রাত শেষ হয়ে আসছে। আকাশে স্বাতি নক্ষত্রের গায়ে যেন কুয়াশার জল লেগে গেছে। আকাশ আর নক্ষত্রমালার ভিতর ম্যান্ডেলা ভেসে যাচ্ছিল। ম্যান্ডেলা কত কিছু ভাবছিল। বাড়ি ফেরার সময়ই তার সব কথা মনে হয়। এমনকী বাবার লাগানো প্রিয় গাছগুলোর কথাও মনে হয়। কাঠের সেই লাল নীল বাড়িটার চায়পাশে, বাবা কত দেশ থেকে সব সুন্দর সুন্দর গাছ এনে লাগিয়েছে। বাবার জন্য আগে মন খারাপ হলে সে গাছগুলির চায়পাশে ঘুরে বেড়াত। সিলভার-রক গাছটিও তার প্রিয়। শুধু তার কেন, হাইতিতিরও। হাইতিতিকে তো গাছটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। সুযোগ পেলেই সে জঙ্গলে ঢুকে যেতে চায়। এমনও হয় যে তাকে আর খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। গেল কোথায়! ওয়াকা, সে, বুচার মামা পর্যন্ত টর্চ হাতে পাইনের জঙ্গলে খুঁজতে বের হয়। বাড়িটার নীচে বিশাল পাইনের বন— কতদূর চলে গেছে। কোথায় কোন জঙ্গলে ঘাপটি মেয়ে আছে তারা বুঝবে কী করে। না, খুঁজে খুঁজে কোথাও পাওয়া গেল না। নিরাশ তারা। আর বাড়ি ফিরে দেখে, দুষ্টুটা সিলভার-ওক গাছের নীচে চুপচাপ বসে আছে। গাছটাকে হাইতিতিও কত ভালোবাসে এটা যেন তার প্রমাণ।
সেই গাছটা সে কতদিন দেখে না। গাছটার নীচে বসে থাকে সকাল হলে। গাছের ছায়ায় নীল রঙের বেতের চেয়ারে সে বসে থাকে। হাইতিতি তখন একেবারে পোষা কুকুরের মতো। সে যা খাবে, ভাগ না পেলে ক্ষিপ্ত হয়ে কখনও গিয়ে সে জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ে। টমেটো সস দিয়ে স্যান্ডউইচ খেলে হাইতিতিরও চাই স্যান্ডউইচ, টমেটো সস। এত পাজি কখনো লাফিয়ে হাঁটুতে দু-পা রেখে ঝুঁকে দেখবে সে কী খাচ্ছে।
সেই গাছটাও তাকে টানছে, এই টানের জন্যই সে মেঘ ফুঁড়ে বের হয়ে আসছে। মেঘেরা কী, দায় নেই, দায়িত্ব নেই, তাদের মা-বাবাও নেই, ঘরবাড়ি তাদের কোথায় সে জানে না, মেঘেরা ঝরঝর করে ঝরে পড়লেই খালাস। তাদের মতো ঢিমেতালে ভেসে বেড়ালে চলবে কেন। সে সাঁ সাঁ করে উড়ে চলেছে, দুরন্ত ঈগল কিংবা কোনো অ্যালবাট্রস পাখির ঝাঁক নিমেষে পড়ে যাচ্ছে তার পেছনে। রকেটের মতো সে ছুটে চলেছে। মা রোজ আশা করছে, সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখতে পাবে তাকে। দুপুরে খাবার নিয়ে বসে থাকছে হয়তো। রাতেও। আর রোজ ঠিক গির্জায় যাচ্ছে প্রার্থনা করতে। রাত হলে চুপচাপ জানালায় দাঁড়িয়ে থাকবে। এখন আর আগের মতো মা ত্রাসে পড়ে যায় না। আগে তাকে না দেখলেই কান্নাকাটি জুড়ে দিত। বুচার মামাকে ফোন করত, ম্যান্ডেলাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যস। সারা শহর তোলপাড়-থানা-পুলিশ কত কিছু হয়েছে। কিন্তু যে উড়তে পারে, অদৃশ্য হয়ে থাকতে পারে, থানা-পুলিশের সাধ্য কি তাকে খুঁজে বের করে।
সেই সেবারে-দূর ছাই মনেও থাকে না। সেই সেবারে বললেই তো হয় না, আরে ওই যে লায়ন রকে তারা যেবারে যায়—পুরো চব্বিশ ঘণ্টা নিখোঁজ। তা এতটুকুন ছোট্ট মেয়ের পক্ষে চব্বিশ ঘণ্টা নিখোঁজ হয়ে থাকা যে কত ঝকমারি বাড়ি ফিরে হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিল।
হাওয়ায় ভেসে বাড়ির কাছাকাছি আসতেই মনে হয়েছিল, তাদের বাড়িতে মানুষজনের ভিড়, পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। কী হল রে বাবা!
তাদের বাড়ির সামনে সুন্দর ঘাসের লন। সবুজ—আর সেখানে এত মানুষের ভিড়! নীচে পাইনের বনভূমি, সেখানেও লোকজন কি খোঁজাখুঁজি করছে। বাড়ির পেছনে সাদা পাহাড়—এপমন্ট হিল। প্রায় সারাটা বছর তুষার শৃঙ্গ রোদে ঝকমক করে। বৃষ্টির দিনে, কিংবা কুয়াশা হলে পাহাড়টা কখনো কখনো আড়ালে পড়ে যায়। তখন কেন যে বাড়িটা তাদের ন্যাড়া ন্যাড়া মনে হয় সে বুঝতে পারে না। কুয়াশা থাকায় সে পাহাড়টা দেখতে পায়নি—তবে পাহাড় না থাকলেও, সবই আগের মতো আছে। বনভূমির নীচে ছোট্ট বেলাভূমি। আর আছে অজস্র লাল নীল পাথর, ফুলের উপত্যকায় রাজবেশে জাদুকর দাঁড়িয়ে আছেন। এমনকী পাহাড়ের নীচে সবুজ ঘাসের চারণভূমিতে সে অজস্র ভেড়ার পালও দেখতে পেয়েছিল। সবই এত ঠিকঠাক, তবু কেন যে বাড়িতে তাদের এত লোকজন প্রথমে ঠাউর করতে পারেনি।
পরে বুঝেছিল, অ তাইতো, সে যে মনের আনন্দে হাইতিতিকে নিয়ে লায়ন রকে উড়ে গেছে তা তো কেউ জানে না। সে পাইনের বন থেকে উঠে আসার সময়ই সবাই হইচই বাধিয়ে দিয়েছিল—ওই তো ম্যান্ডেলা! ওই তো হাইতিতি! মা প্রায় পাগলের মতো ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল, আর হাউহাউ করে কাঁদছিল।
বুচার মামার গম্ভীর গলা, কোথায় গেছিলে—দিনকাল ভালো না, বিচ্ছু মেয়ে, তোমাকে নিয়ে তো আমরা সবাই পাগল হয়ে যাব দেখছি। বল, কোথায় গেছিলে!
সে তো বলতে পারে না, লায়ন রকে গেছিল। জাদুকর যদি রাগ করে। জাদুকর তো স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলতেই পারে—’ম্যান্ডেলা তোমার একদম বুদ্ধি নেই। ওরা বিশ্বাস করবে—তুমি গেলে কি করে জানতে চাইবে না! এখন লায়ন রকে যাওয়া যায় না। ঝড়ের দরিয়া বলে ফেরি বন্ধ! স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, তুমি গেলে কী করে। কী দরকার বলার, লায়ন রকে গেছিলে–চুপ করে থাকলেই তো হয়।
২.
সে সেবারে অবশ্য মামার দাবড়ানিতে ভাগ্নে বলে ফেলেছিল সব। লায়ন রকে উড়ে গেছে। এমনকী টিউলিপ ফুল খেয়ে হাইতিতির কি আনন্দ। সে লাফায় আর টিউলিপ ফুল খায়। যত পায় তত খায়। কিন্তু মামা বিশ্বাসই করলেন না। ভাবলেন মিছে কথা বলছে।
