ওয়াকার তখন এক কথা, না কর্তা কিছু বলি না তাকে?
বুচার মামা বলবে, ফের যদি দেখি ওয়াকা, তুই জাদুকরের বাগানে ঢুকেছিস, পা খোঁড়া করে দেব।
জাদুকর পাথরের। কোথা থেকে কিভাবে যে সমুদ্রের ঢেউ ফেলে দিয়ে গেছে তাকে, কেউ তা জানে না। তা এটা বেশ একটা রহস্য।
শহরের বেলাভূমিতে জাদুকর পড়ে আছে। সেই জাদুকর—যে জাহাজে এসেছিল, যে পাতার বাঁশি বাজাত—যে শিশুদের নিয়ে পাইন ফেস্টিভ্যালের দিনে, মিছিল বের করেছিল—ঠিক সেই পোশাকে, সেদিন সে যা পরে পাইন ফেস্টিভ্যালে শহরের রাস্তায় নেমে এসেছিল, শহরের মানুষজন তাকে দেখে তো অবাক-বাড়ির কাচ্চা-বাচ্চারা সব ছুটে বের হয়ে গেল, পাতার বাঁশির সুরে মুগ্ধ করে সব শিশুদের সে বের করে নিল, সে যদি মাস কাবার না হতেই পাথরের মূর্তি হয়ে ভেসে আসে আর বেলাভূমিতে পড়ে থাকে—তবে মানুষের দোষ কি! তারা তো অবাক হবেই।
ম্যান্ডেলা উড়ে যাচ্ছে, আর বাড়ির কথা ভাবছে। মা-র কথা, ওয়াকার কথা, মামা বুচার ঠিক বাগানে পায়চারি করছে। শহরের লোকজন বলাবলি শুরু করে দিয়েছে, ভুতুড়ে মেয়েটা সত্যি এবারে উধাও! এতদিন তো সে বাড়ির বাইরে কখনো থাকে না। শহরের ছেলে-মেয়েদের চোখেও ঘুম নেই সম্ভবত। ওয়াকা অস্থির হয়ে পড়বে। সে পাইনের জঙ্গলে ঘুরে বেড়াবে। উপত্যকায় আপেলের বাগানে ঘুরে বেড়াবে কিংবা ভেড়ার পাল নিয়ে যারা নীচে নেমে যায়, তাদের কাছে খোঁজাখুঁজি করবে, ম্যান্ডেলাকে দেখেছ! কোথায় যে আছে! কোথায় যে গা ঢাকা দিয়ে থাকে। খায় কী! অবশ্য খাবার ভাবনা থাকার কথা না। চেরি ফলের বাগানে ঢুকে গেলে চেরি ফল খেয়ে আনন্দেই দিন কাটিয়ে দিতে পারে কিংবা আঙুরের খেতে যদি লুকিয়ে থাকে, তবে তো হাইতিতিরও খুব মজা। আঙুর খেতে ওস্তাদ। আর কোনো খামারে পালিয়ে থাকলে, সেখানে দুধ মাখন সব পাবে। নদী এবং হ্রদের পাড়ে পাড়ে ঘুরে বেড়ালেও তার ভয় থাকার কথা না। ম্যাণ্ডেলার ভারি মিষ্টি স্বভাব। সবাই তাকে আদর করে খাওয়াতে পারে। মেয়েটার মধ্যে ঐশী শক্তি আছে, এমনও এখন শহরের লোকজনরা বিশ্বাস করে। তার পক্ষে পাঁচ সাতদিন নিখোঁজ হয়ে থাকা খুব কঠিন না। এমনকী এখন রাত জেগে ছাদে বসে থাকবে সবাই-ওর ফেরার সময় শহরের মাথায় ঘণ্টাধবনি হয়। সাধারণ মানুষ তো জানে না হাইতিতির গলায় ম্যান্ডেলা রুপোর ঘণ্টা বেঁধে দেয়। সে এই রুপোর ঘণ্টা পেল কোথায় তাও কেউ জানে না। তা হাইতিতি ভাসতে ভাসতে নেমে এলে ঘণ্টা বাজবে, ঘণ্টাধবনি হবে—এবং নীল আকাশে দেখা যাবে ছেড়া রুমালের মতো কী যেন দুটো ভেসে চলে আসছে। তখনই তারা বলবে, লুসির ভুতুড়ে মেয়েটা ফিরল। যাক কিছু যে হয়নি—কোথায় যায়! লুসির প্রাণে এবার জল এল। সবাই লুসিকে এজন্য কিছুটা মা মেরির কাছাকাছি জননী ভেবে থাকে। তাকে সবাই ভক্তি শ্রদ্ধাও করে। বাগানের সুমিষ্ট ফল, ভেড়ার বাচ্চা উপহারও পাঠায় কেউ কেউ।
ম্যান্ডেলা দ্রুত বাতাস কেটে নেমে আসছে। এতদিন এভাবে তার বাইরে ঘোরা উচিত কাজ হয়নি। তারপরই মানে হল, সে না থাকলে ফনের আদেশে মুম্বাটুকে পুড়িয়ে মারা হত। একজন মানুষের প্রাণ বড়ো, না মা-র দুশ্চিন্তা বড়ো কিছুতেই ম্যাণ্ডেলা তার গুরুত্ব বুঝতে পারে না। মাকে সে কষ্ট দিতে চায় না। সেবারে, সেই প্রথম, পালকের টুপি আর রুপোর ঘণ্টা পেয়ে কী বোকামিই না করে ফেলেছিল। পাইনের জঙ্গলে এভাবে কেউ পালকের টুপি ফেলে রেখে যায় না। রুপোর ঘণ্টাও ফেলে রেখে যায় না। যদি যায়, তবে কোনো মহৎ উদ্দেশ্য আছে। এবং সেদিনই স্বপ্নে কে যেন তাকে বলে গেল, আরে সেই জাদুকরই তো, তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ওটা অমূল্য জিনিস—তোমার বাবা নিখোঁজ। তাকে ওটা পরে খুঁজতে যেতে পারবে। পৃথিবীর যে কোনো জায়গায়, তুমি ইচ্ছেমতো উড়ে যেতে পারবে। তারপর মনে হল, না যেন এটা জাদুকর তার হাতে দিয়েই বলেছিল—কি যে হয়, কখনও মনে হয় স্বপ্নে, কখনো মনে হয় বাস্তবেই মানুষটি তার নিখোঁজ বাবার কষ্ট বুঝে পালকের টুপিটি তাকে দিয়ে গেছিল। তবে রহস্যময় মনে হলেও তার কেন যে মনে হয়, জাদুকর বসন্তনিবাস তার ভালোই চায়। এই যে সে ফনের রাজত্বে ঘুরে এল, তাও বোধহয় জাদুকরের ইচ্ছে। তা না হলে, সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে সে নিমেষে উড়ে যায় কী করে! তবে এটা মনে আছে, জাদুকর তাকে পইপই করে বলেছে, এই টুপির খবর, রুপোর ঘণ্টার খবর কেউ যেন না জানে—এতে মন্ত্রগুণ নষ্ট হয়ে যায় সে এজন্য কিছুই বলতে পারে না। ওড়াউড়ির শুরুতে লায়ন রকে গেছিল। সবে সে পালক আর রুপোর ঘণ্টা পেয়েছে। পেয়েই টুপিটা মাথায় দিতেই কেমন হালকা হয়ে গেল। উড়তে থাকল—তার খুব ভয় ধরে গেছিল—আরে বাতাসে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে যে তাকে। সমুদ্রের উপরে যে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। যেই না ভয় সঙ্গে সঙ্গে সে দেখতে পায়, বাড়ির দিকে উড়ে যাচ্ছে–কী সুন্দর বাড়িটা—এত উপর থেকে তো সে তার বাড়ি কখনো দেখেনি। সবুজ পাইনের জঙ্গলে পাহাড়ের মাথায় বাড়িটা মনে হচ্ছিল, আশ্চর্য সুন্দর। সামনে সমুদ্র, সমুদ্রের বালিয়াড়িতে পাথরের জাদুকর একবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকে দেখেও ছিল। বলেছিল, ভয় কি! মাথায় পালকের টুপি আছে, ভয় কি! তুমি যা ভাববে, ঠিক সেমতো টুপিটা কাজ করবে। তোমার ভয় ধরে গেল, তাই আবার বাড়ির দিকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে তোমাকে। তারপর বলেছিল, তুমি একা কেন হাইতিতি কোথায়। ওকে সঙ্গে নাও। তারও তো আছে রুপোর ঘণ্টা। একা ওড়াউড়ি করলে ভয় পাবারই কথা। আমারও ভয় করত। এই যে সমুদ্রবেলায় তোমরা আমাকে পাথরের মূর্তিতে বন্দি করে রেখেছ, আমারও একা ভয় করে। ভয় করে বলেই তো সব পাখিরা ওড়াউড়ি করে মাথার উপর। রাতে যখন শহর ঘুমিয়ে পড়ে তখনও একটা বড়ো অ্যালবাট্রস পাখি আমার মাথায় চুপচাপ বসে থাকে। আমাকে সঙ্গ দেয়। কথা বলে। হাইতিতি সঙ্গে থাকলে তোমার ভয় করবে na। মানুষের সঙ্গে পাখি, প্রজাপতি, শুধু পাখি, প্রজাপতি কেন, সব প্রাণীরই একটা মধুর সম্পর্ক থাকে। যারা শুধু মানুষের কথা ভাবে, তারা স্বার্থপর। মানুষের সঙ্গে গাছপালারও গভীর সম্পর্ক। কেউ কাউকে ছেড়ে বাঁচতে পারে না। বড়ো হতে পারে না।
