্রকারের হরিণ। আল্পস পর্বতমালায় তারা বিচরণ করে। তুষার হরিণও বলতে পার। রঙটা তো হরিণের মতো। শ্যাময় নামটাই আমার পছন্দ।
মা ধমকে উঠেছিল, যেমন মেয়ে তেমনি বাবা। নাম নিয়ে এত দুশ্চিন্তা! কেউ খাচ্ছে না। কেউ কাঁটা চামচ ধরছে না। আর বাচ্চাটাও হয়েছে, দেখ, যেন সব বুঝতে পারে। সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কে কি নাম রাখতে চায়, নামটা পছন্দ কিনা, বোঝার চেষ্টা করছে।
মা-র ধমকে সবারই মনে হল, খাবার টেবিলে গল্পও করতে হয়, আবার খেতেও হয়। তারা শুধু গল্পই করছে। ওয়াকা ডাইনিং টেবিল সাজিয়ে ক্যাঙারুর বাচ্চাটার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে কি নাম রাখতে চায়, কারো সে বিষয়ে যেন কোনো আগ্রহ নেই জানার।
তার খুব অভিমান। সে কোনো কথা বলছে না। গুম মেরে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে-ই যে বাজার থেকে, বন থেকে বাচ্চাটার জন্য খাবার সংগ্রহ করে আনে কেউ যদি তার কষ্টটা বুঝত। সে-ই তো আবিষ্কার করেছিল, বাচ্চাটা খেতে ভালোবাসে আনারস আর তরমুজ। লেটুস পাতাও তার প্রিয় খাবার। আর বুনো ফল এবং গাছের নরম শেকড়-বাকড়। যেমন বনআলু তার খুব প্রিয়। জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে ওয়াকা লতা দেখলেই চিনতে পারে, কোনটা বনআলুর, কোনটা শালুই লতা। লতার ফল দেখলেও সে চিনতে পারে। দুটো লতাই একরকম দেখতে। পাতাও একরকমের। পানপাতার মতো। ওয়ালনাট গাছ কিংবা কৌরিপাইনের কাণ্ড খুব প্রিয় এ-দুটো লতারই। গাছের ডালপালা জড়িয়ে এমন বিতিকিচ্ছি অবস্থা করে ফেলে যে তখন গাছটাকে আর চেনাই যায় না। ঝুপড়ি মতো হয়ে যায় গাছটা। এত সব কারণে দু-একবার ওয়াকা যে না ঠকেছে তা নয়। বনআলু ভেবে লতার গুঁড়ি কুপিয়ে দেখা গেল, কিছুই নেই। শালুই লতার মূল বলে বিশেষ কিছু থাকে না। লতার নীচে হাতির দাঁতের মতো নরম রসালো মূলও থাকে না। পরিশ্রমই বৃথা। এখন অবশ্য সে জঙ্গলে ঘুরে ফুল এবং ফল দেখে চিনতে পারে, কোনটা বনআলুর। কোনটা শালুই লতা। শালুই লতার ফুল এবং ফল দুই হয়। ফুলগুলি কাকটাস লতার ফুলের মতো। নীল রঙের। ফল হলে লম্বা পটলের মতো দেখতে। বিস্বাদ খেতে। মুখে দিলে বমি হবেই। আর বনআলুর কোনো ফুল হয় না। ফল হয়। ফলগুলি দেখতে বিশ্রী। বড়ো জড়ালের মতো যেন থোকা থোকা ঝুলে থাকে। পুড়িয়ে খেতে দারুণ। বাচ্চাটা কী খায়, না খায় তাও জানা নেই। তবে দুধ খায়। দুধ সব বাচ্চারাই খায়। ক্যাঙারুর বাচ্চা দুধ খাবেই ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুধ তো বার বার খেতে ভালো লাগে না। মুখরোচক কিছু চাই। আর এজন্যই হাইতিতির ডিসে লেটুস পাতা, বনআলুর টুকরো—কিছুটা শাঁখআলুর মতো কেটে রাখা হয়েছে। আনারসও কেটে রাখা হয়েছে। সব রেডি-অথচ খাওয়ার নাম নেই। বাচ্চাটার নাম নিয়ে সবাই পড়েছে। অথচ ওয়াকার মতামত এ ব্যাপারে সবাই অগ্রাহ্য করছে। ওয়াকার তো রাগ হবেই।
ম্যান্ডেলা মা-র কথাতে সচকিত হয়ে গেছে। সত্যি তো কেউ কিছু মুখে তুলছে। গ্রিন পিজ আর টমেটোর স্যুপ—ভাপ উঠতে উঠতে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, সে খেয়ালও নেই। মা-র তো রাগ হবেই। সাদা ন্যাপকিন ভাঁজ করা। কেউ খুলে হাঁটুতে বিছিয়েও নিচ্ছে না। যেন নামকরণ না হলে কেউ কিছু মুখে দেবে না ঠিক করেছে। অগত্যা কাঁটা চামচে গেঁথে নিল একটা লেটুস পাতা। ম্যালো বাচ্চাটার মুখের কাছে নিয়ে গেলে, মুখ হাঁ করল। বাচ্চাটার বায়নাও শেষ ছিল না তখন! ম্যাণ্ডেলা না খাইয়ে দিলে কিছু মুখে দেবে না। একবার সে বাচ্চাটার মুখে খাবার তুলে দেয়, একবার সে চামচে স্যুপ খায়। আহার পর্ব শুরু হতেই বাবা যে কেন বললেন, ওয়াকা কী বলে?
