গুরুগম্ভীর গলায় প্রশ্ন, এই তোমার শিক্ষা! তুমি জান না, গুরুজনদের সঙ্গে মিছে কথা বলতে নেই। আমরা খোঁজাখুঁজি করে হয়রান। বাড়িটার উপর এত ভুতুড়ে উপদ্রব। তোমার বাবা জাহাজে গেলেন, আর ফিরলেন না, তুমি বড়ো হতে না হতেই নিখোঁজ হয়ে গেলে। কোথায় না খুঁজেছি—পিকাকোরা পার্কে তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে। তোমার তো ধারণা, তোমার বাবা সেখানে লুকিয়ে আছেন। বল, সত্যি করে বল, কোথায় সারাটা দিন ঘাপটি মেরে ছিলে। না বললে, বলেই লুসিকে ডেকে বললেন, তোমার অনেক ভোগান্তি আছে। এ মেয়ে তোমাকে ভোগাবে। যাও নিয়ে যাও। তালা বন্ধ করে ফেলে রাখ ঘরে। কোথায় যায় দেখব! বাবাকে খুঁজতে যায়। আর কিছু খোঁজার অজুহাত পেল না!
সহৃদয় পুলিশ অফিসারটিই তাকে সেবারে বলতে গেলে রক্ষা করছিল। বলেছিল, ওকে আর বকাবকি করবেন না। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে ওকে কোনো প্রশ্ন করবেন না। নিজে না বললে, ভয় দেখিয়ে কথা বের করতে যাবেন না। শিশুরা একটু চঞ্চল হয়েই থাকে। পুলিশ অফিসারটি আরও জানিয়েছিল, মি. হাসিমারা আসবেন। তিনি একজন শিশু বিশেষজ্ঞ। সেই বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিটিই হয়তো বলেছেন, নিরুদ্দেশ থেকে বাচ্চা ছেলেমেয়ে ঘরে ফিরে এলে তাকে অযথা প্রশ্ন করে উত্ত্যক্ত করতে নেই।
বুচার মামা এসব কারণেই বোধহয় নানা বিভ্রমে পড়ে গেছিলেন। তাকে বুকে তুলে নিয়ে বলেছিলেন, মা আমার খুব ভালো। বেশ বেড়িয়ে হাওয়া খেয়ে ফিরলে। তা কোথায় গেছিলে? নিশ্চয় খুব সুন্দর জায়গা। আমরাও না হয় যেতাম। আর তখনই সে বোকামি করে ফেলল, জান বুচার মামা-আমরা না, লায়ন রকে গেছিলাম।
বুচার হতভম্ব।
লায়ন রকে! কেন? কী করতে!
বাবাকে খুঁজতে।
বুচার মামা তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বিশ্বাস করবে কেন, সে তার বাবাকে খুঁজতে লায়ন রকে গিয়েছিল। আসলে শিশুরা মনে মনে নানা জায়গায় ভ্রমণ করে থাকে। এও বোধহয় তাই—এমনই হয়তো ভেবেছিলেন বুচার মামা। শুধু বলেছিলেন, বাবাকে একা খুঁজতে গেলে? ভয় করল না।
একা কেন? সঙ্গে হাইতিতি ছিল। ওকে জিজ্ঞেস করে দেখ না?
বোকা হাইতিতিও কম যায় না! সে সোজা ঢেকুর তুলে দুটো তাজা টিউলিপ ফুল জিভে তুলে এনেছিল। তারপর জিভ বের করে দেখিয়েছিল, মনের আনন্দে সে সারাদিন টিউলিপ ফুল খেয়ে বেড়িয়েছে। একমাত্র এসময়ে লায়ন রকেই টিউলিপ ফুল ফুটে থাকার কথা, অন্যত্র তারা যে ঝরে গেছে বুচার মামা কেন–সবাই সেটা জানে!
বুচার মামা এরপর আর কি প্রশ্ন করবেন বুঝতে পারছিলেন না। হতভম্ব অবস্থা বোধহয় কিছুটা কেটে গেছে। লোকজনের ভিড়ও পাতলা হয়ে আসছে। সবাই বলাবলি করছিল, মেয়েটার মাথায় নিশ্চয় ভূত চেপেছে। অথবা বাবাকে খুঁজতে যায় বলায় মনে করেছে, শেষে তার বাবাই মেয়েটাকে খাবে। কোথায় কোন গভীর সমুদ্রে জাহাজডুবিতে মারা গেছে কে জানে—তার প্রেতাত্মা যে মেয়াটাকে ঘরছাড়া করতে চাইছে না, তারই বা ঠিক কি! বরং এসব ব্যাপারে পুলিশ, শিশুবিশেষজ্ঞ না ডেকে ওঝা গুণিন ডাকাই বেশি শ্রেয়। ঝাড়ফুঁক করলে নিরাময় হয়ে যেতে পারে।
ম্যান্ডেলা দেখছিল মাকে ঘিরে প্রতিবেশীরা নানা উপদেশ দিচ্ছে। ওয়াকা মা-র ফুটফরমাস খাটছে। ম্যাণ্ডেলা ফিরে আসায় তার আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই। সেও লাফিয়ে বেড়াচ্ছে টুকিটাকি কাজ সারার সময়।
আসলে বুচার ভেবেছিলেন, পাইনের বনে ঢুকে মেয়েটা নির্ঘাত রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিল। তারপর ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে কোনো গাছের নীচে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তারপরই মনে হল, রাস্তা হারালে, ফের পথ চিনে বাড়ি এল কি করে! এও হতে পারে বাবার খোঁজে সে পাইনের বন পার হয়ে কোনো উপত্যকায় উঠে গেছিল। কিংবা কোনো আপেল বাগানে, বাবা নিখোঁজ-কোথায় আর যাবে, ঠিক খুঁজে বের করবে এমন আশাতে সে আর বাড়ি ফেরার কথা মনে রাখতে পারেনি। এও হতে পারে বাবার কথা ভাবতে ভাবতে কোনো পাথরে বসে কাঁদছিল। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল, তারপর সকাল হলে বাড়ির কথা মনে হয়েছে। মার কথা মনে হয়েছে। আর স্থির থাকতে পারেনি। ঘুমিয়ে স্বপ্নও দেখতে পারে। স্বপ্নে সে লায়ন রকে ঘুরে আসতেই পারে। সুতরাং ম্যান্ডেলার বিশ্বাসকে বুচার ক্ষুন্ন করতে চায়নি। টিউলিপ ফুল সব ঝরে গেছে তাও বিশ্বাসযোগ্য নয়।
তা হলে লায়ন রক থেকে ঘুরে এলে?
হাঁ মামা।
বেশ করেছ। একা অবশ্য যাওয়া তোমার ঠিক হয়নি।
তুমি না মামা, খুব বোকা! হাইতিতি আমাকে ছেড়ে কোথাও যায়, কোথাও থাকে!
বুচার অবশ্য তা জানেন। তার ভগ্নীপতির এই এক শখ ছিল—পৃথিবীর যেখানে যা কিছু পাওয়া যায় মেয়ের জন্য নিয়ে আসতে পারলে, যেন তার সমুদ্র-সফর সফল। আর ম্যান্ডেলারও আবদারের শেষ ছিল না।
বাবা আমার চাই সিংহলের হাতি।
বাবা তার জন্য সিংহল থেকে কাঠের হাতি কিনে এনেছিলেন।
বাবা আমার চাই জাভাদ্বীপের গিরগিটি।
বাবা ম্যান্ডেলার জন্য পাথরের গিরগিটি নিয়ে এলেন।
বাবা আমার চাই, তুষার হরিণ!
বাবা নিয়ে এলেন, রুপোর একটা সাদা হরিণ।
বাবা আমার চাই ক্যাঙারুর বাচ্চা!
বাস যেমন বাবা তেমনি তার মেয়ে। তিনি সেবারে নিয়ে এলেন সত্যি একটা জ্যান্ত ক্যাঙারুর বাচ্চা। ম্যান্ডেলা যা চায় তাই পায়। বাবার জাহাজ কবে ফিরবে সেই আশায় কতদিন জেটিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাবার জাহাজ ফেরার কথা আছে জানলেই ম্যান্ডেলা বাড়ির লনে বসে সাদা জাহাজের অপেক্ষায় থাকে। বাড়িতে বসে থাকলে নীল সমুদ্র দেখারও একটা আনন্দ আছে। টিলার ওপরে বাড়ি—সমুদ্র অনন্ত অসীমে মিশে গেছে—ঝড় এবং তরঙ্গমালা উভয়ই সে কাঁচের জানালায় দাঁড়িয়ে দেখতে পায়। নীচে পাইনের বনভূমি, গাছগুলি ঝড়ের দাপটে নুয়ে পড়ে। ঝড়ের ঝাপটার গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ে—কখনো সমুদ্রের জলকণা ভেসে এসে নানা কারুকার্য গড়ে দেয় জানালার কাচে। এমন মেয়ের জন্য বাবার কেন শখ হবে না—একটা জ্যান্ত ক্যাঙারুর বাচ্চা। মেয়ের মুখে হাসি ফোঁটাতে পারার জন্য বুচার জানেন, পারলে ভগ্নীপতি সারা পৃথিবীর সব বিচিত্র গাছপালা পাখি জীবজন্তু বাড়িটায় ছড়িয়ে দেয়—নানা মজা সৃষ্টি করার খুবই আগ্রহ তার।
