সে যাই হোক, ম্যান্ডেলা দ্বীপে নেমে গেছিল। সঙ্গে তো হাইতিতি আছেই। সে কাছে গিয়ে দেখল, একজন বুড়ো মানুষ, চুল সব পেকে গেছে—সাদা দাড়ি, গায়ে পাতার পোশাক। তার বাবা নয় ঠিক, তবে মানুষটার জন্য কম তার ভোগান্তি হয়নি। এই আছে এই নেই, কারণ ম্যান্ডেলা পালকের টুপি মাথায় দিলেই অদৃশ্য, খুলে ফেললে ম্যান্ডেলা। হাইতিতি বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। তার গলায় ঘণ্টা বাজছে। দ্বীপে কোনো ভুতুড়ে উপদ্রব শুরু হয়েছে ভেবে লোকটা দৌড়াতে শুরু করেছিল। এতটুকুন দ্বীপে আর যে মানুষজন নেই, ম্যান্ডেলা উড়তে উড়তে টের পেয়েছে—তারপর লোকটার কাছে গিয়ে টুপি খুলে দাঁড়িয়ে পরিচয় দিয়েছে, তা নাম ম্যান্ডেলা। সে থাকে নিউ প্লাইমাউথ শহরে। জাদুকর তাকে পালকের টুপি দেওয়ায় সে যেখানে খুশি উড়ে যেতে পারে। সঙ্গে আছে ক্যাঙারুর বাচ্চা হাইতিতি—গলায় রূপোর ঘণ্টা বেঁধে দিলে, সেও অদৃশ্য হয়ে যায়–উড়ে যায়। সে তো ছোট্ট মেয়ে—একা একা ঘুরতে ভয় পাবে বলেই, হাইতিতিকেও দয়াপরবশ হয়ে জাদুকর রুপোর ঘণ্টা দিয়ে গেছে। হাইতিতি সঙ্গে থাকলে, তার আর কোনো ভয় থাকে না।
বুড়ো মানুষটি কিছুতেই বিশ্বাস করছিল না তাকে। এমন আজগুবি কথা কে কবে শুনেছে! বাধ্য হয়ে ম্যাণ্ডেলা টুপি পরে দেখিয়েছে, খুলে দেখিয়েছে। হাইতিতি যে একটা ক্যাঙারুর বাচ্চা তাও দেখিয়েছে। রুপোর ঘণ্টা খুলে নিতেই হাইতিতি লাফিয়ে পড়েছিল, একেবারে বুড়ো মানুষটির নাকের ডগায়। সে বিশ্বাসই করতে পারেনি, হাইতিতি একটা ক্যাঙারুর বাচ্চা, আর এত চতুর। সারা দ্বীপে ছুটে বেড়িয়েছিল কিন্তু শত হলেও বুড়ো মানুষ, পারবে কেন—ক্লান্ত অবসন্ন বুড়ো মানুষটি পাথরে হেলান দিয়ে বসে পড়েছিল—আর হাঁপাচ্ছিল। তারপর যখন বুঝল,, ম্যান্ডেলা সত্যি সুন্দর ছোট্ট পরির মতো একটা মেয়ে এবং হাইতিতিও সত্যি একটা ক্যাঙারুর বাচ্চা, তখন বিশ্বাস করেছিল, ঈশ্বরের পৃথিবীতে সবই সম্ভব। মানুষ তার কতটুকু জানে।
সেই মানুষটি দ্বীপে থাকতে থাকতে তার নাম ভুলে গেছিল দেশের নামও মনে ছিল না। দ্বীপে থাকে। কচ্ছপের খোলে জল ধরে রাখে। পাখিরা উড়ে আসে দ্বীপের পাহাড়ে। তারা সেখানে বাসা বানায় মুখের লালা দিয়ে। সেই বাসা বুড়ো মানুষটা জলে ভিজিয়ে খায়—খুবই উপাদেয় স্যুপ। পুড়ো মানুষটার পাতার ঘরেও নিয়ে গেছে। বুড়ো মানুষটা সমুদ্রের ধার থেকে কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করে পুড়িয়েছে? ম্যান্ডেলাকে খেতে দিয়েছে। বড়ো বড়ো চিংড়িমাছ সমুদ্রের ধারে ধারে জলজ ঘাসের মধ্যে লাফিয়ে বেড়ায়। নীল স্ফটিক জল, খিদে পেলে চিংড়ি মাছ তুলে এনেছে। পুড়িয়ে নিজে খেয়েছে। তাকে খেতে দিয়েছে। তারপর ম্যান্ডেলা আবিষ্কার করেছিল, বুড়ো মানুষটা বিশাল একটা গাছের কাণ্ডে তার নাম লিখে রেখেছে, নদীর নাম, মেয়ের নাম। দ্বীপে এলে কেউ যেন তার অবর্তমানে টের পায় হানস ওটো নামে এক যুদ্ধপলাতক আসামি দ্বীপটায় জীবন অতিবাহিত করে দিয়েছে তার কোনো কষ্ট হয়নি। ঈশ্বর মানুষের জন্য সর্বত্রই বেঁচে থাকার কিছু কিছু ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
হানস ওটোর কথাও সে তার মাকে বলেনি, মামাকে বলেনি। বললেই তাদের হাজার প্রশ্ন। এত প্রশ্নের জবাব দিতে তার ভালো লাগে না।
কোথায় সে দ্বীপ?
কোথায় কতদূরে সে বলতেই পারে না। কারণ পালকের গুণ, নিমেষে উড়ে যাওয়া যায়, মেঘেরা ভেসে যায় তার সঙ্গে। মেঘ কাটিয়ে বাতাসের আগে সে উড়ে যেতে পারে। আবার ইচ্ছে করলে মেঘের আড়ালে সে লুকিয়ে থাকতে পারে। দ্বীপটা কত দূরে, হাজার মাইল না তারও বেশি সে জানে না। সে শুধু জানে লোকটির নাম হানস ওটো। সে শুধু জানে তার মেয়ে আছে। ম্যান্ডেলারই বয়সি হবে হয়তো। নয়তো তাকে দেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলবে কেন? মেয়ের নাম, নদীর নাম গাছে লিখে রাখবে কেন! মানুষের তো সবচেয়ে প্রিয় তার নদী আর গ্রাম। গ্রামের নামও লিখে রেখেছিল। হানস ওটো কোন দেশের লোক তাও সে জানে না। যে দেশেরই হোক, মেয়েকে ছেড়ে থাকার কষ্ট সব বাবারই এক। হানস নিজেও জানে না, কতকাল সে অতিবাহিত করেছে দ্বীপে। থাকতে থাকতে দ্বীপের গাছপালা, পাখি, প্রজাপতি তার বন্ধু হয়ে গেছে। নিজের গাঁয়ের নাম ভুলে গেছে। নদীর নামও। মানুষ যেখানে থাকে, বড়ো হয়, সে অরণ্যই হোক, নির্জন দ্বীপই হোক প্রিয় হয়ে যায় তার। হানসের তাই হয়েছিল, বুড়ো হয়ে সে ভুলেই গেছিল, তার দেশ আছে, বাড়ি আছে, নদী আছে, মেয়ে আছে।
এসব মনে হলেই বাবার জন্য তার কষ্ট বাড়ে। বাবাও একদিন ভুলে যাবে তার কথা, টিলার উপর তাদের লাল নীল রঙের কাঠের বাড়ির কথা। আপেল বাগানের কথা। গির্জার কথাও ভুলে যেতে পারে। সে যে তার বাবার হাত ধরে পাইন ফেস্টিভ্যালে যেত—তাও ভুলে যেতে পারে। দ্বীপ কিংবা অরণ্যের গাছপালা, মানুষের কত প্রিয় হতে পারে হানস ওটোকে না দেখলে সে টের পেত না।
এই একটা আতঙ্ক থেকেই সে এত অস্থির। বাবা তার হয়তো একদিন বাড়ি ফেরার কথাই ভুলে যাবে।
বাবা যদি তার কথা ভুলে যায়, মা-র কথা ভুলে যায় তবে আর ম্যান্ডেলার বেঁচে থেকে কি হবে। ওয়াকার কথাও ভুলে যেতে পারে। সে বাড়ি না থাকলে, বেচারা ওয়াকাকে মামা কেবল ধমকাবে।—’গেল, কোথায় মেয়েটা? খুঁজে দ্যাখ! তারপর বলবে, এত করে বলি, ম্যান্ডেলাকে ফেলে কোথাও যাস না, তাও তুই পাইনের জঙ্গলে ঢুকে গেলি! ওখানে কী আছে তোর? ওখানে গেলে সেই জাদুকরের দেখা পাওয়া যাবে! তুইও কী চাস, জাদুকর তোকে কিছু দেবে! ওটা তো পাথরের মূর্তি। সমুদ্রের কিনারে পড়েছিল। শহরের মেয়র খবর পেয়ে ছুটে গেছে। শিশুরাও। একেবারে রাজবেশ। সাদা পাথরের মূর্তি। মাথায় মিনা করা বাদশাহি টুপি, ময়ূরের পালক মাথায়, পরনে আলখাল্লা। পায়ে নাগরাই জুতো। পাথরের রাজপুত্র বলা যায়। তুই কি ভাবিস ওয়াকা, ম্যান্ডেলাকে জাদুকর অদৃশ্য করে রাখে! তুই কি জাদুকরের পায়ের কাছে বসে বারবার প্রার্থনা করিস,ম্যান্ডেলার সুমতি দাও। ম্যান্ডেলা ফিরে এসেছে, ওকে আর তুমি অদৃশ্য করে রেখ না। বুচার মামা, লুসি মাসির ত্রাস বোঝো না। এমন একটা ছোট্ট মেয়ে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে গেলে কত কষ্ট বল! সে কোথায় যায়, তুমি ঠিক জান। বলে দাও না, ম্যান্ডেলা কোথায় যায়। তুই মূর্তিটিকে তাই বলিস?
